অকবির আকুতি

অরূপ ঘোষ


সাক্ষরা নিরক্ষরা মধুক্ষরা

ধরা অধরা অনুঢ়া প্রাণভোমরা
সব মেয়েদের কাছে আমার বিনীত নিবেদন
আকুতি বা আবেদনও বলতে পারো সকল নারীমন
নারী, প্রকৃতি, যশস্বিনী, স্বৈরিন্দ্রী সবাই তোমরা নারীই থেকো
পুরুষকে অবান্তর কিম্বা রবাহুত হওয়া থেকে বিরত থেকো
নয়তো একদিন নিয়ন্ত্রণ বিহীন বিবর্তনের চাপে
নাভিমূল উধাও হয়ে যাবে পরিবর্তনের পাপে ,
পৃথিবী নাড়ি বিহীন নরখাদকের জমিদারী হবে
এক বন্ধ্যা সময়ের কালো অন্ধকার গ্রাস করে নেবে সব,
তবে কি কন্যা ভ্রূণ হন্তাদের সঙ্গে হাতে হাত মেলাবে?
তুমি সৃষ্টির আধার হে নারী, তুমি না হলে এ’জগত থেমে যাবে

শেষের সে’দিন ভাগ্যের পায়ে অক্ষম মাথা কুটবে
সে হবে এক বেচাল পৃথিবী সেদিন, জান কি তুমি অধরা
সাতশো কোটী দু’পেয়ের দুনিয়ায় লাগবে ফুটি ফাটা রজখরা
সেই দিন তুমি চাও ওগো মাতৃরুপিণী ভালবাসার আধার প্রেমিকারা ?
নারী তুমি নারীই থেকো হয়োনা পুত্র সন্তানের লোভের শিকার

তুমিই পারো পৃথিবীকে সুন্দর করে রাখতে

নয়ত পাবে অরাজক এক পশু খামার
তোমাদের কাছে বিণীত অনুরোধ অকবি আমার
জানতো “মাতা সত্য আর পিতা এক বিশ্বাস”
তুমি দাও সন্তানেরে পরিচয় আর তার জীবনকে বাঁচার আশ
বোধ নদীর পারে বসে জেনেছি, কঠিন সত্য করেনা প্রবঞ্চনা ;
নারী তুমি নারীই থেকো,

ওগো মেয়ে তুমি মেয়েই থেকো ।


(অরূপ ঘোষ - কলকাতার বাসিন্দা, বহুজাতিক সংস্থার আপাত রুক্ষ ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসে যুক্ত কিন্তু নিজের কবি-মন তাকে দিয়ে মাঝে মাঝে কবিতা লেখায় - কারন কবিতা তাঁর কাছেও হৃদয়ের দরজা )


বিষাদের কোন অবকাশ নাই
বিচ্ছেদেও না,
মৃত্যুতেও না !


সকলেই তো ছুটে যাচ্ছি
একই দিকে !
আর একটা তুষার যুগ,
আর তো কয়েক প্রজন্ম বাকি !
যতো বেশি পারা যায় কবিতা সংরক্ষণ করা চাই 


কবিদের ও মৃত্যু হয় 
কবিদের নয় !


কবিতার সমষ্টি দিয়ে মহাকাব্য হবে
আসন্ন তুষার যুগের পরে !


বিষাদের কোন অবকাশ নাই
বিচ্ছেদেও না,
মৃত্যুতেও না !


(পেশায় গরলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শঙ্কর তালুকদার লেখেন কম কিন্তু যা লেখেন হৃদয় দিয়ে লেখেন । ভাষা ও সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ ভান্ডারের অধিকারী শঙ্কর তালুকদারের অবাধ বিচরণ
কবিতার সঙ্গে নান্দনিক শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রেও )







দেখা হবেই
              সোমনাথ মিত্র


কিছু কথা ছিল,
বলেছিলে অঘ্রাণ অপরাহ্নে
ছিলনা অখন্ড অবসর
বলেছিলাম শুনবোই একদিন, 
বলেছিলাম দেখা হবেই
চিরায়ত উৎসব অঙ্গণে ।


এখন অদ্ভুত মত্ততা
দেহ ও মনের সব কোণে কোণে
কিছু বলতে পারবোনা
যেমন পারেনা দীঘির 
টইটম্বুর জলের শালুক
যেমন পারেনা বসন্তের 
আবীর রাঙ্গানো কৃষ্ণচুড়া
যেমন পারেনা সোনালি সকাল ।
আজ তোমার করপুটে অঞ্জলি
আজ কথা নেই, তবু শুনবোই একদিন
দেখা হলে উৎসবের নিকানো উঠানে ।


( ডঃ সোমনাথ মিত্র , বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ - সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ । এ সবই তাঁর পেশাগত পরিচয় । আইনের জটিল ক্ষেত্রর বাইরেওরয়েছে তাঁর এক মননশীল কবি মন , একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিকও বটে । লেখেন কম, কিন্তূ কবিতাকে যারা বুকের মধ্যে লালন করেন-সোমনাথ মিত্র তাদেরই প্রতিনিধি । )


   

সিদ্ধি লাভ
             সমীর ভট্টাচার্য

              
নদী আমাকে চোখের জল দিয়েছে
আমি তার পাশে এসে বসি দিন- রাত
ফুল আমাকে গন্ধ দিয়েছে বিলিয়ে
আমি তাই লতা গুল্মর কাছে যাই
আকাশ আমাকে নীলের সিদ্ধি লাভ
স্বপ্ন দিয়েছে
আমি তাই সমুদ্র মন্থন করেছি ।
নদী ফুল লতা নীল
যে কোন একের কাছে
আমি আজ
সিদ্ধি লাভে
বুদ্ধ হয়েছি ।
( সমীর ভট্টাচার্য বয়সে এখনো তারুণ্য কিন্তু তার কবিতার ভাঁড়ার অফুরান ।পেশায় প্রাথমিক   শিক্ষক, সমীর লেখেন প্রচুর ‘অন্যনিষাদ’ সাহিত্য পত্রিকার সহ-সম্পাদক । )


উত্তর দাও কবি

স্বপ্ন কুমার চক্রবর্তী
o     
 "আশা নিয়ে ভাষা আর ঘৃণা নিয়ে কবি"
সত্যি যদি -
কোথায় ঘৃণার বারতা --
হে কবি-
তোমার কলমের মুখে -
এখনো ঠান্ডা নীরবতা-
মানুষের রক্ত রেখেছ হিম শীতল-
মানুষ কী সরীসৃপ -
ঘৃণার উত্তাপ দাও কবি-
সে আগুনে সেঁকে নেব শীতল পৃথিবী--।
(বয়সে প্রবীণ স্বপ্ন কুমার চক্রবর্তী নিজেকে কবি বলতে অনীহা,  কবিতার পাঠক বলতেই ভালোবাসেন। শিলিগুড়িতে পড়াশুনা করা স্বপ্ন বাবু এখন কলকাতার বাসিন্দা । 
তুই হাঁটবি তো ?
              দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য


জয় পরাজয় ভুলে যাওয়া কোন
নিশীথ রাতের মরিচিকা দেখা রাতঘুম বলে,
ডটপেনে লেখা কোন আঁকিবুকি
কোন সরু গলি থেকে বেরোনো রাতের পরী
তোকে নিয়ে যাই
শিকড় বিছানো নীল সাগরের অতল তলের
চেনা কোন পোট্রেট এ ,
রঙ্গিন আলোর হিসেব মাখানো
নিরুপায় সেই সভ্য লোকের শালিনতা ঢাকা
চৌরাস্তার পাশে,
তুই হাঁটবি তো ?
যদি ষ্ট্রিটল্যাম্পের আলো দেখা কোন
জড়বস্তুর মায়াবি মিছিলে রাজপথ
শুধু ভাঙ্গা গলির পুরোনো প্ল্যাকার্ডএ 
তার দিয়ে বাঁধা
পুরোনো পায়ের শব্দ 
হলুদ পাতার স্তুপ হয়ে যাওয়া
কবিতা ঠাশা আঁচল কোন রাতে
তুই হাঁটবি তো ?

চাঁদ মামা
         দেবতোষ মাইতি

কোন কোন রাষ্টের পতি
যখন ক্লান্তিহীন মীনার গড়ে যেতে
অস্ত্রের দাপট গড়ে তুলে
পৃথিবীর মাটি জল আকাশ
জরীপ ক'রে নেয় কার কতটুকু জমি,
তখন পরোয়া করেনা
অসময়ে কার কোথা ছিড়ে গেলো মাটির বন্ধন
কোন শিশু জননীর গভীর বন্দরে
বিকলাঙ্ক হলো
উন্মত্ত সৈন্যের লালসায় শেষ হলো
কতসহস্র জননীর গোপন বৈভব ।

পৃথিবীর সমূহ সম্পদ কামনার দৌরাত্মে
সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে নিতে ব্যস্ত যখন সন্ধ্যার পানপাত্রে
তখন চাঁদকে ডেকে পাঠায় জননী
পৃথিবীর সান্ধ্য আবেশে
তার আত্মজার কপালে টিপ পরাতে,
সেখানে একাকার হয়ে যায়
মালিক পাড়ার লালুর বউ
আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট পত্নী ।






ঠিক-ঠিকানা    
     তরুণ বসু                

গঞ্জে কে যাচ্ছ  আমার জন্যে পোস্ট কার্ড এনে দিও
আমি চিঠি লিখবো কেমন বেঁচে আছি ছেলেদের
চোদ্দপুরুষের ভিটে গৃহলক্ষ্মীর আসন সামলাতে পারিনা তো
বলবো তোরা বুঝে নে আশ্রমবাসী হবো আমরা দুজন
গঞ্জে কে যাচ্ছ  এনে দাও পোস্ট কার্ড আরো একবার  ।

সেবার তো তোমরাই ডাকে ফেলেছিলে উত্তর এসেছে তার
বৃদ্ধাশ্রম রেখেছে অনুরোধ
ছেলেরা যেমন চেয়েছিল তেমনটি নয়
এক ঘরেই থাকবো দুজন বৈতরণী পেরোবার আগে
ভেবেছি গৃহলক্ষী সঙ্গে নেবো – একমুঠো মাটি এ ভিটের
পোস্ট কার্ড এনে দাও  শেষ বারের মত 
শেষ বারের মত যে চিঠি লিখবো ছেলেদের
তাও দেবো তোমাদের হাতে তবের
ইচ্ছে হলে ডাকে দিও নয়তো এসব রইল তোমাদের হাতে ,
-      চোদ্দপুরুষের ভিটে , শূন্য ঘর দোর , আম-কাঁঠাল ছায়া .
ওরা ভালো থাক
আশ্রমের চেওনা ঠিকানা  ।
     ---------
 ( তরুণ বসু ডানকুনি অঞ্চলের এক বিশিষ্ট কবি , ৫৫ পেরিয়ে  এখনও  কবিতায় অফুরান, ‘অন্যনিষাদ’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক )

স্বদেশকে ভলোবাসতে হলে
দীপঙ্কর বিশ্বাস

গান গাইব বললেই কি গান গাওয়া যায় ?
সে গান কি পাখির আনন্দ দিতে পারে ?
এগিয়ে যাব বললেই কি এগিয়ে যাওয়া যায় ?
সে যাওয়াকি নদীর গতির মত হবে ?

দেশকে ভালবাসব বললেই কি ভালোবাসা যায় ?
দেশের ধূলোকে যদি সোনার রেণুর মত ভাবো,
দেশের মানুষের মধ্যে যদি পাও রক্তের নৈকট্য-মহিমা
তাহলে সে পথে যাও –
যদি বোঝ মানুষের যন্ত্রণার দাহ
যদি তার অন্তরের সঙ্গী হতে চাও
তাহলে সে পথে যাও ।

মানুষকে ভালোবাসতে হলে মানুষের মত হও
স্বদেশকে ভালোবাসতে হলে মাটির কাছে নত হও ।
আহত মানুষের মর্ম অভিমানকে যথার্থ মর্যাদা দাও
অনুকম্পা অহঙ্কার নয় , ভালোবাসার নিঃশঙ্ক নীরবতায় ।
গান গাইব বললেই কি গান গাওয়া যায় ?
স্বদেশকে ভালবাসব বললেই কি ভালোবাসা যায় ?

(দীপঙ্কর বিশ্বাস পেশায় স্কুল শিক্ষক , ডানকুনি অঞ্চলের এক বিশিষ্ট কবি ও গীতিকার । দীপঙ্করের কবিতা অহেতুক শাব্দিক জটিলতা ও অস্পষ্টতার বেড়াজালে দুর্বোধ্য নয় । তাঁর কবিতায় সহজ বোধ্যতার সঙ্গে থাকে চিন্তার গভীরতা, মননের ঔজল্য ও ব্যঞ্জনার ব্যাপ্তি ।  এখনো পর্যন্ত তাঁর নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সাম্প্রতিকতম প্রকাশ - 'এমন স্বদেশ' । দীপঙ্কর – ‘বাংলাভাষার মর্যাদা’দাবির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত , ডানকুনির ‘প্রত্যয় ভাষা ও সংস্কৃতি পরিষদ’এর পতিষ্ঠাতা সম্পাদক ।)
বাংলা কবিতা রূপ রসে উজ্বল ও বিচিত্র , পরিমানেও প্রচুর কিন্তু সেই তুলনায় পাঠক সংখ্যা হয়তো সীমিত । জীবনে একটাও কবিতা লেখননি এমন বাঙালি কি আছেন ? সংশয় হয় । কিন্তু কবিতা পড়েন ? একথা জিজ্ঞাসা করলে নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যাবে 'আধুনিক কবিতা' বুঝিনা । আবার একথাও ঠিক যে অজস্র ছোট কবিতা পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তারা একটা 'কবিতা ভালোবাসা' পাঠক মন্ডলী তৈরী করেন, কবিতার আসর আয়োজন করেন । কবিতার পাঠক নেই বলে আমাদের হাহাকার আছে কিন্তু অনামি কবিদের কবিতা আমাদের কাছে পৌছাতে পারে কই ? সেই অভাব কিছুটা পুরনের জন্য এই ব্লগ । 'অন্যনিষাদ'এর মুদ্রিত সঙ্খ্যা নিয়মিত প্রকাশিত হয়, তার একটা নিজস্ব পাঠক মন্ডলী আছে , কবি ও কবিতাকে আরো বেশি জানার জন্যই এই ব্লগ । না আমরা কোন বিশেষ ধারার কবিতার কথা বলছিনা , বুদ্ধদেব বসুর কথা উধৃত করে বলি 'আধুনিক কবিতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা যেন সবিস্ময়ে এই কথাটা উপলব্ধি করি যে ঐক্যের মধ্যেও বিপরীতের স্থান আছে , বিরোধের মধ্যেও সংহতি্র সম্ভাবনা ' ।

কাকে বলবো আধুনিক কবিতা ? আবার ও
বুদ্ধদেব বসুর কথাই উধৃত করি - " আধুনিক কবিতা এমন কোন পদার্থ নয় যাকে কোন একটি চিহ্ণ দ্বারা অবিকল ভাবে শনাক্ত করা যায় । একে বলা যেতে পারে বিদ্রোহের , প্রতিবাদের কবিতা , সংশয়ের, ক্লান্তির, সন্ধানের,আবার এরই মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে বিস্ময়ের জাগরণ , জীবনের আনন্দ । বিস্ববিধানে আস্থাবান চিত্তবৃত্তি । আশা আর নৈরাশ্য, অন্তর্মুখিতা অ বহির্মুখিতা,সামাজিক জীবনের সংগ্রাম ও আধ্যাত্মিক জীবনের তৃষ্ণা এই সবগুলো ধারাই খুঁজে পাওয়া যাবে" - আধুনিক কবিতায় ।
আমরা এই সব ধারার কবিতাকেই বুঝতে চাই ।

About