আলোয় ফেরা
সু মি ত র ঞ্জ ন দা শ

আমিতো কেবল শব্দ ওড়াই
ভুলে থাকি সোনার সকাল
ঋতুমতী সেই শব্দের টানে
পেরিয়ে যাই শ্রাবণ আকাল,
এখন কেবল ছায়ারা ডাকে
ওড়না ঢাকা গোপন খাঁজে,
বলে - জাগালে না, জাগালে না
_____
তুমি মোরে সংঘমিত্রা ধ্যানে ?
জোৎস্না নামে অভিসারে
চুরি হয়ে যায় পাহাড়ের ঘ্রাণ
নগ্ন আকাশের বুকে পড়ে থাকি
কত শত আলোক বছর ধরে,
অন্ধকারে ডেকে ফিরি
পার করি যত রোদের বেলা
পান পাত্র হাতে বলে উঠি -
আয় পাখি আয়, ঘর বাঁধি তোর সাথে
__
ভালোবাসায় সংগোপনে ।

আমি আত্মহত্যা করব না
ক চি রে জা

আমি আত্মহত্যা করব না উত্তরাধুনিক কোনো পদ্ধতি মেনে, 
সারাদিন যে গাছের ছায়া কুড়িয়ে কুড়িয়ে জমা করি, সে গাছের মাঝারি উচ্চতার 
ডাল বেছে নিয়ে প্রচলিত কোনো দড়িতেও ঝুলব না,
আমি মরে প্রমান করব কিভাবে মরতে হয়
তোমাকে ভালোবাসব তবে দেহের অনুকুলে আমার কোনো সমঝোতা নেই
মনে পড়ে, সংঘের সংহতি আমি ঠিক সেই পদ্ধতি মেনে সমর্পিত হব
অনাকর্ষনীয় থাকব আর গৃহিণী অথবা বেশ্যাদূটোর কোনোটাই মেনে নেব না
বাধ্য নই, তবু চাই গন্ধকমিশ্রিত একটি শিশু, তার গা চাটতে চাই, 
চাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচাতে,
উত্তরাধুনিক পদ্ধতিতে সুইসাইড করব কি না, সেও আমি কাঁঠাল গাছের কাছেই শিখে নেব
যার আয়োজন অথবা আয়োজনহীনতায় চায়ের বাক্সের ভেতরে কিংবা মশলা ঘরে’,
একটা ম্যান সাইজ আরশি, একটা হিট রেডিএশন গান, আইসব্লু দেয়ালের ঘর, শাদা ছাদ, ফ্যান,
ট্রে তে অমোঘ আপেল, প্যাড, ইকোনো এবং তালা চাবি...‘’
আত্মাকে বোঝানোর চেষ্টা করব, স্বেচ্ছামৃত্যু কোনো উদভ্রান্ত ধারালো ব্লেড নয়, ক্লান্ত ট্রামের চাকা নয়, 
কবিতার অপর শব্দের সুড়ংগ যেখানে সুটকেস খুলতে খুলতে শামীম কবীর পেয়ে গিয়েছিল 
সন্ধ্যার ফাঁকা বাড়ি,ফ্যান,টুল আর নিজের সাদা চাদর।

অনুরঞ্জন


লা ব ণ্য কা ন্তা 

কতদিন চাঁদের জোছনা থেকেও দূরে থেকেছি,
প্রতিদিনের চাঁদ হাতছানি দিয়েছে ;
অনুক্ষন কোয়াক পাখিদের বিরহ সঙ্গীত
শোনতেই ব্যস্ত থেকে গেছি ...অথবা 
অপরিজিতার সাথেই কথা বলেছি।
কিন্তু আজ নিজেকে অনুরোধ করেছি,
কোয়াকের বিরহ সঙ্গীত থেকে 
সরে যেতে । অপরাজিতাকে 
বলেছি মুকুরেই ক্লান্তি মুছে 
ফেলো ... আজ ডেকোনা 
আমায় আসন্ন বেলায়।

বৈশাখী অলস হাওয়া আজ ডেকোনা আমায়,
মোহণীয়া দুপুরে আজ গদ্যকেও বলেছি
একটু ছুটি দাও কিছু 
কথামালা লিখবো প্রিয় অশ্বথের ছায়ায় ; 
প্রিয়তম তুমি কোথায় ?
ঝলমল সন্ধ্যায় যখন কোয়াক পাখিরা 
ফিরে যাবে নীড়ে, অপরাজিতা মুকুরেই
থেকে যাবে একা …… তখন তিথির
আকাশ জুড়ে দেখা দেবে পূর্ণিমা চাঁদ ;
একাকি দাঁড়াবো উনুভূবিন্দুর সাথে
রুপালি জোছনায় ঝরা কৃষ্ণচূড়ায়
রাঙাবো মন। তোমাকেই,
আজ শুধু তোমাকেই 
খুঁজবো অনুরাগের 
রক্তিম অনুরণনে।
প্রিয়তম, তুমি কোথায় ?

বিষাদ
প্তা শ্ব ভৌ মি

বিষাদ জমে জমে
নিথর প্রতিমা
নীরব রাতের কালো
গিলে খাবে প্রতিমার 
বিবশ শরীর

জোনাকির জাল বুনে বুনে
বোকা কবি
এনে দেবে প্রাণ

এখনো বোঝেনি ও
ভালোবাসা বিষাদের
ভিন্ন এক নাম

সংকেত
শি ব লী শা হে দ

আমায় তিনটি সংকেত দেখাও
আমি বুঝবো তুমি নির্দোষ ;
চোখের পাপড়ি খুলে
পড়বো অন্তর্দহন
জেনে নেবো কোন দোলাচলে
জীবন কাঁপে তোমার
জলের মতো থেমে থেমে ।
আমায় তিনটি সংকেত দাও
আমি তোমায় বলে দেবো
মৃত্যু তোমার কেমন দোসর
কোন সুযোগে
সে আড়ি পেতে
জলটুকু ফেলে দেবে ।
বাইরে তখন পাতাদের গাঢ়ঘুম !


অতএব কৌন্তেয় নিপাতে গেলে
রা জ র্ষি ঘো ষ

অবশেষে কৌন্তেয় নিপাতে গেলে উলুধ্বনি করে উঠল যক্ষেরা
ব্যাঙেরা বিউগল বাজালো; রাজামশাই মুখ চুম্বনে আলোকিত করলেন ভার্যার সুগন্ধী দেহ
দু এক খানি প্যাঁচা ডানা মেলল ধানসিঁড়ি তীরে ;
আকাশের এক কোণে ঘর ছাড়ল একটি ব্যতিক্রমী তারা 
ক্লান্ত মধুকবি গেলেন অস্তাচলে, বিদ্যাসাগর সাঁতরে পাড় হলেন এক বুক উথাল দামোদর
আর তারপর...

তারপর , নারকেল গাছের মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বৃষ্টি এল আমার এ বারান্দায়
বৃষ্টি এল মহাকরণের জানলায়, ফাইলবন্দী রাইটার্সের গোপন অলিন্দে
যদিও, ছাদে কাকভেজা মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন এ সবই চক্রান্ত বিরোধী শিবিরের
ঘন ঘন দাঁড়ি নাড়াল বাম, বিরোধী, শরিক দল; কলকাতা হাঁটল মৌন মিছিলে।
অবশেষে কৌন্তেয় নিপাতে গেলে
কেউ হাসল, কেউ কাঁদল, কেউ করতালি দিল খুব জোরে

অবশেষে কৌন্তেয় নিপাতে গেলে লাশকাটা ঘরে চলল পুলিশি উৎসব
একে একে ছিন্ন হল দেহকান্ড, মাথা; বুলেটক্ষত থেকে নিঃসৃত হল হলাহল;
উলুখাগড়ার বনে মুক্তো কুড়োতে গিয়ে সেদিন প্রাণ দিল প্রবীণ ক্রৌঞ্চ।
যমুনার তীরে শীর্ণ ব্যাসদেব শিউরে উঠে দেখলেন
কে যেন কপিরাইট চুরি করে নিল রবীন্দ্রসাহিত্যের।
আর তারপর...
তারপর একগুচ্ছ সোঁদা অভিমানে কাঁদল জননী
আয় ফিরে আয় বাছা এই বুকে তবে,
জারজ সন্তান হয়ে কড়া নেড়ে আয় মৃতবৎসা ইছামতী ধারে...
আয় চোখ ভরে দেখি কত অভিমান জমে আছে দেহে
আয় তবে এই বুকে, গেহে; কাছে আয়
আয় ভরা বর্ষা দুপুরে, আয় কাছে নবান্ন উৎসবে। আয় দুটো ভাত মেখে দিই...
অতএব কৌন্তেয় নিপাতে গেলে নিষ্ফলা কাঁদল বিধবা

নিশিযাপন
স্মৃ তি মু খা র্জী

এক গলা লাল জলে সন্ধ্যেটা ডুবে গেল।
এস্রাজে সুর ছিল ধ্রুপদী গায়ক
ঝাড়বাতি ভেঙ্গে দিল মালকোষ
মিনারের গায়ে গায়ে নোনা স্রোত ,
মতিহারি কন্যার জল ছিল স্বচ্ছ ধূসর।
ঢেউ ওঠে উত্তাল টলটল
আকাশের মুখগুলো অন্ধ
রাশি রাশি তুল ওড়ে আকাশে,
মতিহারি কন্যার লাল ঠোঁট
স্বচ্ছতা ফিকে হয় সন্ধ্যার আঘাতে।

পারাবত ব্যাস্ত, গোটায় ছেঁড়া পালক
কিন্তু
বার বার বার বার বার বার আবার----------
বাদুড়ের উল্লাস।
মন্দিরে ঘণ্টা্‌ ,রুমঝুম, টুংটাং
হাত ডাকে পা ডাকে
অন্ধ চাঁদ যায় আসে আকাশে।
মতিহারি কন্যার ঘোলা জল খোলা চূল
চুলে গিঁট সহস্র শতকের
তাম্বুর দাঁত ঘষে নাভিতে।

এক বুক লাল জলে মারা গেল রাত্রি
মালকোষ থেমে গেল ক্লান্ত
ঘুম নামে মতিহারি কন্যার চক্ষে,
এক ঝাঁক শকুন ছিঁড়ে পড়ে সারসির বক্ষে।। "

আলিঙ্গন
শা ন্ত নু মৈ ত্র

ডানা মেলেছিল স্বপ্নেরা,এক অশান্ত বিকেল বেলায়
ছিলনা কোনো ফ্যাকাশে অবসাদ,
অজান্তেই পার হয়েছিলাম এক অজানা প্রান্তর
ঠোঁটের কোণে ছিল তোমার ঠোঁটের স্বাদ ।
একা একা কাটে দিন বেদনার বঞ্চনায়
নিষ্ঠুর সেই সত্যিরা আজ দাঁড়িয়েছে মুখোমুখি ,
অনেক যুদ্ধ শেষে নিঃস্ব সৈনিক আমি
ঠুনকো অস্ত্বিত্বের মাঝে ... আমি একাকিত্বেই সুখী ।
মানবিকতাই হয়ত পরিচয় আমার ...
তবু মানুষ হতে পারিনি
যুদ্ধ থেমেছে অনেক আগে ,
আজও আমরা হারিনি ।
ফিরিয়ে নেওয়া দুচোখ জ্বলে
নিঃস্তব্ধ এক শ্মশানে
পুড়ে গেছে মন ... অশালীন সেই
তোমার নীলাভ আলিঙ্গনে।
সংক্ষিপ্ত চেতনার বিলাসিতায়
অবাধ্য দৃষ্টিকোণে
ধর্ষিত এই জীবনবোধ ,
একলা প্রমাদ গোনে।
কারাগার জুড়ে মানবিকতার শির:চ্ছেদ
রক্তের বান ভাসে
হাজার হাজার স্বপ্নের ভিড়ে
একটি প্রশ্ন আসে ।
শরীর নিয়ে ছেলেখেলা
রক্তস্রোত ,সাদা চাদর জুড়ে
নির্লিপ্ত কোন চিতার মাঝে
অবৈধ প্রেম যাচ্ছে পুড়ে ।। 

কৃষ্ণচুড়ায় রং লেগেছে
শৈলেন্দ্র প্রসাদ চৌধুরী মানিক 

তুমি তো আমায় কথা দিয়েছিলে 
এমনই কোন এক মাঝ রাতে 
আমার হয়ে আসবে । 
কই তুমি তো এলে না !
পৃথিবীর গান থেমে গেছে 
সবুজ পাতা ঝড়ে পরেছে । 
বহু দিন হয় এখানে বৃষ্টি হয় না 
প্রবল খরা প্রকৃতির । 
তপ্ত বাতাস বয়ে যায় 
বিভত্‍স গরম বয়ে যায় 
শীতল হব শীতল করবে 
তবুও তুমি এলে না ! 

ইদানিং রাতে ঘুম আসে না 
কী সব ছাইপাঁস ভাবি 
সাদার মাঝে কালো ভাবি 
কালো মাঝে জল ভাবি 
জলের মাঝে আকাশ ভাবি 
আকাশের মাঝে তোমাকে ভাবি 
তবুও তুমি এলে না ! 

আজ তোমাকে আসতেই হবে 
আজ তোমাকে বলতেই হবে 
তুমি কাকে ভালবাস ? 
আজ তোমাকে কৃষ্ণচুড়ার রং এ 
রাঙ্গাবো অধর খানি ! 
তাই আজ কৃষ্ণচুড়ায় রং লেগেছে 
হয়তো কৃষ্ণ কালো মেঘ এসে 
উড়ায়ে নিয়ে যাবে সব কিছু । 

এসো হিমালয়ের বন্ধু 
কাছে এসো আর হারায়ে যেও না !

জীবন 
নি র্মা ল্য ব ন্দ্যো পা ধ্যা য়

দু-দুটো জীবন রেখেছি হাতের কাছেই
ঘড়িবাঁধা আর বেবাক ভুলেতে ভরা
একদিকে থাক ভাসমান যৌবন
সময় কুসুমে উপগত হোক জরা...

যাবো বলে কার ভয়
হা-হুতাশী সংশয় 

এ মুখ আমার নয়

অপচয়, অপচয়...

খেয়াল খুশিতে খরচা করতে পারি
ডানা মেলে দ্যায় নীলপরী রোদসুখে 
দিনগোনা হাত পিয়াসী হাত কে বলে

স্মিত রুপকথা লেখো মৃত্যুর বুকে...

জিতবো জানি
পৃ থা রা য় চৌ ধু রী


শঙ্খচূড়ের লক্ষ ফণা মেঝেয় ছড়িয়ে
রোজ খেলনা বেছেছি,
আর চুমু খাবার ছলে, জারক শুষে নিয়ে
চরম আনন্দে দেখেছি শিথিল সৌন্দর্য।

অনেক শতাব্দীর ক্ষিধে মেটাতে এসেছি
লকলকে জিভে আমিশ
আরও চাই বলে হাহাকার করেছি, আর
আদুরে অধিকারের ডাক ভেবে নিঃশেষ হতে এসেছ।

নিকোটিন কালো দাঁতে মরণ কামড় দিয়েছি
ফোঁটা রক্তে অমৃত
ঘুমের চাদরে সাজিয়েছি চিতা, চন্দন গন্ধে
পোড়া শরীর লুকিয়ে করেছি প্রমাণ লোপ।

পৌরুষের দাবি রেখেছি প্রতি ঘন্টার হিসেবে
নির্লজ্জ আব্দারের ভাঁজে
কুটিল চাহিদার ব্যাকগ্রাউন্ডে কোকিলের ডাকে,
বুঝে ফেলেছি আজ নিরুপায় ভালোবাসো।

কিছু কবিতা
মৌ দা শ গু প্তা

আদম ও ঈভ

জীবনের সাজঘরে পাশাপাশি বসবাস,
সারল্যে, আনন্দে, মন ভরা বারোমাস,
সর্পিল জিজ্ঞাসা,বড় কূতুহলী মন,
স্বর্গীয় আপেলের মোহভাঙ্গা প্রয়োজন।

এখনো

এখনো প্রেম আসে, দেশে কি পরবাসে,
পাখীরা নীড় বাঁধে একান্তে ভালোবেসে,
এখনো ফুল ফোটে.স্বপ্নেরা ভেঙ্গে যায়,
বানভাসি মন মেশে জীবনের মোহনায়।

ইতিহাস

মুখবন্ধে প্রতাপ ছিল ক্ষণস্থায়ী দিন,
পূর্বজদের রক্তে ছিল অনেক দিনের ঋণ,
সত্য ছিল,মিথ্যা ছিল,ছিল গল্পগাঁথা,
সব যদিও অতীত এখন,মনে আসন পাতা।

ঋণ

স্বপ্ন দেখে কাটাই সময়,উদাস হল দিন,
মেঘলা আকাশ, ব্যস্ত দুপুর, বিরাম অন্তহীন।
জীবন খাতায় দিন প্রতিদিন বাড়ছে সুদের মাশুল ,
মনের কাছে মন হারিয়ে সুদে আসলে উশুল।

রঙ্গিন সুখ

রাধাচূড়ার পাপড়িরঙা সুখ
বৃন্ত ছিঁড়ে ঘাসেদের সংসারে
তৃণদপিহীনহয়ে থাকা ঝকমারি
তবু মুখ ঢাকি চুপ-কথাদের ভিড়ে
ভেজা চোখের পাতায় আগুন জ্বালি
সিঁদুর কাঠি জয়ের তিলক কাটে
নিজেকে নিজে রঙ্গিন সাজিয়ে তুলি
সুখ দুখের ভরা ঘট হৃদিপটে ।।

পোড়া এ মন

উছলে ওঠে মন খারাপের হাওয়া
সাঁঝের বেলায় ধুলো মাখা আঁচলে,
সময় এঁকেছে উদাসীন আঁকিবুঁকি,
পোড়া মন ডোবে ভালোবাসা নদী জলে।।





















দেবব্রত বিশ্বাস
                     
জন্ম – ২২ আগষ্ট (৬ই ভাদ্র)১৯১১ বরিশাল, মাতুলালয়ে
পৈত্রিক নিবাস – কিশোর গঞ্জ, ময়মন সিংহ
    
শিক্ষা – মেট্রিকুলেশন কিশোর গঞ্জ স্কুল(১৯২৭) ,আনন্দ
মোহন কলেজ, কিশোর গঞ্জ
কলকাতায় সিটি কলেজ ও বিদ্যাসাগর কলেজে । অর্থনীতিতে স্নাকোতর (১৯৩৩)


প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড প্রকাশ – ১৯
চাকুরী জীবন – হিন্দুস্থান ইন্সিওরেন্স ১৯৩৪ , অবসর গ্রহণ  - ৩০ আগষ্ট, ১৯৭

গ্রন্থ রচনা – ‘অন্তরঙ্গ চিন’ এবং আত্মকথন , 
ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত।

মৃত্যু – ১৮ই আগষ্ট ১৯৮০



তিনি আসেন...ভিক্ষা নিতে

অ মি তা ভ দা শ






সে এক বিশাল মানুষ তিনি !!

সব গাছ ছাড়িয়ে...সব বোধ বাড়িয়ে…
বিশাল !!

উঁচু উঁচু উপলব্ধির পা ফেলে পাহাড় ডিঙিয়ে যান
তিনি একেবারে...সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে...
অথবা জল ছপছপিয়ে...
মন্দ্র ভারী বাতাস এনে...শ্রাবণ ঘন গহন মোহে
গোপন কিন্তু কাঁদিয়ে-যাওয়া চরণ ফেলে...আর
কি অনায়াস রোমান্সে, গায়ে কাঁটা দেওয়া রোমাঞ্চে...
অবিশাস্য অবলীলায় আকাশ-ভরা সূর্য তারা টেনে নাবান...
তাঁরই পদক্ষেপ-ধন্য ঘাসে ঘাসে...

আমি পা ফেলি...বিশাল সে পদচিহ্ন...মন-বুদ্ধের পা...সে চরণ
সে পদচিহ্নে...আমার গানের চরণ মেলাই...
আমি বিহ্বলতায় বিহ্বলতায় ডুবে যাই !! ছুটে যাই পিছন পিছন...
চার বছরের ছোট্ট আমি...ষোল বছরের প্রথম প্রেমিক...মাঝবয়সের তরুণ …
সব আমি’রা -- দৌড়াতে থাকে তাঁর পিছন পিছন !!
ধরবে বলে !! তাঁকে !! ভগবানকে !!

এক্কেবারে নিজস্ব ভাললাগার স্পর্ধায় উনার চাদরের খুঁট ধরে টান দিই...
উনি সহাস্যে ফিরে তাকান –
আমি বলি..."গান শেখাবেন?
কি করে যে অমন মন্ত্র বলেন?? দেখান!!
এই নিভৃতে....যেখানে আপনি দেবতা...একা!!"

তিনি হাসেন...তিনি বলেন "আসবো..
আসবো তোমার দ্বারে ভিক্ষা নিতে !!"

আমার চোখ দিয়ে দরদর দরদর করে জল পড়তে থাকে –
আমি দীক্ষিত হই !!

সেই থেকে রোজ পরপর দরজা খুলি.. দরজা খুলে যাই --
চার দিকে ! ভিতর বাহির ! গানের পাখি ওড়াই –
যদি তিনি আসেন !
কতো দরজাই তো -- এখনও খোলা বাকী !
আমি ওড়াই..ওড়াই গানের পাখি !! প্রাণের একটাই যে নিশানা!
আসবেন তিনি চাবি নিয়ে? ঝড় হয়ে? একটিবারও কি আসবেন না??

গভীর থেকে গভীরতর হয় শ্বাস…ঘন মধু হয় প্রেম; মনের খেজুর রসে
টুপ টুপ টুপ করে জমে জমে মিশে... উপচানো যেদিন হয় প্রাণ !!
বেঁচে আছি কি দারুণ কি দারুণ কি দারুণ !! সে অনুভবে ভরে ওঠে গান
সে বিশ্বাসে -- যে দিন ছাপায়..........আকাশ !!

সেই দিন..এসে দাঁড়ান....আমার দরজাটিতে
একলব্যর গুরুদক্ষিণা... সেই 'ভিক্ষা' নিতে...

স্বয়ং তিনি.......দেবব্রত বিশ্বাস !!


দেবব্রত বিশ্বাস : শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলী / ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়


দেবব্রত বিশ্বাস কি শুধুমাত্র একজন প্রথিতযশা রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ছিলেন ? আমার কাছে এ প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত ভাবেই ‘না’ । তিনি ছিলেন আরো কিছু ।

দেবব্রত বিশ্বাসের জীবনটাই সংগ্রাম । তাঁর দূরারোগ্য ব্যাধি হাপানির বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা তিনি নিজেই বলে গেছেন , কিন্তু সেটা গৌণ । মুখ্য হল প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে তাঁর জীবনভর সংগ্রাম । শৈশবে ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণের কারণে গোঁড়া হিন্দুদের কাছ থেকে পাওয়া যন্ত্রণার বিরুদ্ধে নীরব সংগ্রাম,যৌবনে গণচেতনা জাগ্রত করার আহবানেসমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম, আর জীবনের উপান্তে পৌছে তার গাঙ গাওয়া বন্ধ করে দেবার বিরুদ্ধে সংগ্রাম । হয়তো থেমে গেছে। কিন্তু আপোষ করেননি । সেই আপোষহীন মানুষটিকে নিয়েই এই লেখা ।

দেবব্রত বিশ্বাস প্রথাগত ভাবে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেননি বা শান্তিনিকেতন থেকেও রবীন্দ্রগানের পাঠ গ্রহণ করেননি । অথচ রবীন্দ্রগানে ছিল তার অনায়াস অধিকার । তিনি যত রবীন্দ্রগান গেয়েছেন প্রায় সমপরিমান অন্যগানও গেয়েছেন । কিন্তু রবীন্দ্রগানে তাঁর গায়কীর গুনে আমাদের অন্তরে এক নবতর উপলব্ধির সন্ধান দিয়েছিলেন । কবে থেকে তিনি গান গাওয়া শুরু করেছিলেন তা তিনি নিজেও মনে করতে পারেননি । তাঁর নিজের কথায় “ গান গাইছি তো গাইছি । ছোটবেলার দিনগুলি থেকে শুরু করে শুধু গান শুনেছি আর গেয়েছি”

পূর্ব্বঙ্গের এক গোঁড়া ব্রাহ্ম পরিবারে দেবব্রত’র জন্ম । তিনি বলতেন “রবীন্দ্রগানের জন্ম ব্রাহ্মসমাজে, আমার জন্মও ব্রাহ্ম পরিবারে, সুতরাং রবীন্দ্রগান আমার ভাই”। ব্রাহ্ম পরিবারে উপাসনার জন্য গান গাওয়া ছিল আবশ্যিক , তাই মায়ের কোলে চড়েই তাঁর গান গাওয়ার প্রথম পাঠ । এই ব্রাহ্ম সমাজের এক প্রার্থনা সভায় রবীন্দ্রনাথকে গান শোনানোর দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাসএবং কি আশ্চর্য ! রবীন্দ্রগানের জগতে তিনি যখন অগণন মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় লোকপ্রিয়তার তুঙ্গে তখনই রবীন্দ্রগানের জগতে তিনি ব্রাত্য হয়ে গেলেন । তাঁর নিজের কথায় “আমি জন্মেছিলাম ম্লেচ্ছ হয়ে – শেষ জীবনে রবীন্দ্র সঙ্গীত জগতে হয়ে গেলাম হরিজন” ।

দেবব্রতর পিতামহ কালীকিশোর বিশ্বাস ময়মন সিন্ধ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার ইটনা গ্রামে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন । গোঁড়া হিন্দুরা তাঁকে একঘরে করে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেছিল । বিরিশালে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম । শইশবে বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর হিন্দু সহপাঠিরা তাঁকে ম্লেচ্ছ বলতো । ১৯২৭ এ কিশোরগঞ্জে মেত্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশকরে কলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি হলেন এবং সেখান থেকে ইন্টার মিডিয়েট পাশ করে ভর্তি হলেন বিদ্যাসাগর কলেজে । এই সময় সেকালের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ – সুরকার হিমাংশু দত্ত, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ সেনগুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে পরিচয় হয় কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের প্রার্থনা সভা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত গান করতেন । ১৯৩৪এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম এ পাশ করে হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানীতে চাকুরী জীবন শুরু করলেন । প্রথম একবছ বিনা বেতনে চাকরী, পরের বছর থেকে পঞ্চাশ টাকা মাসিক বেতনের স্থায়ী চাকুরী । হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স পরে ‘ভারতীয় জীবিন বীমা নিগম’ এ রূপান্তরিত হয়, সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে ষাট বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন ।

দেবব্রত তাঁর আত্মকথন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ গ্রন্থে জানিয়েছেন “আমার সারা জীবন কেটে গিয়েছে কেরাণীগিতি করে, এরই মধ্যে কয়েকটি বৎসর গণচেতনা উদবুদ্ধ করার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নানা ধরনের দেশাত্মবোধক গা্ন করে আর বাকি সময় আমার ব্যাধির সঙ্গে সংগ্রাম করে” । আজীবন অকৃতদার দেবব্রত ১৯৩৯ সালে ভারতের কম্যুনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন । পার্টি তখ বে-আইনী । শুধু যুক্ত হওয়া নয়, সক্রীয় সদস্য । সেকালের প্রখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্বিক ফ্যাসিবিরোধী লেখক সঙ্ঘ ও ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা চিন্মোহন স্নেহানবিশ ছিলেন তাঁর সহকর্মী , সেই সূত্রেই তারকম্যুনিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে ওঠা । গণনাট্য সঙ্ঘে তখন উদয় শঙ্কর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, শম্ভূ মিত্র, তৃপ্তী ভাদুড়ী(মিত্র), বিজন ভট্টাচার্য, সুচিত্রা মিত্র প্রমুখ – বাংলা সংস্কৃতির সে এক জোয়ারের কাল । মাঠে ময়দানে, সভা সমিতিতে দেবব্রত সুকান্ত, সলিল চৌধুরীর গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানও গাইছেন । ১৯৪৯এ পার্টি যখন বে-আইনী , নেতৃত্ব আত্মগোপনে – দেবব্রতর ওপর দায়িত্ব বর্তালো সঙ্গীতানুষ্ঠান করে অর্থ সংগ্রহের । হেমন্ত ও সুচিত্রার শযোগিতায় ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য প্রদঈশনীর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন । ১৯৫৩তে ভারতের সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি চিনে গেলেন গা্ন গাইতে , চিন ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন ‘অন্তরঙ্গ চিন’ গ্রন্থে ।

আবার সেই দেবব্রতই ১৯৬২’র পর নিজেকে বাঁয়ের রাস্তা থেকে গুটিয়ে নিলেন । তার মানে তিনি ‘দক্ষিণ পন্থী’ হয়ে গেলেন তা কিন্তু নয় , বলা ভালো নিজেকে গুটিয়ে নিলেন – তাঁর নিজের কথায় “থেমে যেতে হ’লো” । কেন তিনি সরে গেলেন সে অন্য প্রসংগ । ষাটের দশক থেকেই কম্যিনিষ্ট পার্টির মধ্যে মতাদর্শের দ্বন্ড্ব প্রবল হয়ে ওঠে এবং অবশেষে কম্যুনিষ্ট পার্টি দু টুকরো হয়ে যায় , যার অনিবার্য প্রভাব পড়ে সামাজিক সংগঠনগুলিতেও কর্মক্ষেত্রে যে ইউনিয়নের সক্রীয় কর্মী ছিলেন সেটিও বিভেদের শিকার হ’ল , সেখান থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিলেন দেবব্রত । পার্টি ও ইউনিয়ন্রের বিভাজনে এতোটাই আহত হয়েছিলেন যে অবসরের পর ইউনিয়নের সকর্মীরা তাঁকে বিদায় সম্বর্ধনা দেবার প্রস্তাব করলে তিনি তা গ্রহণ করতে অসম্মত হন । তাঁর আত্মকথন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন ...... প্রায় উনিশ- কুড়ি বৎসর বেশ বাঁদিকে হেলে কেটে যাচ্ছিল । পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই আমার মনে রাজনীতির ব্যাপারে  কি রকম জানি একটু সংশয়ের উদয় হয়েছিল । হঠাৎ ১৯৬২তে দেখলাম বাঁদিকে নিদারুণ অগ্নিকান্ড – পরস্পর বিরোধ ও বিদ্বেষের আগুন । ভীষণ দমে গেলাম । ...... বহু বৎসর অভ্যাসের ফলে আমার মনতাও বাঁয়ে হেলে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই মনটাকে অন্য কোন ধরণের নতুন পথে চলতে বা নতুন পথ ধরতে রাজী করাতে পারলামনা”। দেবব্রত থেমে গেলেন । এ একরকম থাম, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া । কিন্তু অন্য দিকে তাঁকে থামানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছিল ।

রবীন্দ্রগানের ভুবনে তাঁর অনায়াস গতিকে থামিয়ে দেবার প্রক্রিয়া সুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে । মায়ের কোলে চড়ে তাঁর গান গাওয়ার সুরু । বাবা, মা দুজনেই ব্রহ্ম সংগীত গাইতেন । রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্ম সঙ্গীত ছাড়াও ছাত্র জীবনে হিমাংশু দত্ত, শচীন দেব বর্মণ, সায়গল প্রমুখের অনেক গানও ছাত্রজীবনে গাইতেন । রবীন্দ্রনাথের গা্ন রেকর্ডে গাওয়ার আগে নজরুল ইসলামের কথায় ও সুরে দুটি গান তিনি  রেকর্ডে গেয়েছিলেন সেই সময় (১৯৩৫-৩৬) কয়েকটি ছায়াছবিতেও গান গেয়েছিলেন । গ্রামোফোন রেকর্ডে তিনি প্রথম রবীন্দ্রগান গাইলেন ১৯৩৯ এ কনক দাশের সঙ্গে দ্বৈত কন্ঠে ‘হিংশায় উন্মত্ত পৃথ্বি’ ও সঙ্কোচের বিহবলতা’। বলা যেতে পারে শুরু থেকেই তাঁর গানকে থামিয়ে দেবার অবাক করা প্রয়াস শুরু হয়েছিল । সেই সময়ে বিদেশী গ্রামোফোন কোম্পানীই ছিল রেকর্ড প্রকাশের বনেদি প্রতিষ্ঠান ও একচেটিয়া অধিকারী , তারা ‘হিজ মাশটার্স ভয়েস’ এবং ‘কলম্বিয়া’ এই দুটি লেবেলে গান রেকর্ড ও প্রচার করতো । পরে ‘হিন্দুস্থা্ন, ‘সেনোলা’ এই রকম দু একটি দেশীয় রেকর্ড কোম্পানী হয় । ১৯৩৯ এ প্রথম রেকর্ড বেরোবার পর   হিস মাস্টার্স ভয়েস থেকে তাঁর আরর১০/১২টি গাঙ প্রকাশিত হয় । এর পর ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ কোম্পানী তাঁকে আধুনিক গান গাইবার আবদার করে, কারণ রবীন্দ্রনাথের গান নাকি তেমন চলছেনা বাজারে । প্রখর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন দেবব্রত বিশ্বাস । হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ থেকে গান করাই বন্ধ করে দিলেন । অর্থের জন্য তিনি গান গাইতেন না, গান গাইতেন প্রাণের আনন্দে । রেকর্ড করা বন্ধ হলেও গান গাওয়াকেতো থামানো যায়না ! গনাট্য সঙ্ঘের হয়ে রবীন্দ্রগান, সলিল চৌধুরী, সুকান্ত, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান নিয়ে দাপিয়ে বেড়ালেন গ্রামে গঞ্জে, মাঠে ময়দানে । ইতিমধ্যে দেশীয় দু একটি রেকর্ড কোম্পানীর পত্তন হয়েছে । ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ থেকে গান রেকর্ড করা বন্ধ হবার দশ বছর পর হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানীর মালিক চন্ডীচরণ সাহা তাঁকে রবীন্দ্র সঙ্গীত রেকর্ড করার অনুরোধ করেন ১৯৬০এ । পরের বিছর রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষ । দশ বছর রেকর্ড করা বন্ধ থাকার পর ১৯৬১তে হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে তাঁর প্রথম গাঙ ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ এবং যেতে যেতে একলা পথে’ প্রকাশিত হল – প্রবল জনপ্রিয় হয়ে উঠলো গান দুটি । বাঙালি যেন রবীন্দ্রগানকে নতুন করে আবিস্কার করলো ১৯৬১তে রবীন্দ্র জন্ম শতবর্ষে রবীন্দ্রগানের মহাপ্লাবনে দেবব্রত বিশ্বাস উঠে গেলেন জনপ্রিয়তার উত্তুঙ্গ শিখরে । এবং কি আশ্চর্য ঠিক তখনই হয়তো তাঁর জনপ্রিয়তার কারণেই দেবব্রতকে থামিয়ে দেবার প্রয়াস আবারও গতি পেয়ে গেলো ।

মার্চ ১৯৬৪তে বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি তাঁর চারটি গান রেকর্ড করার অনুমতি দিলনা, অভিযোগ, তাঁর গানে যিন্ত্রসঙ্গীত ব্যবহারের আধিক্য । এরপর মাঝেমধ্যে দুএকটি গান অনুমোদন পেয়েছিল, কিন্তু আবার ১৯৬৯এ দুটি গানের অনুমোদন দিলনা । বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পত্র বিনিময় হয়েছিল এই বিষয়েতিতি বিরক্ত দেবব্রত রবীন্দ্রগান রেকর্ড করাই বন্ধ করে দিলেন । দুই বাংলার আগণিত সঙ্গীতপ্রেমী তীব্র প্রতিবাদ করলেন, তাঁকে রবীন্দ্রগান থেকে সরে না আসার জন্য কাতর প্রার্থনা জানালেন, কিন্তু রবীন্দ্রগানের প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের সঙ্গে কোন আপোষ করতে সম্মত হলেন না দেবব্রততাঁর আত্মকথন ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত’ গ্রন্থে লিখে গেছেন “আমি আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিতে পারিনি” ।

মায়ের কোলে চড়ে যার রবীন্দ্রগান গাওয়া শুরু তিনি জীবনের শেষ দশটা বছর রবীন্দ্রনাথের গা্ন – গাইলেননা - গাইতে দেওয়া হ’লনা । এই যন্ত্রণা তো আমাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় , কিন্তু আমরা এই উপলব্ধিতে পৌছে যাই যে দেবব্রত বিশ্বাস শুধুমাত্র রবীন্দ্রগানের অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেননা , ছিলেন এক ঋজু মেরুদন্ডের প্রখর আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ঋষিতুল্য মানুষ ।

বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতি নামক প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের কাছে তিনি যতই ‘হরিজন’ হয়ে থাকুন না কেন, সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালির হৃদয়ে, মননে দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্রগানের ‘মহাজন’ হয়েই থাকবেন চিরকাল – যতদিন বাঙালি তার সখে-দুঃখে রবীন্দ্রনাথের গান শুনবে গাইবে ।


গান ভাসিয়ে দিতে পারে আকাশ 



ত্ন দী পা দে ঘো



গানের আরকে যারা ভিজেছে তারা জানে ভিজতে কেমন লাগে


শোনা গেছে যে একবার একটা ময়ুর গানে ভিজে একগোছা বৃষ্টি হয়ে
ঝরেছিল আর এই সেদিন একটা নীলকণ্ঠ পাখি গাইতে গাইতে
হঠাৎ গোধূলির মেঘ বরন নদী হয়ে গেলো

নদীটার হুল্লোড় আগলে রাখে রোদের দানাদার
বিষণ্ণ হাতের তালুতে ফোটে বকুলের বিরহ
ঝর্নার নীলগুল্ম ছুটোছুটি করে চিবুকে
গানের ভেতর নদীটা শুনতে পায় ইশ্বরের কান্না , সেই
জখমের কুয়াশায় সে ছড়িয়ে দ্যায় চাঁদের সরগম ......
নদী , কেমন করে এতো সুন্দর গান গাও ?

জমিতে পেতে দিই নক্সাদার কোজাগরী
কল্কাপাড়ের জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিই বাতাসে
তারপর
লক্ষ প্রার্থনা নিশ্বাস থেকে গান হয়ে ঝরে
কোন ধরনের গান তোমার বেশী পছন্দ ?

মানুষরঙের গান


কার কাছে তোমার গানের হাতেখড়ি ?
সে এক তরুণী কেয়াফুল ... তার কবরীতে দোলে নয়নতারা , তার গান সাজে মেঘের গয়নায়
আর এইযে তোমরা এতো রাগ বেহাগ শুনছো আমার কণ্ঠে
এ সব তারি চোখের গভীর থেকে উঠে আসা সরোদ

এই তরুণী কেয়াফুল এখন কোথায় নদী ?
আমার ত্বকের শাখা প্রশাখায়
নদী , আগামীকে কি বার্তা দিতে চাও ?

মানুষ , তোমরা গান হও




রবীন্দ্র সংগীত


শ্যা ল দা

সত্যি সত্যিই এবার আমি
উঠে যাচ্ছি ঊর্ধ্ব লোকে -
যাচ্ছি নাকি ?

পা মাথা টলমল করে
দুলে উঠে সমস্ত পৃথিবী
বোধের জগৎ

আকণ্ঠ ডুবে যেতে যেতে
মনে পড়ে, ভেতরে
কেউ একজন গান ধরে

আলোর রহস্যময় জগতে
বসে, একা একা
সংগত করে সুরে

সে সুর মূর্ছনার মতো
ছড়িয়ে পড়ে, লোকে
লোকান্তরে !

তাঁর গান থামে
সেও থেমে যায়
আমি থামিনা মোটে

যেতে যেতে, যেতে যেতে
এতো এতো উপরে
উঠে যাচ্ছি যে -

কিছুতেই আপনাকে
বোঝানো যাবেনা -
কি সেই সংগীতময়তা !

ফিরে এসো
সু মি ত র ঞ্জ ন দা শ




আজকাল প্রতিরাতে ঘুমে স্বপ্ন দেখি

অজানা সরীসৃপ চোখের তীব্র দৃষ্টি
স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ খুঁড়ে তুলে আনি
ফসিল হয়ে যাওয়া কবিতার করোটি
পাঠ করি প্রতিটি লাইন স্তবক অনুচ্ছেদ
অসীম নীল শূণ্যতায় বিমোহিত সৃষ্টি

তারপর কেটে যায় কত শত রাত
পিছু হেঁটে চলা স্মৃতির যোজন দূর
কালচিহ্ণের ক্যানভাসে মিলিয়ে যায়
উচ্চারিত শব্দের ধ্বনি গানের সুর

এরকমই এক নীল হয়ে যাওয়া রাতে
নিভৃতি-নিরবতা-আর্তনাদের পাখায়
নিজের অস্তিত্ত্ব মিলিয়ে যাবার আগে
ভেসে আসে সেই গানটা তোমার গলায়
"আকাশ ভরা সূর্য্য তারা ..."
জর্জ, গানটা আর একবার গাওনা
কর্পূর হয়ে যাক সময়ে
বুঝে নিই আমার পাওনা।

দেবব্রত বিশ্বাস
নু ম দা র্মা





নিয়মের সৃষ্টি অনিয়মের জারনে
কিন্তু স্বাভাবিক সৌন্দর্য্য
তোয়াক্কা করে না শাসনের বাঁধ,
সঙ্গীত-স্বর ধ্বনিত বাতাসের গর্ভে
পাখির ঠোঁটেই রাগের আলাপন।

এমনও আত্মা থাকে জীবনভর যাঁর
নিবেদিত প্রাণ সুর বিস্তারিতে।
যাঁকে বিঁধতে পারে না কাচের স্বর্গের
কোন আহাম্মক।

উদাত্ত কন্ঠের রবীন্দ্রতান প্রানন্মত্ত
নিজস্ব আঙ্গিকের সেই আপনজন।
বিতর্ক যাঁকে করেছে আরো প্রিয়,

সুর মূর্ছনায় ওতপ্রোত সাধক
দেবব্রত বিশ্বাস।
চির রবীন্দ্রপ্রাণ অবলীলায় ভেসে যায়-
"আকাশভরা সূর্য তারায়...." ।

জর্জদা, এখনও তোমাকে ...
র্ণা চ ট্টো পা ধ্যা য়




ব্রাত্য তুমি ছিলে না কোনদিনই

শ্রোতাদের হৃদয়ে ছিল ঠাঁই
এখনো দেখতে পাই
রেকর্ডের দোকানে উপচে পড়া ভিড়
তাদের মুখে ‘সোনার হরিণ চাই’

সূর্য যখন নিজেকে দেয় ঢেলে
খর রোদে লাগে ভীষণ টান
তখনও তো তোমায় মনে পড়ে
‘বিস্ময়ে জাগে আমার প্রাণ’

সজল মেঘে আকাশ হলে কালো
‘যেতে যেতে একলা পথে’ শুনে
ওই যে একা নিজের মনে চলা
উদাসীরও মনটা লাগে ভালো

তোমায় শুনে বড়ো হওয়া আমি
যখন দেখি এদেরও মুখে তুমি
বুকে বাজে কান্না-মেশা হাসি
জর্জদা, তখন বুঝতে পারি
তোমায় আমরা এখনও, এখনও
ক তো টা ভালোবাসি...

শ্রদ্ধার্ঘ্য


মৌ দা গু প্তা

কথার পরে কথা সাজিয়ে উজাড় করা শব্দ,
দরাজ গলার উদার গানে তাই কোলাহল স্তব্ধ।।
“আকাশ ভরা সূর্য তারা’ স্মরনীয় সে প্রাপ্তি,
সপ্তসুরের বিত্ত বয়ে মোহময়ী শক্তি।
কিম্বা যখন মনের ভেতর মেঘের আঁধার বুনি,
ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু' মন দিয়ে শুনি
গান গেয়ে কথা বলা, নিঃসারে গাওয়া গান ,
সাবলীল সেই ভঙ্গিমাতে ঢেলে দেওয়া মন প্রাণ,
ব্রাত্যজনের গীতিসুধায় অনায়াসে মিশে যাই,
সশব্দ ভাবনায় তবু চুপকথার নেই ঠাঁই।
নিজেই বলি,“সুরের গুরু দাও দাও দাওগো সুরের দীক্ষা'
তাঁর গানেতেই দুখ ভুলেছি,পেয়েছি সুরের শিক্ষা।
তাঁর জন্যে সাজিয়ে রাখি ভুলে যাওয়া সুর, অবুঝ গান,
খোলা দরজা,উদাস হাওয়া,স্বরলিপি আর গীতবিতান।।
নেই তিনি আশেপাশে, গান বাজে বারোমাস,
নিঃশ্বাসে মিশে আছেন দেবব্রত বিশ্বাস।।


দেবব্রত বিশ্বাস


র্পি তা দা গু প্ত

‘ আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তই হেরি তায় সকল খানে ’
ছোট্ট বেলা থেকেই রবিঠাকুরের গানের ভক্ত
দেবব্রত বিশ্বাস আমার একজন প্রিয় শিল্পী ।
যে কোন ঋতু তাঁর গলায় দানা বাঁধে
বিশেষ করে বর্ষা –
ব্জ্র নিনাদ কণ্ঠে গাইলেন শিল্পী
‘ ব্জ্র মানিক দিয়ে গাঁথা, আষাঢ় তোমার মালা –’
তোমার মালা গাঁথা জর্জ বিশ্বাস
এ নামেই সবিশেষ পরিচিত ।
রবিঠাকুরের গান তাঁর অনায়াসলব্ধ
সে গানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেন তিনি।
রসের আধার ছিলেন ,
তাই মনে হয় তাঁর গানে এতো প্রাণ ।
‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে ---’
সত্যি আজও যেন হিয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছেন
তিনি আর রবিঠাকুর পাশাপাশি
বড় ব্যথা পেয়ে গেয়েছিলেন—
‘কেন তোমরা আমায় ডাক আমার মন না মানে –’
যে ব্যথা নিয়ে চলে গেলেন তা আজ বুকে বাজে । ----


বিশ্বভারতী সঙ্গীত বিভাগের অধিকর্তা নৃপেন্দ্র চন্দ্র মিত্রকে ১২ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪এ লেখা তাঁর দীর্ঘ পত্রের অংশ বিশেষ
      একদা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তাঁর গানই নাকি টিকে থাকবে । কিন্তু ‘আমাদের মাতামহীর আমলের জীর্ণ কাঁথা দেয়ে ঘিরে রাখলে এবং পলতে করে ফোঁটা ফোঁটা নিয়মের বিধান’ খাইয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে টিকিয়ে রাখা যাবে এমন কথা রবীন্দ্রনাথ ভাবতে এবং বলতে পারেননি । তিনি বরঞ্চ বলেছিলেন ‘সুরকারের সুর বজায় রেখেও এক্সপ্রেশনের কমবেশি স্বাধীনতা চাইবার এক্তিয়ার গায়কের আছে’ ......
... যে রবীন্দ্রনাথকে আমার পিতামাতা গুরুর মত শ্রদ্ধা করতেন, যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল,সেই রবীন্দ্রনাথের চিন্তাধারাকে কোন মূল্য না দিয়ে এবং তাঁর নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র সার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের নির্দেশ এবং বিধি নিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার ধৃষ্টতা আমার নেই – প্রবৃত্তিও নেই । এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতকগুলি নিয়ম যতদিন  বলবত থাকবে ততদিন নিজেকে সরিয়েই রাখব । আমি দেখেছি হালে কয়েকজন তরূণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক গায়িকা অতি সুন্দর গাইছেন – মনে হয় তাদের মধ্যে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে – লক্ষ্য করি তাঁরাও এ ব্যাপারে বেশ ভাবনা চিন্তা করেন । কিন্তু আমার মনে হয় এই নিয়মের শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবার মত সাহস ও ক্ষমতা তাঁদের নেই । ... তাই আপনার কাছে আমার বিনীত নিবেদন এই যে আপনি অনুগ্রহ করে যথার্থ সঙ্গীতজ্ঞ এবং সঙ্গীত রসিকদের আহ্বান করে, আলাপ আলোচনার আলোকে এমন একটি ব্যবস্থা করুন যাতে আমাদের অতি প্রিয় সবুজ ও সজীব রবীন্দ্র সঙ্গীত শুকনো কাঠ না হইয়া যায় । ... শেষ করার আগে রবীন্দ্রনাথের একটি বাণীর উল্লেখ না করে পারলামনা – তিনি লিখেছিলেন “......যারা বড়, যারা ভূমাকে মানে, তারা সৃষ্টি করিতেই চায়, দমন করিতে চায়না ...। মানুষের পক্ষে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মাঝারির শাসন । এই শাসনে যা কিছু সবুজ তা হলদে হইয়া যায়, যা কিছু সজীব তা কাঠ হইয়া যায় ...” ।











Top of Form



Bottom of Form






About