কবি প্রণাম 
২২শে শ্রাবণ ১৪১৯
কবির শেষ রচনা ৩০শে জুলাই ১৯৪১ সকাল সাড়ে নটা
      তোমার সৃষ্টির পথ

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে
হে ছলনাময়ী !
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে ।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্বরে করেছ চিহ্নিত ;
তার তরে রাখোনি গোপন রাত্রি ।
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে চির স্বচ্ছ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চির সমুজ্বল ।
বাহিরে কুটিল হোক, অন্তরে সে ঋজু
এই নিয়ে তাহার গৌরব ।
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত ।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে ।
কিছুতে পারেনা তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে


আজ বাইশে / র্ণা চ ট্টো পা ধ্যা য়

কবিগুরু,
লিখব কিছু ভাবিনি তেমন
শুধু গেয়েছি তোমার গান
পড়েছি তোমার কবিতা
আর চোখের জলে ভেসেছি
বাইশে শ্রাবণ...


তবুও, অক্ষরমালা বৃত্তাকার হয়ে 
পাক দেয় আমার চারিদিকে
কখনো তোমার ছবি দেখে
কখনো তোমার গান শুনে... 

যাবার দিনে নাকাল হয়েছিলে
সে কথা সবাই মানে
উড়িয়ে নিয়ে, ভাসিয়ে নিয়ে
গিয়েছিল তোমায়
রাগ, দুঃখ চাপা ছিল না কিছুই

হয়েছে আলোচনা বিস্তর
চলেছে চাপানউতোর
তবু, যখন দেখি তোমার সেই ছবি -
মেঘের ওপর ভেসে যাওয়া কবি ...
মনে হয়,
সত্যি তুমি বিশ্বকবি আজ
আকাশ-ধরার মধ্যে তোমার সাজ

কেউ কখনো দেখেছে এত আলো
কেউ কখনো জ্বেলেছে এত আলো-

কেউ কি ধরা বেসেছে এত ভালো
আর কাউকে বেসেছি এত ভালো...

মহাপ্রয়াণের আগের একটা বছর

        ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়

বাঙালিকে রিক্ত করে – নিঃস্ব করে শ্রাবণের বাইশ এসেছিল । গভীর শূণ্যতার সেই শ্রাবণ বাইশের দ্বীপ্রহর কী মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা কন্টকিত করেছিল কবিকে তার সবটুকু আমাদের বোধের অতীত । ১৫ই শ্রাবণ ( ৩০ জুলাই) সকাল সাড়ে নটায় অস্ত্রোপচার আর ২২শে শ্রাবণ, দুপুর বারোটা তেরো মিনিটে চলে গেলেন কবি । বলে রাখি, এটি কোন মৌলিক রচনা নয়, কবির মহাপ্রয়াণের আগের একটি বছরের ধারা-বৃত্তান্ত । আমি বুঝতে চেয়েছি তাঁর জীবনের শেষ একটা বছরকে ।

১৯৪০এর ৭ই আগষ্ট অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে ‘সান্মানিক ডি.লিট প্রদান করে কবি তখন খুব সুস্থ ছিলেন না । অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন শান্তিনিকেতনে এসে এই সন্মাননা প্রদান করেছিলেন ১৯শে সেপ্টেম্বর কবি কালিম্পং যাত্রা করেন । কালিম্পং থাকাকালীন ২৭শে সেপ্টেম্বর থেকে কবি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন, ২৯শে সেপ্টেম্বর কবিকে ক’লকাতায় ফিরিয়ে আনা হয় । দুমাস ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের চিকিৎসাধীন থেকে, শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন ১৮ই নভেম্বর । কবির অসুস্থ অবস্থাতেই প্রকাশিত হয় ‘নবজাতক’, ‘সানাই’, ‘ছেলেবেলা’, ‘তিন সঙ্গী’, ‘রোগ শয্যায়’ এবং ‘আরোগ্য’।

১৩৪৮এর ১লা বৈশাখ (১৪ই এপ্রিল ১৯৪১)শান্তি নিকেতনে কবির ৮১তম জন্মদিন পালিত হল । সেদিনই কবি সেই ঐতিহাসিক অভিভাষণ দিলেন ‘সভ্যতার সংকট’ । ২য় বিশ্বযুদ্ধে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির অস্ত্রের আস্ফালন আর মানবতার চরম অবমাননা কবিকে ব্যথিত করেছিল, তথাপি ব্যথিত হৃদয়েও কবি আশা ব্যক্ত করেছিলেন উন্মত্ত দানবিকতার দাপট একদিন নিরস্ত হবে পৃথিবী থেকে এবং শুভবুদ্ধির নির্মল আকাশে মানুষ চোখ মেলবে । ২৫শে বৈশাখ (৮ই মে ১৯৪১) দেশের সর্বত্র কবির ৮১তম জন্মদিন পালিত হয়, ত্রিপুরার মহারাজ কবিকে ভূষিত করেন ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধিতে । সেদিনই প্রকাশিত হয় কবির তিনটি গ্রন্থ ‘জন্মদিনে’, ‘গল্পস্বল্প’ ও ‘ছেলেবেলা’র ইংরাজি সংস্করণ । কবি তখন খুবই অসুস্থ, অশক্ত । সব রচনাই অনুলিখিত হতো । শয্যাশায়ী অবস্থাতেই ১৯৪১এর ৪ঠা জুন, কবি রচনা করেছিলেন বৃটিশ সাংসদ মিস রথবনের উদ্দেশ্য তীব্র ধিককারপূর্ণ খোলা চিঠি  
                                                                                                            
         কালিম্পং এ থাকাকালীন অসুস্থতা থেকে আর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেননি কবি, তাঁর অসুস্থতা ক্রমেই চিন্তাজনক হয়ে ঠায় তাঁর চিকিৎসকরা কবিকে কলকাতায় নিয়ে আসার পরামর্শ দেন । ২৫শে জুলাই ১৯৪১ দুপুরে কবিকে কলকাতায় আনা হয় । ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়, ললিত মোহন ব্যানার্জী পরামর্শ দেন অবিলম্বে অস্ত্রোপচার করার – যদিও কবি অস্ত্রোপচারে সম্মত ছিলেননা । শেষ পর্যন্ত সম্মত হন , হাসপাতালে নয় –জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই অস্ত্রোপচারের আয়োজন করা হইয় । তখনকার বাংলার শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন যে অস্ত্রপচার ভিন্ন কোন বিকল্প ছিলনা 
          ৩০শে জুলাই,বুধবার সকাল সাড়ে নটায় ডাক্তার ললিত মোহন ব্যানার্জী অস্ত্রপচার করেন । অস্ত্রপচারের ঠিক অব্যবহিত পূর্বে কবি তাঁর শেষ কবিতা রচনা করেন (শ্রুতি লিখিত হয়) “তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী”। অস্ত্রপচারের পর এবং ঐদিনই  সন্ধ্যায়  প্রকাশিত কবির চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ‘কবির অবস্থা সন্তোষ জনক’ বলা হয় । ১লা আগষ্ট শুক্রবার রাত্রি ৮-১৫এ প্রকাশিত চিকিৎসা প্রতিবেদনে উদ্বিগ্ন বাংলা জানতে পারে ‘কবি এক যন্ত্রণা কাতর ও অস্থির’ রাত্রি কাটিয়েছেন । পর দিন ২রা আগষ্ট দুপুর ১২টায় সামান্য স্বস্তিজনক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যাতে বলা হয়েছিল , ‘কবির শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে’ঐদিন রাত্রেই যদিও কবির স্বাস্থের উদ্বেগজনক অবনতি হয় । ৩রা আগষ্ট,রবিবার রাত্রি ৮-৩০এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় ‘কবি বিনিদ্র রজনী যাপন করেছেন, শারীরিক দুর্বলতা বৃদ্ধি পেয়েছে’ । সোমবার ৪ঠা আগষ্ট সন্ধ্যার চিকিৎসা বুলেটিনে বলা হয় কবি ‘কষ্টকর রাত্রি’ যাপন করেছেন, শরীরের তাপমাত্রাও বেড়েছে । ৫ই আগষ্ট রাত্রি ৮-১০ এর বুলেটিনে উদ্বিগ্ন বিশ্ব জানলো ‘কবির শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে’ ৬ই আগষ্ট কবির অবস্থার কোন পরিবর্তন হলোনা । ৬ই আগষ্ট খুব ঘন ঘন মেডিক্যাল বুলেটিন প্রকাশ হচ্ছিল । সকাল ১১-২০ কবির ‘শারীরিক দুর্বলতা ও অস্থিরতা খুব উদ্বেগ জনক’, সন্ধ্যা ৬-৩০এ কবির ‘অবস্থার কিছুটা অবনতি’ হয়েছে, রাত্রি ৭-৩০ এ ‘অবস্থার আরো অবনতি’ এবং রাত্রি ৮-৩০এ বলা হয় ‘কবির শারীরিক অবস্থা দারুণ উদ্বেগ জনক’ সারা বিশ্ব যেন রাত্রি জাগরণ করছে – রাত্রি ১১-৩০ এ, ঐদিনের শেষ প্রতিবেদনে জানানো হল ‘কবির অবস্থা অপরিবর্তীত’ । গভীর রাত্রি ২-৩০এর মেডিক্যাল বুলেটিন জানিয়ে দিল ‘কবির অবস্থা দারুণ উদ্বেগ জনক’। একঘন্টা পরে রাত্রি ৩-৩০এ শেষ মেডিক্যাল বুলেটিন জানিয়ে দিল ‘অবস্থার আরো অবনতি’ হয়েছে ।

          ৭ই আগষ্ট ভোর থেকেই জোড়াসাঁকোয় মানুষের ভীড় আছড়ে পড়েছে, প্রার্থনা করছেণ,কাঁদছেন । এসেছেন ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় , ললিত মোহন ব্যানার্জী – তারা শেষ বারের মত পরীক্ষা করলেন অচৈতন্য কবিকে ।

তারপর বাঙালির সেই রিক্ত হয়ে যাওয়ার মুহুর্ত ! বাংলাকে, বাঙালিকে রিক্ত করে কবির শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো ৭ই আগষ্ট ১৯৪১ (২২শে শ্রাবণ ১৩৪৮) দুপুর ১২টা ১৩ মিনিটে  ।

শেষ যাত্রা

[ (১)এই লেখার সঙ্গে দেওয়া ছবিটি শান্তিনিকেতনে তোলা কবির শেষ ছবি – ১৪ এপ্রিল ১৯৪১ । shশেষ যাত্রার ছবিটি অভিক জানার সংগ্রহ থেকে নেওয়া । sh
  (২) কবির চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যগুলি সংগৃহীত হয়েছে সেপ্টেম্বর ১৯৪১এ প্রকাশিত ‘দি ক্যালকাটা মিউনিসিপাল গেজেট’ / টেগোর মেমোরিয়াল স্পেশাল সাপ্লিমেন্ট’ থেকে ]


তোমার চরণতলে / অ নু প ম দা শ শ র্মা

এসে দাঁড়ালাম চতুর্ভুজের বাইরে,
পথের ধারে হাত বাড়িয়ে অন্ধ কানাই
বললাম, আছো ভালো?
বন্ধপাতা চোখের ভেতর একটু নড়াচড়া..
'
সেই যে কবে বসিয়ে দ্যাছেন ঠাকুর রবি
দিব্যি আছি পথের বাসায়'

গেলাম হাটে বক্সীগঞ্জে শুক্রবারে
নানান হট্টগোলে বাজার সরগরম,
মাথার ঝাঁকা হাঁটু তোলা কাপড় ধূতি
এক সে চাচা।
'
কি মিঁয়া, চলছে কেমন ব্যবসাপাতি'
বেবাক হেসে চলল ঝাঁকা তাড়াতাড়ি।

চললাম পাশের বাড়ি বসতবাড়ি,
পাঁচিল জোড়া ঘুঁটের বলয়
খুশীর ঝলক শান্ত মুখে উপচে পড়ে,
বড় বৌ, মেজ বৌ ঢলে এ ওর গায়ে,
দুঃখ বেঘর সহজপাঠে,
প্রতি ঘরে।

কল্পলোকে এমনভাবে ভাব জমাই
কপালে ছড়ায় প্রশস্তির রেখা,

কষ্টের জারকে ঘষটানো নির্বোধ স্বার্থ
ক্রমশই সরে যায় রবি প্রণামে ।

রাখাল / ত রু ণ ব সু

বাঁশি হাতে রাখাল ও নয়
রেল লাইনের ধারে গরু-মোষ চরায় – হাতে লাঠি থাকে
ইষ্টসানে রেলগাড়ি নামিয়ে দেয় বৈধ অবৈধ যাত্রীদের
তারা গন্তব্যে হেঁটে যায় দ্রুত
পাশ ফিরে কেউ রাখাল দেখেনা
চৈত্রের শেষ থেকে সমস্ত বৈশাখ জুড়ে
তপ্ত বারাস আর দাহ্য রোদ ঢেলে দেয়
প্রতিটা ক্রুদ্ধ দিন –
লাঠির বদলে ছাতা থাকে সঙ্গে জলের বোতল ;
বর্ষাতেও ভরসা তাই ।

রাখালের জীবন থেকে
বৈশাখের পঁচিশ কিংবা শ্রাবণের বাইশ
ছাতার আড়ালে ঝরে যায়
গরু-মোষ চরতে থাকে নৈমিত্তিক
ওর জীবনের মত
মিথ্যে কৃষ্ণচূড়া-কদম্বের অবশিষ্ট ফুলগুলো বৃন্ত খসে
পড়ে যায় ওর পায়ের কাছে
বৈশাখ এবং শ্রাবণে ।


রবীন্দ্র প্রতিকৃতি / বা য়ে দ আ কা

যথার্থ সমারোহে মোড়ক উন্মোচন করে
চিরস্থায়ী করা হলো বাংলা ভাষার অনিবার্য 
দিকপাল রবীন্দ্রনাথের আত্মপ্রতিকৃতি

চারিদিকে ঘাস আর বৃষ্টিদৃশ্য নতজানু হয়ে 
তাকে সম্মানিত করে

আমরা যারা দ্বিধান্বিত হয়ে, আধুনিক শালবস্ত্রে
কবিকে পদ্মাপারের ঘাসবাড়ি থেকে
যার যার মতো ঢাকা কিংবা কলকাতার 
অর্বাচীন টাওয়ারের চক্রাকার সিঁড়িতে চড়িয়ে দিয়েছি
তাদের ঘরে ঘরে থরে থরে 
সাজানো রয়েছে বাঁধাই সৌকর্যের 
মহার্ঘ রবীন্দ্র রচনাবলী
ঘুঘুচড়া নিঃসঙ্গ অরণ্যের মতো গল্পগুচ্ছের নরনারীগুলো
ক্ষুধাতৃষ্ণার দক্ষযজ্ঞে উঁচু উঁচু বইয়ের খোঁড়লে 
মুখথুবড়ে পড়ে থাকে দীর্ঘ বর্ণলিপি

তারা জানে, শতাব্দীর প্রণোদনাগুলো
ঝরাফুল মরারোদে থরে থরে বাসি হয়ে যায় যদি
গভীর শিল্পের ছোঁয়ায় নিপুণ ভাস্কর্য হয়ে 
আজো তো নির্মিত হয়
অবিকল রবীন্দ্র প্রতিকৃতি

রবি শস্য / কা ক লী মু খো পা ধ্যা য়

বলাই আর বেখাপ শিমূলের জন্য কাঁদেনা,
গলে গেছে গ্রীনল্যান্ডের সকল বরফ ।
অসভ্যতার মাশুল দিয়েছে বৃটিশ
তালগাছ একপায়ে ভর দিয়ে,
আজও খোঁজে তাড় মানস সুন্দরীকে ।
যাপিত জীবনের ক্লেদ ধুয়ে যায় ব্রহ্ম জ্ঞানে

একটু গোপন / ত্ন দী পা দে ঘো

তোমার ফোন নাম্বার যোগাড় করেছি রবিবাবু 

গোপন মেঘ ছড়িয়ে তুমি গিয়েছ শিলং পাহাড় ।
সবুজ ফার্নে লিখছ মশালাদার চা-বিকেল ,
কুয়াশায় সরগরম অরেঞ্জমারি । 

অনুস্বার বিসর্গ ছেড়ে তোমার সাথে পাহাড়ে যাবো রবিবাবু ,
মন্ত্রপূত সূর্যের সাথে পাশা খেলায় হেরেছি বারবার ,
অবাধ্য গরদ উপচে গরাদের শিক
বাইফোকালে বুনে রাখা অন্ধকার 

তোমার সাথে কথা বলবো এক অপার সূর্যাস্তে ,
হরিণের বৃষ্টি লাফাতে লাফাতে চলে যাবে আমাদের গা বেয়ে ,
তিরতির চাঁদগন্ধে থমকে থাকবে পঞ্চম সুর ,
পাইনের জানলা দিয়ে একটা পাগলাটে ঘুম ঢুকে পড়বে রিসিভারে 
আর ...একটু গোপনে 

লাবণ্যর জোড়া ভ্রূ ধুয়ে দেবে নষ্ট শিলং



অনুভবের ঘর / র্ঘ্য রা য় চৌ ধু রী

দহ্মিণের বারান্দা,
ইজিচেয়ার, উপনিষদের রাত,
জ্যোৎস্না প্লাবিত প্রান্তরে
মৃত্যুও খুঁজেছে ঠিকানা,
ট্রেনের জানালা সংবদ্ধ আঙ্গুলে
একে একে সৌরজগৎ এ পৃথিবী
হয়তো বা পৃথিবীরও নয়
নিজস্ব ভাষায় কথা বলে গেছে।
প্রজ্বলিত আলো আর
ব্রাহ্মমুহূর্তে পূবের আকাশ
অপেক্ষায় অধীর-খুলে দেবে
চাবি সেই একলা পথিক,
তিনকাল যার পায়ে মাথা নত
করে ফিরে গেছে।
সে এক আজব বাউল
সে এক ভুবনজয়ী শব্দ জাদুকর
লহমায় ভাসিয়ে নেয় ডিঙ্গা,
সপ্তমাধুকর।
দহ্মণের বারান্দা, ইজিচেয়ার,
মনে আছে-রূপকথা জন্মাত কীভাবে ।

বন্দনা / আ নো য়া র হো সে ন

তোমার বসন্ত গান উৎসর্গ করেছিলে

আমার বসন্ত দিনের প্রতি কত অনুরাগে !

আমি লাজুক , ভীরু কবি এক ধরেছি কলম

গাইতে বন্দনা গীতি আজি এ বাদল দিনে

কম্পিত শিহরনে , যৌবনের রাগে !

এসেছিলে বিধাতার বরে , মোদের দুয়ারে

প্রেম রসে সিক্ত এক বিশ্ব প্রেমিক

আমার প্রেমার্ঘ্য লও কৃপা করে ।

তোমার রসের ধারায় সিক্ত করি বিশ্ব দরবার

হয়ে উঠলে তুমি মোদের চির অহংকার

তোমার কীর্তি ছাড়া বলার মতোন

কী আছে মোদের সঞ্চয় আর ।

নশ্বর এ পৃথিবীতে পেলে অবিনশ্বরতা

প্রানে প্রানে গানে গানে সুরেরও বাঁধনে।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানবেরে

বিনি সুতোর মালায় নিপুন তুমিই বেঁধেছিলে ।

বিরহ , মিলন, বিচ্ছেদ, আবেগ, অনুরাগ

এমন উজাড় করে কে দিয়েছে আর

রিক্ত, শূন্য ,হতভাগা বাঙ্গালীর দ্বারে

আর কেউ আসে নাই

আসবেও না কোনদিন

মোছাবে না আঁখিজল

প্রানে প্রানে সঞ্চারিবে না সাহসের দীপ্ত শিখা

শেখাবে না চলতে শত দু:খে একেলা

জ্বালায়ে বুকের পাঁজর ।

গুরুজী ক্ষমা করো ; এই কাচা হতে

তোমার বন্দনা গীতি সাধ্য নয় বর্নন

তোমার আশীর্বানী করো হে সিঞ্চন

বুকে লয়ে যেন বাঁচি

তোমা হতে উৎসারিত মঙ্গল ও কল্যাণ

আজ বাইশে শ্রাবণ / মৌ দা শ গু প্তা
সকালের সূর্যটা রোজকার মত
আকাশকে রাঙ্গিয়ে উঁকি মেরেছিল পূব আকাশে,
খানিকটা খুনসুটি চালালো আলোছায়া দু বোনের সাথে,
তারপর হয়ত বা একলা চলার অভ্যাসে ঘুরে বেড়ালো কিছুক্ষন,
এদিক-সেদিক, মনটা ভালো লাগছিল না বুঝি,
অবশেষে টুপ করে মুখ লুকালো মেঘবালাদের ভীড়ে।
অমনি প্রহরাহীন আকাশজুড়ে ঝাঁপিয়ে এল অশান্ত
কালোমেঘের দল
বল্গাহীন দমকা হাওয়ার পিঠে চড়ে।

বিষণ্ণ ক্লান্ত দুপুর আর থাকতে না পেরে কেঁদে উঠলো।
ব্যাকুল অপরাহ্ন ছুটে এসে তার গোধূলী রঙের আঁচলে
মুছিয়ে দিল সেই মুক্তোর দানা, দুহাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে,
যতক্ষণ না বাদলা হাওয়া এসে ফিসফিসিয়ে বলে গেল
ওই সন্ধ্যা আসছে চুপিসারে,দিকচক্রবালকে আঁধারে ঢেকে।
বর্ষণক্লান্ত ধরা নীরবে মুছলো তার দূ-কূল ছাপানো চোখের জল,
নদী একলা কেঁদে ফিরলো রুদ্ধ কান্নার অদম্য উচ্ছ্বাসে।

শুকনো পাতাকে সঙ্গী করে ঝোড়ো হাওয়া
ঘুরে ঘুরে গাইলো মহাপ্রয়াণের ইতিহাস।
রাত্রির বুকের গভীরে প্রকৃতি লিখে দিল তাঁর শোকগাথা,
-আজ যে বাইশে শ্রাবণ।।



বাইশে শ্রাবণ / সু মি ত র ঞ্জ ন দা স
কাঞ্চনকামিনীর সাথে মিশে যাচ্ছে সনাতনী প্রভাত
বাতাসে ডিজেলের গন্ধট্রামের ঘন্টা ...

চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ছাতিমতলা
কালোবাড়িহিমশীতল অপেক্ষা...
কিছু বুঝে ওঠার আগেই শব্দের মিছিলে
শ্লোগান মুখর -
চিত্রাঙ্গদাখোলা চুল...
আরন্যক প্রেম উত্তরায়ন প্রাঙ্গনে;বার্ধক্যসেতো মনের গভীরে!
নিঃশব্দে কনীনিকায় অশ্রু গড়ায়
নিমগ্নতার আড়ালে তলিয়ে যায়
সমালোচকের ছদ্মবেশ।
সকাল থেকেই তোড়জোড়
অন্দর আর আঙিনা দুটোতেই দেবদারু
হলুদফুলের তোড়ায় ছোট্টশিশুটির কত আবেগ
কবিদাদু পরবে তার রতনহার।
সরকারী মননের পালা সন্ধ্যায়,মিলিয়ে যায় জীবনানন্দের ইঁদুর-ধান-মাটি
হাইরাইজের লিফটের ব্যস্ততা
ঘনঘন বিদ্যুত-সংকট,সবুজ কার্পেটের তলা থেকে বেরিয়ে পড়ে
অন্দরমহলের শুকতারা,কাজুফেণী আর বেলফুলে
উদ্দাম শ্বাস ফেলে বিছানায়
ধ্বংস হয় তাবড় সেবকের রবীন্দ্র প্রীতি;তখনও মায়াবী রাত্রির সিগন্যাল পোস্টের কারসাজিতে
বেজে ওঠে -
"
আছে দুঃখআছে মৃত্যুবিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তিতবু আনন্দতবু অনন্ত জাগে।"

সুতরাং বাইশে শ্রাবণ / অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়

যতই লিখি না কেন, মনে হয় অলেখা ;
নেহাৎ গদ্য পদ্যের মিথুনে অকিঞ্চিৎকর ধ্রুবতারা ।
তবু শুনি আলোকবাণী অগ্নিবীণা হতে ।
অদেখাকে দেখার বিপুল বিভ্রম,
বিচ্ছুরিত আতপ-দ্বন্দ্বে প্রিজমিত সময়বর্তুলে ।
তুমি বিরাজিত মাত্র স্বতঃসিদ্ধের অবিকল পুঁথিতে ।
তোমার উদাত্ত মন্ত্র অনুরণিত, দমক কোন্দলে
;
কুলায়ের অভাবে তা ছিন্নপত্রে পর্যুবসিত ।
রজতলে তোমার পদচিহ্ন অনাবিল, অস্পৃশ্য ;
তোমার রাঙ্গামাটি সজ্জিত অলক্ত ধারণ করে ।
অশনে, বসনে তোমার নাম চিত্রিত, বর্ণিত, আবৃত ।
তবু, তোমার আলিঙ্গন-পাশে বঞ্চিত মমকুল ;
বঞ্চনা ভিড় করে রাতে, দুর্ভেদ্য দেওয়ালের কানায় ।
আরক্ত লেখনী বোবা কাগজে বয়ে আনে অস্বীকার ;
অধৈর্য মননে সৃষ্ট হয় পাণ্ডুলিপি – ‘অন্তঃসলিলা
তুমি রয়ে যাও স্মৃতিতে, কিশোরীর কবরীতে,
অবিনশ্বর সন, কাল, তারিখে মরনহীন হয়ে ।
অভিজ্ঞানে লালিত হয় আকরিক বাইশে শ্রাবণ

                           রবীন্দ্রনাথ / শ্যামল দাষ

যুবক আজও ভালোবাসে
কবিতা তা্র;
যুবতীও গান
দুজনেই উদ্ধৃতি করে
রবীন্দ্রনাথ - প্রেমেও মহান !

                                 

  


        





0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About