সংশয় 
অনুপম ভট্টাচার্য , কলকাতা্ 

তড়িদাহত এই নাগরিক অন্ধকারে
আমরা, লক্ষ লক্ষ স্বাচ্ছ্যন্দ্যের কীট,
রোশনাই খেয়ে বেঁচে আছি ।
নিস্প্রদীপ লাল ধূলোর পথেও রাত্রি নিয়ত ছিন্নভিন্ন
বাহনের আলোকচ্ছটার নি্র্মম ছুরীতে ।
সভ্যতার সব ক্লান্তি, সমস্ত দ্বিধা
এখন উলঙ্গ মধ্যরাতেও ।
প্রগাঢ় তমিস্রায় অনিবার ক্ষয়ের বার্তাবাহী
নিকোটিন-আগুনের নিভৃত সাহচর্য্য আজ প্রায় কল্পনাবিলাস ।
তরল অন্ধকার বাস্পীভূত হয়ে চলে
ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রতিরাতে;
তবু যেন চেতনার শিকড়ে পুঞ্জীভূত
কৃষ্ণগহ্বর ।


এই হাতে আর 
ডাঃ জলধি রায়,ঢাকা


এই হাতে আর রাখবো না কিছু, যদিও নাও নি হাত, তুমি কেটেছ আঙুল
এ-আলো আমারই শুধু খেলাচ্ছলে রাজপথ, রাজপথে রাজকথা বলতে বলতে যাওয়া

পথিক হিসাবে আমি শুধু ভূমিলগ্ন দাঁড়ানো শরীর, তীরলগ্ন একা অশরীর
নাবিক হিসাবে আমি শুধু দূরবর্তী বন্দরের রূপ, জলের অরূপ -
যাকে তুমি রেখে গেছ ফেলে সে আমারই অশ্রুত প্রতিজ্ঞা,
সঙ্গে যা নিয়েছ তুমি সে কেবল জনশ্রুত গুঞ্জরন...

 পথ ছিলো শুধু প্রস্থানের পথ যেন আমি এ-পথেরই দাস
অস্ত্র ছিলো মূল্যহীন যেন সব রণভূমি শূন্যপ্রায়
   
শুধু তীর ছিলো সমুদ্রের দিকে যেন রক্তলগ্ন প্রেম -
সমুদ্র তো সেখানেই শুরু, যেখানে সকল পথক্লেশ লিখে রাখে নিষাদের প্রভু

জানি, মুঠোভর্তি বালু হিসাবে সমুদ্র নয় ভেসে আসা সুদূরের শ্লোক -
হে আচার্য, এই হাতে আর ধরবো না কিছু, এই হাত কেবল সমুদ্রলগ্ন হোক


পৃথিবীর গল্প
অ ল ক বি শ্বা স

    রাগ করে অভিমান এইভাবে 
     কতদিন রাখা যায় ধরে,
     চাঁদ-জোছনায় হাওয়া লুটোপুটি
     থাকা যায় ছেড়ে, তেপান্তরে !
      
     এমনতর অবকাশ অকারণ
     বাড়ায় চাপ শরীরে মনে 
     ঝগড়া সেও ভালো তাকানো বারণ
     থাক ; কাছাকাছি তবুও দু'জনে

     সামাজিক এই বিধি ভালো
     যেমন রাত-দিন আসে ঘুরে ফিরে
     পৃথিবী নিয়ম মেনে গতিময়
     বলে, সূর্য মাথার উপর দাঁড়ায় দুপুরে

[ অলোক বিশ্বাস – ক’লকাতায় থাকেন, একটি দৈনিক সংবাদ পত্রের
প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক । ইতিমধ্যেই তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

‘জল বিছানা’ ‘বাতাবি লেবুর ফুল' 'মাঠ বিকেলের আলো’ এবং ‘ঈশ্বর বাড়ি’]
                    
                   (২) 

হারায়না কিছুই
শ র্মি ষ্ঠা ঘো ষ

     খেলার আগেই হাত তুলছ খেলব না
     বলতে পারসেসব তোমার ইচ্ছাধীন
     খেলার ছলে খেলার নিয়ম ভাঙতে পার
     হারার ভয়ে এই আমি আর পালাই না 

     দেখব আমি, শেষ কতদূর জল গড়ালে  
     চেকমেট হই আঁতলামো আর দম্ভ মিলে
     উচ্চরবে হেরোআমায় ডাকতে পার 
     শেষ না দেখে এ মুখ আমার লুকোব না   

     যে হাত দিয়ে হাত ছুঁয়েছে ভালোবাসা 
     ভরসা দিঠি বিষাদ কালো চোখ ছুঁয়েছে
     একাকিত্বের হিম ভুলেছে বুকের ওমে  
     বর্ষা ভাসা কান্না শ্রাবণ ঠোঁট মুছেছে
     হয়তো তোমার দরকার নেই সুখ ঋতুতে
     তবুও এসব পরম পাওয়া হারায় না 

     তোমার তুমি-র কক্ষপথে আমার নজর
     বিরাজ করে গ্রহশান্তি রত্ন হয়ে
     চূর্ণ যখন অহমিকার শেষ সীমানায়
     ভস্ম হয়েও ধুমকেতু ছাই ওড়ায় না ।  




       (১)  রক্তকূপ
 অ শো ক দে ব / ত্রিপুরা
বংশানুক্রমিক ওই রক্তকূপ, বারান্দার ডানা
সেদিকে ছড়ানো
এখন ডেকোনা, রাত করে বালতি হাতে কারা চলে আসে!
আসে না, সত্যি করে কেউ আসে না, কোনও কূপও কি আছে?
অযথা দাঁড়িয়ে থাকি। দেখি
আকাশ জুড়ে ছেঁড়া ছেঁড়া তারাদের ঝিম
এবং ঝিঁঝির শ্বাসনালী থেকে শীত নিঃসৃত হয়,
শূন্য সুরাপাত্রের সাথে হয় নর্দমার গন্ধর্বমিলন

এসব দেখে নিলে তৃষ্ণায় হামা দিতে থাকি
কলসির ঘুম ভাঙিয়ে জল খাই

              (২) সুন্দরের বস্ত্র হরণ

মৌ মধুবন্তী / টরেন্টো, কানাডা
দুরন্ত চাঁদের কপালে চুমু দিতে
গিয়ে দেখি, ঠোট উড়ে গেছে বাতাসে
প্রখর দুপুরের গায়ে টকটকে লাল লিপস্টিক
বিকেল এসে খামছে ধরে
আমূল বসিয়ে দেয় ধারাল নখ
উষ্ণ করতালি দিয়ে অভিবাদন
জানায় বিমুর্ত সন্ধ্যা,রাত বড়
নির্লজ্জ; মুহুর্তে খুলে ফেলে-
প্রথা, এখন সব আদিবাস--
কে কবে ছিল সন্ন্যাস?
সবকালেই প্রথার আড়ালে 
সীতার বস্ত্র হরণ, বস্ত্র পরেই
কি লাভ ? ওসোর দর্শনে দেখায়
পোড়া আঙ্গুলের অগ্রভাগ; তাতেই
টনটন লাফিয়ে ওঠে ভগ্ন সোয়াসেজ।









[মৌ মধুবন্তী – জন্ম ও শিক্ষা-ঢাকা,বাংলাদেশ । উচ্চতর শিক্ষার জন্য ১০৯০এ আমেরিকা গমন,  ১৯৯৮ থেকে টরেন্টো/কানাডা প্রবাসী।কাব্যচর্চার সাথে মধুবন্তী বাচিক শিল্প ও নাট্যাভিনয়ে দক্ষ । মধুবন্তী একজন গীতিকারও, তালিম নিয়েছেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের । দুই দশকেরও বেশি প্রবাসে থেকেও এক কন্যার জননী মধুবন্তীর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা ঈর্ষনীয় । তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে - ২০০৬এ 'রক্তনদী একা' এবং ২০০৯এ 'অধরা আইফোন' । ২০১২তে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায়।নতুন প্রজন্মের জন্য বাংলা ভাষার রূপরেখা আঁকতে একাগ্রচিত্ত এই প্রবাসী বাঙালি ।




(১) আকাশ - 
অনুপম দাশশর্মা



বলছি আকাশ, দরাজ প্রকাশ
যখন দেখি তুই -
সাতরঙা ওই্ বঁড়শী বিঁধে
ধন্য করিস ভুঁই।


আবার দেখি নীল সায়রে
শ্বেত বলাকার আল্পনা,
স্বর্ণগলা মেঘের চূড়ায়
সব কবিতার জল্পনা।

আকাশ দানায় সাঁঝ জড়োয়া
কাস্তে শশী ঢালছে হিম,
মাঝদরিয়ায় ছলা ছলা
বৈঠা নাচে বল্গাহীন।

বিষাদ মনের পাষাণ গুহায়
আকাশ উজাড় কলতানি,
মনের খাতায় খোস মেজাজে-
ছন্দ সাজায় ফুলদানি !

[অনুপম দাশ শর্মা - থাকেন ক'লকাতায় । ৪৬বর্ষীয়, কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারী 
অনুপম, তাঁর পারিবারিক সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে শৈশব থেকেই গল্প, কবিতা 
ও আবৃত্তি চর্চায় অভ্যস্ত ।'আজকাল','প্রতিদিন' দৈনিকে তার কয়েকটি ছোট লেখা প্রকাশিত
হয়েছে ।]




(২) স্বাধীনতা
তুহিন সিনহা


সময়ের এ আঁধার  লুকোনো সে হাহাকার
বুকে বাজে নিদারুণ কষ্ট 
রাত-দিন একাকার  অলি-গলি খোলা দ্বার
যে মেয়েটা হয়েছিল নষ্ট !
রাত-জাগা ঘুম চোখ  ক্লান্তিতে মূক-শোক !
'স্বাধীনতা', ঘুম কেন আনোনি?
এক পেট খিদে তার  অনাহারে অধিকার
'স্বাধীনতা', ভাত কেন মাখোনি?
গোলা-গুলি-বন্দুক, মুখপোড়া নিন্দুক,
'স্বাধীনতা', তুমি নাকি আসবেই ?
কালো-টাকা এড়িয়ে বেনোজল পেরিয়ে
একশোতে পা নাকি রাখবেই ?
স্বপ্নের লুকোচুরি , সৌখিন মজদুরী
সময়ের চোরা-স্রোত বয়ে যায়...
তবু মন গায় গান, "উই শ্যাল ওভারকাম"
'স্বাধীনতা' পড়ে আছে রাস্তায়....।


[তুহিন সিনহা অশোক নগরের বাসিন্দা - তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি তুহিন কবিতায় বাস্তব জীবন বোধের 
প্রতিফলন ঘটাতে আগ্রহী । ছাব্বিশ বর্ষীয় তুহিন ছন্দোবদ্ধ  কবিতায় বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করেন ।
তুহিনের কবিতার এক অনুরাগী মন্তব্য করেছিলেন 'আপনার সৃষ্টি থেকে জীবন ধার করে বেঁচে থকি । 
আপনি কবিতা নয়, গান লেখেন' ] 

About