অনির্বাণ সাঁতার জানে না /রাজর্ষি ঘোষ

যদিও অনির্বাণ সাঁতার জানে না,
তবু ঘুড়ি দেখে সে ভিক্টোরিয়ার ফেনিল আকাশে।
দেখে পেটকাঠি হারিয়ে গেছে জ্যামিতিক চতুষ্কোণে
আর একশ আশি ডিগ্রি ফালাফালা হেলে পড়েছে সূর্যের আলো।
কখনো দামাল, কখনো তুলকালাম; আবার কখনো সে অনির্বাণ,
সবুজ ঘাসের গালিচায় একমনে তরজা করে দুটো বুড়ো শালিক।
হঠাৎই বিবাগী ওরা, তবু সংসারী ইঁটের পাঁজরে।
একান্তে ধোঁয়া ওঠে পলভর; হাঁফ ছাড়ে কানভাঙা চায়ের কাপ।
হাঁফ ছাড়ে আমার শহর - আমার কলকাতা
যদিও ধূম্রপান বর্জনীয়।

অনির্বাণ শুনেছিল, সেদিন অর্ফিয়ুসের বাঁশির আহ্বানে
কিছু ন্যাংটা ছেলে সাঁতরে হাজির হয় শ্যামবাজার পাঁচমাথা মোড়।
তারের আড়ালে নেতাজীও ঘোড়াচ্যুত, বৃষ্টি এনেছিলেন মুচকি হেসে
যদিও সাক্ষী ছিল না কোন দশ টাকার নোট...
তবু সেদিনের অকাল শ্রাবণে কাকভেজা ভিজেছিল অনির্বাণ
ভিজেছিল, আর সংবাদ মাধ্যমেরর সামনে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল
পেটে বড় ক্ষুধা। দুদিন ভাত জোটে নাই।
তারপর কালিন্দীর মোড় থেকে বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেস ওয়ে,
কল্যাণী থেকে বসিরহাট,
ভেসে ভেসে গেছিল কত পরিচিত মুখ...
গান্ধী নেহেরু জিন্নাহ্‌...
শেষমেশ ডুবে যায় সব বিলো পভার্টি লাইনে।

অনির্বাণ সাঁতার জানে না।
তাই ফিরে ফিরে আসে ফ্লাডলাইটের গোপন আঁধার, নিয়ন আলোয়...
এক দুই ব্রেস্টস্ট্রোক কেটে প্রতিদিন পার হয়ে যায় ইংলিশ চ্যানেল,
পার হয় বোকা বাক্সর নিজস্ব প্রতিবেদন।
একা... একা... কোন দ্বিতীয় ছিল না ওর সাথে।
ছিল শুধু ফুটো কালো ছাতা, এক বুক মেঘমল্লার।
হরিণীর ছায়া ছায়া, আর হেমলকে গুঁজে থাকা মুখ;
তারা জাগে আকাশের কোণে।
ফিরে যায়
ফিরে যাবে অনির্বাণ ঘুড়িদের সাথে সেই আদিম অরণ্যে,
উঁহু... যেখানে আদমের কোলে মাথা রাখে নি কোন নারীশরীর,
চুমু খায় নি সভ্যতার গোপন কন্দরে।
ফিরে যায়, যদিও অনির্বাণ সাঁতার জানে না।

এখানে রাজপথ ছায়াপথ মনে হয়।
গ্যালাক্সির কোটি ত্রিফলা সূর্য জাগে বন্ধ দোকানে।
একটি পেগ্যাসাস, আরশিনগরে আজ চাঁদের আড়ত।
অনির্বাণ খুঁটে পাবে হুইস্কির গ্লাস... আধজাগা নেশার আদরে।
কারণ, আমাদের দেশী চলে না।
পুনশ্চ, আবার এদেশি চাঁদে কলঙ্কও থাকে।
অনির্বাণ বেছে বেছে নেবে মাছ থেকে কাঁটা, কাঁটা থেকে মাছ,
শুঁকে নেবে সাড়ে ছশো টাকার পদ্মার ইলিশ
তবু আদ্যোপান্ত বিড়াল সে হতে পারবে না।
দক্ষিণের বারান্দা থেকে ছাদের ঘুলঘুলি...
শিস দিতে দিতে ঘুমোতে পারবে না গদির বিছানায়।

কারণ অনির্বাণ সাঁতার জানে না।
জানে না ই ইক্যুয়ালস্‌ টু এম সি স্কোয়ার হয়।
জানে না লক্ষ কোটি আলোকবর্ষের দূরে
ওরই অপেক্ষায় দিন গোণে আরো একটি দ্বিতীয় অনির্বাণ
সুতরাং অপ্রয়োজনীয়
তবু ওর স্বপ্ন জুড়ে আছে শুধু বোর্ণিওর জঙ্গল।
বোর্ণিওর জঙ্গল... অ্যাটলান্টিসের প্রাসাদ, চাঁদের পাহাড়,
মঙ্গলের অ্যামিবায়োটিক জীব, এবং
এবং অনির্বাণ।
অনির্বাণ দিল্লী গেছিল নেতাজীর সাথে,
অনির্বাণ শিখেছিল,
অনির্বাণ বুঝেছিল
যদিও অনির্বাণ সাঁতার জানত না।


পরাস্ত ভিটেহারা ভালবাসা 

শুভ বাবর

গভীর ফাটল ধরে পৃথিবীর পথ হাঁটি
জিহ্বাটা কেটে দাও ,চোখ অন্ধ করে দাও;
প্রাণটা কেড়ে নাও ,কবর খুঁড়ি গহীন জঙ্গলে
শুনতে হবে না কোন অপ্রিয় কথা ,তুমি নেই
পরাস্ত অন্ধকার প্রদত্ত স্বাধীনতা তুলে নও
হতক্লান্ত সৈনিকের হাতে সীমাবব্ধতা তুলে নও
নকল প্রেমিকা রাস্তায় কবিতার স্বরলিপি উড়ে
রৌদ্রজ্জল দিনে একফোঁটা বৃষ্টির প্রেম দাও ,
শিশুটির কান্নার স্বরে নেচে গেয়ে যুদ্ধে যাব
ধর্মযাজিক সোনালি চুলে সূর্য যেন নিদ্রায় আসক্ত
স্বর্গীয় বালকের বসন্ত উৎসবে সন্ধ্যাবেলার সুখ দাও৷

পরকাল বেহেশতের লোভ দেখিয়েছে ঈশ্বর
এতেই পরাজিত এক সময়ের বীর সাহসী যোদ্ধারা
তারচেয়ে প্রাণটাই কেড়ে নাও ,ঋন তুলে নও
তোমার কাছ থেকে তো জানা হলোনা আগামী
জীবনের সংজ্ঞা
সাদা মোম বাতির সাদা সুতোয় হলুদ রোদ ঢেলে
জীবন কে জ্বলতে শেখাই কেমন করে পুড়তে হয় !
দুটো পা বেঁধে দাও , নিষিদ্ধ জিহ্বাটা কেটে দাও
অচিরে মুখটা অন্য কারও মুখে ঠেকে দাও
মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে অন্ধকারে পালায় স্বপ্ন
মাইল মাইল সাঁতার কেটে দৃশ্যমান রয় না কিছুই
অবিচ্ছিন্ন সহযোদ্ধাদের অমানবিকতায় নেশায় বুদ
হাসিদের সব হাসি উধাও দুঃখ অস্বীকার করা হয়েছে
তবুও একটি পিশাচের কাছে পরাস্ত ভিটেহারা ভালবাসা ৷



ক্ষত / নির্মাল্য চ্যাটার্জী

বহুদিন পর মধ্যরাত আর আমি
বিরক্তির ঘাম লেগে ভেজে না শরীর
নীরব, নৈ:শব্দের ভাঁড়ার,অথচ
মধ্যাহ্নের কড়া রোদে -মানুষের 
চোখের ভিড়ে ভীষণ ব্যস্ত আমি !
অনেকটা পথ ঘুরে ফিরে
আজ আবার, ঘোলাটে চাঁদ আর আমি, 
আমার শরীর মাখে গাড় নি:শ্বাসের অনুভূতি
আমার স্বপ্ন গুলো আর ছাতিম ফুলের গন্ধ শোকে না, 
কষ্টের চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়ে
জ্বলন্ত চিতা দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে !
এমনি করে নীরবে, নীরাদরে,
দিনে-দিনে হারিয়ে যায় আশাতীত আশা। 
আমার অবকাশের একচিলতে বারান্দায়
নেই কোন ভাটিয়ালী সুরের ঘ্রাণ, আজ 
শুধুই আছে যন্ত্রণার পীচ পোরা তাপ। 
একাকী কষ্টের হাহাকারে কেঁদে ওঠে হৃদপিণ্ড
বেঁচে থাকাটা আমার বড্ড ভয়ের। 
নীল আকাশে জুরে আজ জমাট মেঘ
আমার অজস্র ক্ষতচিহ্ন নিয়ে ভেসে চলেছে, 
অজস্র যন্ত্রণা ঘূর্ণাবর্ত হয়ে আগামী 
বর্ষায় নেমে আসবো তোমার বুকে 
ভিজিয়ে দিতে নয়, জন্ম দেবো 
তোমায় একরাশ নতুন ক্ষত আর কষ্ট।
 

আদিসত্য / রহমান হেনরী

আসমানের রাজহাঁসই আদিসত্য, স্নিগ্ধ রাজহাঁস,
রাত্রিকালে নীল নীল ঊর্ধজলে ভাসে।
যে-বাসে সে এমনি বাসে,
যুক্তিহীন, অন্ধ, ভালোবাসে
চিরদিন__
ভালোবাসা আরও সত্য, আদি-অন্তহীন;
যে-বাসে সে হাসিমুখে যুদ্ধের ময়দানে
প্রাণ দিতে জানে;
সহজে বরণ করে নিতে জানে মৃত্যুর মিছিলও__
না হলে তো মুক্তিযুদ্ধ অসম্ভব ছিলো!

আসমানের রাজহাঁসই আদিসত্য, স্নিগ্ধ রাজহাঁস,
ভালোবাসা জাগিয়ে রাখে সে, বারোমাস।

শর্ত সুব্রত রায়

দেখো বস-
তখন প্রেমে ছিলাম,
এখন ফ্রেমে আছি-ড্রেসিং টেবিলে ।
তবে কিছু কথা আছে এমন
শুরুতেই স্পষ্ট করে নিলে
দিন গুলো কেটে যাবে সহজ সরল ।
আর দশটা মধ্যম মেয়ে চায় যেমন
আমার আকাঙ্খাও ঠিক তেমনি ।
তবে আকাশের চাঁদ চাইবো না জেনো,
জানি ওকে গানেই মানায় ভালো ।
বলবো তবু একটি ভালো গাড়ি করো,
বাড়ি হলে ভালো, নয় বড় ফ্ল্যাট এ সি,
মাস মাস মার্কেটিং শালোয়ার শাড়ি,
সাজগোছ, মাঝে মাঝে জুয়েলারি,
বছর বছর ভ্রমনের প্ল্যান
খুব সখ ইউরোপ যাব, সিঙ্গাপুর ব্যাংককও
মরিশাস বনানীরা এই ঘুরে এলো ।
আর একটা কথা, ক্রেডিট কার্ড করে দিও
একখানা,মাস মাস ঘ্যান ঘ্যান সইবেনা মনে ।

তবে বস, অন্তে একটা ফুটনোটও আছে,
শিরদাঁড়া সোজা রেখে যতদূর হয়,যেও ততদুরই
আর দেয়া নেয়া হয় যেন শুধু ডানহাতে
বুকে পুষে রেখো না ব্যথা,
মুখে বোলো, মেনে যাবো ।
আগামীর কানে তোমার 
কাহিনি বলে
ঘুম পাড়াবো আমি,
যেমন শুনেছি গল্প, রাত রাত মায়ের কাছে ।

 বিদিশা / শৌনক দত্ত তনু

জানি না কোথায় তুমি-
আশার স্পন্দন রেখে গেছো পৃথিবীতে
সাদা ঘোড়াদের আবছায়া আভার ভিড়ে
পরিচিত পথ ধরে।
জানি না কোথায়,
মমতা ও বিষন্নতার অন্ধকার ভেঙে
রেখে গেছো ক্রমোন্নতির আলো
অনন্ত পথের অর্ন্তধানে।
নারীর হাতের নিবিড় মোমের মতো
প্রেম আছে-মাছরাঙা আলোয়
বাতাসের অনন্ত নিস্তদ্ধতার ভেতর
তবু খটকার মতো লাগে লাভ বার্ড
আমার হৃদয়ে,জাফরান আলোয়।
মিশর নীলিমার মতো
পাখির পালকের ছবি চোখে একেঁ
জল ফড়িঙের মতো নীল আকাশের
রৌদ্র বুকে নিয়ে
আমার সনাতন বেঁচে থাকা
সোমালিয়ার বিস্মিত অপুষ্টিতে।
জলপায়রার বুকে এসে জোছনা
লিখে যায়-তুমি আছো
আমার পদ্মপাতার বুকে
নীরবে নিভৃতে দূর সমুদ্র ঘর হয়ে
শ্রাবনমাখা তুলে রাখা রেইনকোটে
কোথাও কি অন্ধগলির কষ্ট জ্বলে ওঠে? 
দেখো!দৃষ্টিহীন সভ্যতার চোখেমুখে
উছলে উঠেছে আলো..

সাদা দিন / সূর্যস্নাত বসু

কালো মেয়ের হয়ে রেখে যাব আজ একটি সাদা দিন ।
রাখব কিছু গীটার বাঁশি হারমোনিয়াম,
চকলেট রাশি রাশি, কিছু রঙিন টুপি,সানগ্লাস, লাল বেলুন সুরেলা বীন,
কালো মেয়ের হয়ে রেখে যাব আজ একটি সাদা দিন ।

কবিতা লেখার প্রথম লাইন
যেমন করে লেখায় সে,
আমাকে নয়, বাবাকে নয়,
সব পুরুষের হাতদুটো ধরে বিছানায় টেনে
কাগজ কলমে প্রণোদিত করে
নাকি প্ররোচনা ভ্যানিস করেছে কৃষ্ণ অর্বাচীন,
কালো চোখদুটো ফেরাবে আজকে আমার সাদা দিন ।

সত্যি কথা সহজেই হয়,
সহজ সত্য কঠিন নয়,
সকল সত্য শিব বলে ভাবো, মিথ্যেকে ক্ষমাহীন...

মিথ্যে বলেই বলছি তোমায়
দ্যাখো
ট্রাম-অটো-বাস দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে আছে 
শহুরে বাতাসে মেশানো গ্রামীণ ঋণ,

নব্যতা আনে নবযুগ তবু পুরোনো স্বপ্নে ঘুম ভাঙে রোজ,
ঘুম ভাঙেনা রেঁনেসায় আজ, কালো জল রঙে 
মেশাবোঁই তাই স্বরূপ সজ্ঞাহীন
আমি কালো হয়ে পূর্ণ করব - ডিসেম্বরের দিন ।

ভেবোনা আমাকে, শব্দ করোনা সাইলেন্ট মোডে শায়েরী নর্ম নাট্যমোদী আমার জীবনে
জীবন মানেই আমার পর্ণ
মায়া হয়, তবু লাঞ্ছিত তুমি কালোকুচকুচে জিন,
ছেড়ে চলে যাব তেজোমূর্তি শান্তি-শীতল দিন ,

কালো মেয়ের হয়ে রেখে যাব শেষ ডিসেম্বরের দিন ।

রাতের অন্ধকার / ই ন্দ্র নী ল ভ ট্টা চা র্য্য

রাতের অন্ধকারকে ভয় করি;
ঘুম যখন সবাইকে শান্তি দেয়
আমার মাথা তখন জটিল সমস্যার জাল বনে ।
রাত যখন পরের দিনের শক্তি দেয়,
আমার শরীর আস্তে আস্তে ভাঙনের পথে যায়।

রাতের অন্ধকারকে ভীষণ ভয় করি;
মন যখন সবার ঘুমিয়ে পড়ে,
আমার মন আমাকে জাগিয়ে রাখে
আমার শরীরকে নিয়ে এক ভয়ংকর খেলা শুরু করে ;
ইচ্ছে না থাকলেও বলে আমার সাথে যুদ্ধ কর !

রাতের অন্ধকারকে বড় ভয় করি;
নিজের হয়েও কেমন পর হয়ে যায় মন
আমার শরীরকে নিয়ে ছটফট করতে থাকে সে,
মানসিক যন্ত্রনার আঘাতে শেষ হতে থাকে সারা শরীর ।
কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলে ॥
             
সংরক্ষিত / পৃথা রায় চৌধুরী


সামনের আশ্বিনে চৌত্রিশ হব মা 
তবু তোমার কাছে আছি 
কুমড়ো বীজ হয়ে;
পাশের বাড়ির রিনা, তেইশ,
অথচ কি সুন্দর লাল রঙ
গুছিয়ে পরে কপালে, সিঁথিতে।

এই যে ভাদ্র রোদে আলমারি হাট করছি
ও বাড়ির কাকিমা, একই উত্তর পাবে জেনেও
জিজ্ঞেস করল, কবে যাব;
আগে বুকের ভেতরে বাষ্প জমতো
এখন জ্বালানির অভাব হয়েছে বলে,
তাও হয় না।

বাবার পেনশানে সংসার চলে না
কাঁধ পেতে দিলাম
সেখানে আজ অট্টালিকা গড়ে উঠেছে,
গায়ের রঙ বেশ ফর্সা, লোকে বলে
এটা বলে না, সামনের দাঁত দুটো
খরগোশের মতো বেরিয়ে থাকে
ঠোঁট টেনে টেনে ঢেকে রাখি।


বিকেল পাঁচটার মধ্যে
ন্যাতানো ছাদ থেকে সব গুছিয়ে তুলব
নাকে ঝাঁঝ লাগে
নিজের ভেতরে টের পাই
একটা অদ্ভুত গন্ধ
বোধহয় ন্যাপথলিন হয়ে গেছি।

সকাল কাকলী মুখোপাধ্যায়

আজ আমার সকাল জুড়ে
নৌকো গুলো পাণ্ডুর জলে ভাসে।
প্রতিটি জলের চাঙড়ে প্রতিবিম্ব আমার
ক্রমশ বিভাজ্য পুরুষের দেহে
রক্তাক্ত ভাগশেষ আমার হৃদয়।
       
            পাতা উলটাতেই সতেজ সবুজ
                   তখন সকাল অজস্র রোদে 
                   কাফনের ঘ্রাণ ।

হরতাল শান্তনু মৈত্র


বিক্রি করে দেব এই দেশ ... 
বারবার ডাকতে ডাকতে থমকে গিয়েছে নিলামের দিন গুলো ,
ক্রমাগত জমে জমে পাহাড় হয়েছে ... দুর্নীতির পাহাড় যত 
ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগে , শেষবার খুঁজে দেখি
একটা নিহিলিস্ট সভ্যতার গন্ধ 

পরতে পরতে ভেসে ওঠে ... নিষিদ্ধ প্রেমিকার শরীরে 
যুদ্ধজয়ের উল্লাস ... 
শহরের জরাজীর্ণতায় বাসা বেঁধেছে গতানুগতিক হরতাল ... কিংবা 
কর্মনাশা বন্ধের যাপনচিত্র ... 
সেই সমস্ত জীবন পেরিয়ে আমরা চলতে থাকি 
কাস্তের মত পথের বাঁক পেরিয়ে 
ক্ষিদের গন্ধ মাখা একটা অনির্দিষ্ট ঠিকানায় ...


সন্ধানসুমনা ভট্টাচার্য

সন্ধ্যেবেলায় ফ্ল্যাটের সিঁড়িতে
পা দিয়েই ধুনোর সুবাস
ছেলেবেলার পুজো মণ্ডপ ঘেরা স্মৃতিগুলো 
অকস্মাৎ ভিড় করে মনের আর্ট গ্যালারিতে

তিনতলার ফ্ল্যাটে ঢুকি চাবি খুলে, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ
সকালে কাচা জামাকাপড় শুকোয়নি 
আলো জ্বেলে জানালা খুলে ধুপকাঠি ধরাই 
সুরভিত পারিপার্শ্বিক

চা মুড়ি ঝুরি ভাজা নিয়ে টিভির সামনে
দমকা বাতাস জানান দেয় - মা;, ইলিশ অথবা চিঃড়ি
রান্না হচ্ছে প্রতিবেশীর হেঁসেলে

ভোরে হাঁটতে যাই যখন, কে যেন গায় এক কলি গান
তোমায় দেখেছি শারদপ্রাতেআচমকা সুঘ্রান ফুলের
ইতিউতি তাকিয়ে খুঁজি রাধাচুড়া

অফিসে যাওয়ার পথে নামি একতলায়, 
শ্যাম্পুর সুরভি কণারা দেয় আলতো ছোঁয়া
ফুরফুরে এক সুন্দর অনুভূতি
ঘ্রাণ শক্তির ক্ষমতা অসীম, 
সেই প্রস্তর যুগে খাদ্য অন্বেষণ শিকার থেকে আজ অব্দি 
খুঁজে বেড়াই ভালবাসার গন্ধ.........

চিঠিতোমাকে / ঈশানী রায়চৌধুরী হাজরা


অবাধ সখ্য আর অন্তহীন কথোপকথন 
বারে বারে " ভালোবাসা" শব্দ তখন উচ্চারণ 
ভালোবাসি কি না বাসি..এই বোধ সত্যি বড় দায় 
বুকেতেই ঢেউ তোলে , বুকেতেই অনন্তে মিলায়
এ মিতালি জীবনের , বিনিময়ে সুধার আস্বাদ 
চাপানউতোর আর যখন তখন বিসম্বাদ 
তবুও মুহূর্তসুখে দিনরাত এই বেঁচে থাকা 
তুলি নেই, রংও নেই, শুধু জলে জলছবি আঁকা 
এভাবে সময় যায়, আমাদের শ্বাসে ও নি:শ্বাসে 
অকালে বৃষ্টি পড়ে, বাতাসে কুসুমগন্ধ ভাসে 
ভালো লাগা ...ভালোবাসা ...এখনও কি হয়নি তা জানা ?
কিছু কথা হয়ে গেছে..." বাকিটুকু বাক্যে বলা মানা " ...

সংকেত আজান / শুভঙ্কর পাল

এই কদিন হ’ল

শীত মরে গেছে যাযাবর পাখিদের ডানায়

যতি চিহ্ন যেটুকু অবসর !

নট নাটুকে সঙ্গীতে আল দেয়া ধান ক্ষেতে লেগে আছে

নতুন ধানের বাউল গান ।

ফিরে গেছে ঘুঘু ফাগুনের রঙ মেখে ।

পেন্ডুলামে তাক করে থাকা ক্রিয়াপদে

হরিনীর দল নিরুদ্দেশে অভিসারিকা ।

পলাশে লেগেছে আগুন

স্ররবনামে গারাবার কোন অসুখ নেই আজ ।

হাতে পাওয়া চিঠি জানে

ফেলে যাওয়া রোদ ও পদচিহ্নে কেউ আঁধারে মুখ ঢেকেছিল

স্বচ্ছধারা / কে এন ইপ্সিতা

আমার কালঘড়িতে আজ চিরসবুজ উর্ণনাভ
যেন অনেক সময়ের পথ ধরে তার বয়ন;
কোন বিচ্যুতির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে,
আমার অন্তরালে এক অনুঘটকে ।
আমি তার জীর্ণতা দেখে ভয়ে সঙ্কুচিত হই যে
একি তার অবস্থা ।
অবসন্ন সময় তার গতিপথ পরিবর্তন করে;
আর আমি হাতড়ে বেড়াই বহুযুগ পুরনো অপ্রাপ্তিকে ।
হয়ত খুঁজে পেলে তাকে শুধব
বিপশ্চাত ভাবনা মানুষকে অনেকদূর নিয়ে যায়,
কিন্তু তোমার তো এমনটি হবার কথা ছিল না
যেখানে আত্মহনন অপ্রতিভ ।
আমার বিস্মিত মন তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে কুশলী
কিন্তু তোমার জীর্ণতা আমাকে রুখতে বদ্ধপরিকর
আমি জানি আমি এটা নিবৃত্ত করতে পারব
কারণ করালক্রান্তির জন্যে আমি স্বচ্ছধারা ।

প্রেমের ছোট্ট ঢেউ / মারুফ রসূল

সময়ের শব্দার্থ মেলেনি কোনো-
কেবল বসে বসে কেটেছে অলস সময়
রেস্টুরেন্টের টেবিলে সন্দল ছায়ার সাথে গড়িয়ে গেছে ঘড়ির কাঁটা
নিবিড় কোনো প্রণয়নীর আশায়। বরফের মতো জমে ছিলো কোলাহল
এ-পাশে ও-পাশে- কখনও মৃদু কিংবা শোকার্ত শব্দের সন্ন্যাসে।
কেবল আমিই বসে থেকেছি অসীম জড়তার ব্যাসবাক্যে।
টেবিলে ময়লা গ্লাস।
গ্লাসের ঘোলা জল।
জলেতে শব্দের ছায়া।
ছায়াতে নারীর মুখ।
মুখেতে কামনার ছবি।
ছবিতে শীশ্নের মায়া।
মায়া কাটিয়ে হঠাৎই জেগে ওঠে অন্তর্লোক-
আলোকিতো, আবেশিতো, মোহময়- যেনো বিবর্ণ ব্যাকুল
আর বিলম্বিত এক চুমোর তৃষ্ণা
ক্রমশ আরোপিতো হতে থাকে এক মানবীর অন্তহীন নীলিমায়।
নীল চুড়ির ব্যাসার্ধে বৃত্তাবদ্ধ হই আমরা- আমি আর মানবী
চোখে চোখ রাখি ক্লান্তিময়-
তার উরুর স্রোতে মোৎসার্টের মতো বাজতে থাকে
একটি স্কেচবুক- দৃষ্টি তার স্তনমুখী,
যেনো কনকাচলের দিকে একবার তাকালে
আর চোখ ফেরানো যায় না।
অসংলগ্ন প্রলাপের মতো বকে যায় তার পাশের ছেলেটি
প্রেমিক নয়; জগতে প্রেমিক হবার মতো কঠিন সাধনা আর নেই।
আমাদের চোখে চোখ পড়ে কয়েকবার-;
যেনো শতাব্দীশ্রেষ্ঠ বৃষ্টি নেমে আসে রেস্টুরেন্টে
চারপাশে বাজতে থাকে পৃথিবীর প্রথম শীৎকার
আর সেই সাথে মানবীর উঠে যাবার শব্দ।
সাথের ছেলেটির হাত ধরে চলে যায় মানবী
উন্মার্গগামী মানবীর ফেলে যাওয়া পথে
দূর্গার শেষ আঘাতে নেয়া প্রথম নিঃশ্বাসের মতো
গন্ধ শুঁকে নেয় শুম্ভনিশুম্ভ।
মানবীর নীলিমার গন্ধ;
মানবীর চুলের গন্ধ;
মানবীর চুড়ির গন্ধ;
আর সেই সাথে ওষ্ঠ-স্তন-জরায়ুর ছবি
যার প্রতিবিম্ব দেখেছিলাম আলোর তরল জলে
নিস্তব্ধ একাকী
কোলাহল-উত্তীর্ণ রেস্টুরেন্টের কোনো এক কোণে



এক বৃষ্টির দিনে / অভিলাষা দাশগুপ্তা আদক

মহুয়া বনে,
আপন মনে,
হাওয়ার লুটোপুটি।

ঝরা পাতা,
নাড়িয়ে মাথা,
খুশীতে কুটোপাটি।

কদম ফুল,
দোদুল দুল,
শাখায় শাখায় দোলে।

হাসনুহানা,
সুবাসধন্যা,
হাসছে পাতার কোলে।

সারা দুপুর,
টাপুর টুপুর,
ঝরঝর ঝরে বৃষ্টি।

ভরল পুকুর,
ঝামুর ঝুমুর,
আর চলে না দৃষ্টি।

মকমকি শুনি,
দাদুরের বানী,
মন লাগে না কাজে।

আবছা আলো,
আকাশ কালো,
সকালে কিংবা সাঁঝে।

এই একা থাকা,
আয়নাতে দেখা,
বড় ভালো লাগে দিনটা।

শব্দের খাঁজে,
কবিতার ভাঁজে,
খুঁজে পাই আজ মনটা।।
















About