এই সংখ্যা২৪টি কবিতা, সম্পাদকীয় ও 'কুয়াশার কার্নিশ' (অনুপম দাশশর্মা) কাব্যগ্রন্থের পাঠ-প্রতিক্রিয়া । লেখকসূচি - সোনালী মিত্র, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, রেজা রহমান, শৌনক দত্ত, সোনালি বেগম, বিদিশা সরকার, ইন্দ্রজিৎ মাজি, নীলদীপ চক্রবর্তী, সতীশ বিশ্বাস, উদয় চক্রবর্তী, শৈলেন্দ্র প্রসাদ চৌধুরী মাণিক, তফায়েল তফাজ্জল, মিজান ভুইয়া, ভাস্কর গুপ্ত, সুনীতি দেবনাথ, ইন্দ্রজিৎ দত্ত, দেবযানী কর সিনহা, পিনাকী দত্ত, পলাশকুমার পাল, সাগরিকা ঘোষ, নাসরিন আলম, জাকিয়া এস আরা ও বিউটি সাহা । 
            
            সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন
দুটি বিষয় বলার আছে । ‘অন্যনিষাদ’এর প্রকাশের ব্যবধান সাপ্তাহিক । সেই হিসাবে আগামী সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার কথা ২৬শে সেপ্টেম্বর । কিন্তু পরের সংখ্যা বেরোবে ২৯শে সেপ্টেম্বর ‘ছড়া সংখ্যা’ হিসাবে । ঐ দিনই শিশুসাহিত্যের পথিকৃত যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জন্ম সার্ধ-শত বর্ষ পূর্তি । ছড়া সংখ্যাটি তাঁকেই নিবেদিত । ছড়া সংখ্যার প্রস্তুতি চলছে । গত সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ছড়া সংখ্যার ঘোষণার পর বিপুল সাড়া পাচ্ছি, এখনও লেখা পাচ্ছি । ছড়া নেওয়া হবে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ।

) আসন্ন শারদোৎসবের মাঝেই ‘অন্যনিষাদ’ শেষ করবে তার পঞ্চম বর্ষের পথচলা । ‘অন্যনিষাদ’ পথচলা শুরু করেছিল ১১ই অক্টোবর ২০১১তে । সেই হিসাবে ৬ই অক্টোবর সংখ্যাটিই হবে পঞ্চম বর্ষের শেষ সংখ্যা । অন্যনিষাদ’এর কোন পূজা সংখ্যা বা উৎসব সংখ্যা হয়না, এবারেও হবে না । বরং প্রতি বছরই শারদোৎসবের মধ্যে অন্যনিষাদ এক সপ্তাহের বিশ্রাম নেয়, কোন সংখ্যা প্রকাশিত হয় না । সুতরাং এবারও, ৬ই অক্টোবর সংখ্যা প্রকাশের পর এক সপ্তাহের বিশ্রাম । পরের সংখ্যাটিই হবে অন্যনিষাদ’এর ৬ষ্ঠ বর্ষের প্রথম সংখ্যা, প্রকাশিত ববে ২০ অক্টোবর ২০১৬ । কবিতা এবং তার পাঠকদের সঙ্গে রেখে ‘অন্যনিষাদ’ তার ৬ষ্ঠ বর্ষের পরিক্রমা শুরু করবে ২০শে অক্টোবর ২০১৬ থেকে ।


৬ষ্ঠ বর্ষের পথচলা শুরু করার আগে অন্যনিষাদ’এর সকল শুভানুধ্যায়ীর কাছে আগাম শুভেচ্ছা চাইছি ।
সভ্যতা আবিষ্কার

অবশেষে ভূমধ্যসাগরে
ওরা নোঙর ফেলল,আউসশীষ আর সূর্যের আড়াল নিয়ে
জাহাজ ভিড়লো নব্য বন্দরে।
পিলপিল করে নেমে এলো অসংখ্য দক্ষ কারিগর
ঢেলে দিলো ঘড়া ঘড়া সঞ্জীবনী সুধা ,
কেউ বলল , এবার ফসল হবে অনেক
কেউ ছুটে গিয়ে আয়না ধরে বসল
কেউ বলল,প্রকৃতই মানুষের মত
নদী পাড়ের মেয়ের গায়ে বুনোফুলের গন্ধ
মাটিরাঙা মেয়ের হাতের কাছে মাটি
সজোরে মেয়ে চাকা ঘুরিয়ে দেয় ...
বন্ বন্ বন্
শীর্ণ হাতের ছোঁয়া গরিষ্ঠ রূপ নেয়।
মেয়ের হাতে সূর্য,
মেয়ের পেটে খিদে
মেয়ের চোখে বিদ্যুৎ
মেয়ের নাম কৃষ্টি
ওরা অবাক হয়ে দেখলো মেয়ের বুকে অলঙ্ঘনীয় পিয়াসমধু
আঁচলভরা সনাতন গর্ব
ওরা এক ঝটকায় কাপড় টেনে নিল
গর্ভে ভরে দিল কিছু সোনালী বীজপত্র
ভ্রুণের নাম দিল সভ্যতা
কয়েক মহাকাল পর ...
সভ্যতা এখন পরিপূর্ণ নারী
ওর শরীরে এস আরেক কোন জাহাজ
হোক রহস্য কলম্বাস আবিষ্কার ...
অপ্রকট নির্জনতা

এক

কালো দাগ মুছে ফেলা গোপন অসুখ
তুমি শুয়ে আছো আজ  ক্যালেন্ডারে
ঝরাপাতা, উড়ন্ত আঁচল দিয়ে  ঘেরা এক নির্মম বুননে

জলশাঁখ বেজে ওঠে বুকের কার্নিশে
শব্দ ছিটকে যায় ফুঁ য়ে 
তোমার অপ্রেম স্পর্শ   শরীরের  ভাঁজে বিষ দাগ
হয়ে বসে আছে

চলে যাচ্ছে  ঐ দাগ    অপরাহ্ণে  দলছুট    আলো
দুই

মাঠ বলতে  সবুজের সমারোহ
টুকরো টুকরো  আলো এসে তার গায়ে নির্জন স্বাক্ষর  রেখে
যায়তখন  কারুকাজ করা   মনখারাপ 
ছিটকে যায় দূরে ঐ নদীর কিনারে

বৃষ্টির জানলা খুলে
কেউ এলো  তার হাতে বন্ধুত্ব স্মারক


বিদ্যুৎলতার মতো এক  ঝলক সুখ
একাদশ দিকে যাই

কাউকে কিছু না বলে মাঝরাতে তুমি চলে গেলে
চারদিকে জল ঠাকুমার হাতে এ আমাকে ফেলে
আমার প্রথম দেখা যমে ও মানুষে টানাটানি
যেতে যে চাওনি মাগো সে তো আমি বিলক্ষণ জানি ।

পাংশুটে পীতবর্ণ পরিযায়ী শৈশবটি থেকে
ফিরেই চলেছি আজও পথে ঘাটে কতকিছু দেখে
শ্লেটে লিখে শিখিয়েছ অআকখ একদুইতিন
ক্লাশ টুতে ভর্তি হই দেখলেনা ইশকুল দিন ।

সেই অআকখরাই এখনঅনেক দলে বলে
হাজার হাজার বই পুথিপত্র তাদের দখলে
অক্ষরজমিনে আজ কত কথা কবিতা না ফলে
কতনা লোহিতনীল দীপাবলি জোনাকিরা জ্বলে ।

তোমার হাতের লেখা অক্ষরেরা মুছে গেছে কবে
শ্লেটটা হারিয়ে গেছে সেও কবে নিঃশব্দ নীরবে
শ্লেটে যত লেখা ছিল কিছু নেই শ্লেট গেছে উঠে
সেই শ্লেটে বর্ণমালা তারা হয়ে ওঠেনি কি ফুটে?

রাত থেকে দিনে গেছি একলাই দিন থেকে রাতে
পথে দুজনের দেখা তারপর হাঁটি একসাথে
যে ঘরটা গড়ে ওঠে পথ ভেঙে সেই ঘরও ভাঙে
ডাঙার আমিটা মাগো ডুবে যাই একদিন গাঙে।

চোখেই এখন নদী জলের কিনার ঘেঁষে হাঁটি
পথের দুপাশে গৃহ আর গৃহদস্যুদের ঘাঁটি
হাঁটি একাদশ দিকে তুমি নেই কাকে ফিরে খুঁজি
কোথাওতো কেউ নেই তবু খুঁজি তোমাকেই বুঝি?




বারবার আসি আমরা দুজন...

অসম্পন্ন অবেলায় কথাহীন দৃষ্টি
থেকে কুড়িয়েছি কথার কারুকাজ
শর্তের তাবত সাক্ষর মুছে একাকী
নেমে এসেছি শূন্য সাঁকোর নির্জন টানে
আমরা শূন্যতার জরায়ুতে যে মৃত্যু
লিখেছিলাম শুভ্রতা মাখা জন্মলগ্নে
দ্যাখো তার কাছে
সব তার কাছে দ্যাখো
আমরা শুধু জন্ম জন্মান্তর
অক্ষম মুগ্ধতার রুমালে তুলেছি
বিভোরতার আকন্ঠ তৃষ্ণা
ভালবাসা...
দাগ

কর্মবিস্তৃত জীবন কখনও বিষন্নতা কখনও সক্ষমতা
নিঃসীম পথ হারমোনিয়াম ঝাঁঝ খোল করতাল ।
সহজ সরল নির্লিপ্ত ভাবাবেগ শ্রমনিষ্ঠা
রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতি ধর্মনীতি ক্রমে ভঙ্গ নৈঃশব্দ্য
প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ খোলা বারান্দা অন্তরে
হাত ধরাধরি সুখ-দুঃখ প্রস্তুরীভূত জীবাশ্ম
অনুকূল পরিবেশে বেড়ে ওঠা গাছ জীবজন্তু
              কিছু রেখে যাওয়া দাগ –––
সীতার জন্মকথায় জেগে উঠছে মহিমান্বিত হলরেখা
চঞ্চল অপূর্ণ সচেষ্ট প্রেম শান্তির মহার্ঘ আস্বাদ ।
 




টপিক

কিছুক্ষণ থেমে গিয়েছিল এপক্ষে ওপক্ষে কথালাপ
প্রসবিনী হেঁটে যাচ্ছে একা -
ঝিলের ওপর দিয়ে টানা রিক্সা যেন
ভূকম্পে টলেনি তার পা
জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে প্রসবিনী মা
আমরা দেখছিলাম

কত কি বদল হল উন্নততর'র থেকে তম
জিওল মাছের মত
মায়েদের জন্য কত মেধা
সমাধানে নেমে আসে
ভূমিষ্ঠের সংবাদ এলো না
কে কাকে গায়েব করে
যোনি ফুঁড়ে দালাল শহরে
গান বাজে সিগন্যালে
বাইশে শ্রাবণে কবি বহুদিন পালিত ভিনদেশে

এসব সবারই জানা
কবিতাও যেমন সহজে
প্রতিদিন সংবাদে কবিতার প্রয়োজনে
গণ ধর্ষণের পাতা খোঁজে ।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া – ‘কুয়াশার কার্নিশ’ / অনুপম দাশশর্মা

আলোচক – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

অনুপম দাশশর্মার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কুয়াশার কার্নিশ’ পড়লাম । ৫৬টি কবিতা অনুপমের এই কাব্য সংকলন, প্রকাশ করেছে ‘অসময় প্রকাশনী’ । জানুয়ারি ২০১৩তে অনুপমের প্রথম কাব্যসংকলন ‘পালকের ঘরবাড়ি’ প্রকাশিত হয়েছিল, তারপর ঠিক তিনবছর পরে পেলাম তাঁর দ্বিতীয় সংকলনটি । ‘পালকের ঘরবাড়ি’তে অনুপমের একটা পংক্তি পড়েছিলাম কোন একটি কবিতায় - “আছে যারা ভাবনা সরানো দ্বীপ সুখে/সরে এসো সাতনরী পাশে / স্পন্দিত কবিতার বুকে” । আর তিন বছর পরের এই সংকলনে কবির উপলব্ধি –
“ঝড়ের খোলা পালে কিংবা ভাসানের পর ভেসে ওঠা মাতৃমুখে
যন্ত্রণার তুষে জ্বলেওঠা, এ সবেই কবির অমরত্ব” (‘কবি ও তার অশ্বমেধ ঘোড়া’)

অন্যনিষাদসম্পাদনা ও নানান ওয়েব পত্রিকায় ঘোরাঘুরির সূত্রে অনুপমের কাব্যকৃতির বেড়ে ওঠার কিছুটা সাক্ষি আমিও । সেই সূত্রে বলি আলোচ্য কাব্য সংকলনের কবিতাগুলি নিশ্চিতভাবেই পাঠকের ভালোলাগার মত । কুয়াশার কার্নিশএ অনুপমের কবিতার উপকরণ তার চারপাশের চলমান সময় আর সেই সময়ের মানুষের সংশয়, ক্লান্তি, বিষাদ আর তার বিষন্ন জিজ্ঞাসা। এবং অন্যতর এক সকাল দেখার প্রত্যয় । । কবি দেখেন -
“হলাহলে নিষিক্ত মনুষ্যত্ব, বিবেকের ধ্রুপদী দর্শন
পারস্পরিক সমভ্রমের দিনমান ক্রমশঃ অপসৃয়মান
অদ্ভুত বাতাসের সাথে” । (‘রক্তিম সমকাল’)
তবুও কবি দেখতে চান –
“সমস্ত শূন্যতা ছিঁড়ে নতুন সকাল ডেকে নিক ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা
শ্রমিকের” ( ‘আশ্চর্য সকাল’)

বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে ‘উত্তর-আধুনিকতা’ নামে একটা কথা খুব শুনতে পাই ।  অনুপমের কবিতা সেই উত্তর-আধুনিকতার হৈ হট্টগোলের ফাঁদে আটিকে পড়েনি । ওর কবিতায় একটা সহজতা আছে, হৃদয়ের আবেগ আছে । পাঠকও তাই কবিতাগুলির সঙ্গে নিজেকে খুঁজতে চাইবেন, জড়িয়ে নিতে চাইবেন । সংকলনের প্রথম কবিতায় কবি লেখেন -

“প্রতিটি ভাঙনের পরও জেগে ওঠে লাবন্য নয়াচর
কেউ না বুঝুক উড়ন্ত পাখিরা বোঝে” ( ‘মনের গতিবিধি আর বিচ্ছিন্নতার কথা’)

শেষ কবিতায় ‘শিশিরবিহীন কুয়াশা’য় ছেয়ে থাকা দুঃসময় থেকে কুয়াশা সরার অপেক্ষায় কবির উপলব্ধি, কিংবা বিশ্বাস
– ‘বেশ আছি’ যারা হাবেভাবে বোঝায় ...
“এ সমাজ তাদের অখন্ড জমি।
অপেক্ষা প্রতিধ্বিনিত হয় গেরুয়া সকালে
কে বলতে পারে কথা বলে উঠবে না
মৃত জ্যোৎস্নার কবরস্থ মমি” ! (‘দুঃসময়’)

‘কুয়াশার কার্নিশ’ কবির বিশ্বাসের অন্বেষণ । আশা করবো সংকলনটি পাঠক সমাদর লাভ করবে ।

চোখে পড়ার মত কয়েকটি অশুদ্ধ বানান রয়েছে । ‘কবি ও তার অশ্বমেধের ঘোড়া’ দুবার দুটি পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে (২৯ ও ৫৭) । পরের সংস্করণে এ গুলি সংশোধনযোগ্য । মারুত কাশ্যপের আঁকা প্রচ্ছদ জ্যাকেটএ মোড়া ‘কুয়াশার কার্নিশ’ বেশ পরিপাটি প্রকাশনা ।
শাব্দিক কান্না

এই পথ এই গ্রাম হাঁটেনি উৎসব
চোখে চোখে ছড়িয়ে কেবল ক্ষিধা
নরমেধ যজ্ঞ চলে পেটের হেঁশেলে
আহুতিতে লেখা গরীবের মুশবিদা।

শস্য নিয়েছে ছিনিয়ে আত্মীয় বন্ধু
মাটিও বন্ধ্যা হয়েছে, বুকে সন্তাপ।
ঘরের ভেতর ঘর গড়েছে ধর্মপিতা
সংস্কারে পিণ্ড সাজায় আমার পাপ।

লাশের গন্ধে ভাসে আগমনী সুর
সবুজ পুড়ে যায় নাগরিক অর্চনায়,
বুকে কত সঞ্চিত রসালো বিদ্বেষ
জন্মেছি পঙ্গু জন্মের আঙিনায়।

পূজোর ধূনচী জ্বেলে বসবে মণ্ডপ
ঈশ্বর গন্ধে খুন হবে অরণ্য আমার।
লাশের শহরে সংঘাতে মাতবে লাশ
পাণ্ডুলিপি খুলে কবি কাঁদবে আবার।

About