১৬টি কবিতা ও একটি গদ্য । লিখেছেন - অয়ন দাশগুপ্ত, অনুপ কুমার দত্ত, চৈতালি গোস্বামী, হীরক জয়ন্ত, মহাশ্বেতা আচার্য, কামরুল হাসান,আশীষ সরকার, ঊষসী ভট্টাচার্য, আকিদা নাহার। ইন্দ্রাণী সরকার, বৈজয়ন্ত রাহা, সুমী সিকান্দার, অরিন্দম চন্দ্র, গৌতম গোস্বামী , মুনমুন দাশগুপ্ত ও তন্ময় দত্তগুপ্ত ।
 


সম্পাদকীয়

১৭ই এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি – চারদিনের ব্যবধানে দুটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলাম -- ‘শ্রদ্ধা স্মরণে জীবনানন্দ’ এবং ‘ভাষা প্রণাম’। বলা বাহুল্য,অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছিলাম লেখক ও পাঠক উভয়ের কাছ থেকেই । শেষ মুহুর্তে পাওয়ার জন্য দুটি বিষয়েই কয়েকটি লেখা দিতে পারিনি । সেগুলি এই সংখ্যায় প্রকাশ করলাম ।
ওপার বাংলা উত্তাল – শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে তারুণ্যের বজ্র নিনাদে । ২৭শে ফেব্রুয়ারি কলকাতা তার সংহতি জ্ঞাপন করেছে – ‘অন্য নিষাদ’ও সঙ্গে আছে । এই সংখ্যায় তিনটি প্রাসঙ্গিক কবিতা প্রকাশ করে সংহতি জ্ঞাপন করছি ।
         প্রসঙ্গত জানাই এমাসেও গত বছরের মত দুটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হবে – ৮ই মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারীদিবস’ এবং ২৫শে মার্চ ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা দিবস’ স্মরণে । নারীদিবস সংখ্যার প্রস্তুতি চলছে ,আরো কয়েকটি কবিতা নেওয়া হবে যেগুলি ৬ই মার্চের মধ্যে পাবো । ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা দিবস’এর কবিতা পাঠাতে হবে ২৩শে মার্চের মধ্যে ।
         ‘অন্য নিষাদ’ শুধুমাত্র একটি কবিতার পত্রিকা নয় – একটি সামাজিক উদ্যোগ । ‘অন্য নিষাদ’এর সঙ্গে থাকুন । সমস্ত শুভানুধ্যায়ীর প্রতি শুভেচ্ছা নিরন্তর ।

অনুচ্ছেদে পাবেনা ......


একদিন সম্পূর্ণ একটি কেতাব হবো কিনা
                                     জানিনা
কিংবা, সম্পূর্ণ এক আন্দোলনের নেপথ্যে
টুকরো টাকরা কলহ গুঞ্জনে মিশে যাবো কিনা
                                     জানানেই
হয়তো কোন অধ্যায়ও নয়
বড়জোর ,
অধুনা কোন দু কলমের ছাপার ফর্মায়
দুএক ছটাক জমি পেতে পারি ।

তোমরা শাস্ত্র সম্মত ফুটনোট খুজে
আমার কাছে এসোনা
তবে এমন রহস্যের শুরু ও শেষ – তাতে যেটুকু যা সত্যি সত্যি
আমি পড়ে আছি,
তা বিধিবদ্ধ কোন অনুচ্ছেদে পাবেনা



চারপাশে হেঁটে বেড়ায় মন

আমার কতবার মনে হয়েছে এমন
যে লোকটা ভিক্ষে করে আর আমিখুব ক্লান্ত
মনে হয়েছে,,
দর্জি দোকান, অতি আধুনিক সিনেমা মল
ধোঁওয়া উড়ানো হুকা কল্কি শুড়িখানা, কোথাও ঢুকতে পারছি না
মনে হয়েছে,,,
এক রাজহাঁস জলের গভীরে ঠোঁট চেটে দুধের সন্ধান করে চলেছে
মনে হয়েছে..
ক্ষুর কাঁচি গন্ধ সেলুন,খাটালে দুধের সাদা সাদা আস্বাদ
মনে হয়েছে..
সোনার কনক্রিট দালান,সবুজ হারিয়ে নীল উদ্যান,
ব্যবসায়ী দোকান,কাঁচ এলিভেটর,সব কিছু থেকে
নি:স্পৃহ এক উপচে পড়া বাতুলতা আমার পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে
মনে হয়েছে...
আমি নিজের পায়ের ভারে ক্লান্ত, আমার নখ,আমার চুল,আমার ছায়া
মনে হয়েছে...
এসবের ভেতরে আমার ক্লান্ততা বেশ কবজা করে রেখেছে
মনে হয়েছে..
আরও অন্ধকারের শিকড়ে রাত ভেঙ্গে আমায় যেতে হবে
দ্বিবিধা লম্বা করা হাত,স্বপ্নগুলো কাঁপা কাঁপা নীচে পাতাল গঙ্গা ভিজে মাটির স্তর
মনে হয়েছে..
এসব যেন ক্রমশ শুকিয়ে আমার চিন্তাধারা খেয়ে চলেছে প্রতিদিন
মনে হয়েছে...
সোমবার গুলো তেল রঙ্গা আগুন,রাত্রিগুলো জেল গরাদের মুখ খাবি খাচ্ছে
যেন এক আহত চাকা,খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঘুরে চলেছে সারা রাত
আর এক রক্ত মাখা শেষ রাত্রির দিকে এগিয়ে চলেছে
মনে হয়েছে ...
আমি এগুলো আমার শুক্রানুতে জড়িয়ে নিতে চাই
গাছের ভিত,মন্দিরের চূড়া,একক সুরঙ্গ,ঘন ঠান্ডা সেলুলার ফোন
এ সবই ঢুকে যাচ্ছে আমার অন্তরঙ্গ ব্যথার দোসরে
মনে হয়েছে...
সমস্ত বিশেষ কোন,সাঁতসেটে বাড়ি,হাসপাতাল থেকে
জানালা দিয়ে মানুষের হাড়গোর,মুচির দোকানে ভিনিগার চামড়া গন্ধ
মনে হয়েছে..
সবই অন্তরঙ্গতার হাতছানি দিয়ে
আমায় এক কোণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে
মনে হয়েছে..
সালফার মাখা বেহস্ত বিহঙ্গ, লতানো অন্ত্রনালী দরজার ঘরে
নোতুন বাঁধানো দাঁত পাটি,ভাঙ্গা চোরা কফিপট,সামনে উজ্জ্বল এক আয়না
মনে হয়েছে..
সমস্ত দেখা অদেখার ভিড়্গুলো আয়নার উল্টো দিকে টাঙিয়ে রেখেছে
আমি চোখ বন্ধ করে ক্ষমার অন্তরে দাঁড়িয়ে থাকি
আমার চোখের সমস্ত নোংরা জল আমার সার্ট, আন্ডার পান্ট আর টাওয়েল বেয়ে
ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যাচ্ছে


মনে হয়েছে..
আমি নিজেই খুব ক্লান্ত
মনের ভারে ভিক্ষার পাত্র হয়ে আছি
সমস্ত অভিদেখার অন্তরে.....চারপাশে হেঁটে বেড়ায় মন
________________________________________ 


খেলা

তুমি কাঁদছো! এটা জলের ফাঁদ। রমণীর নির্ধারিত ভান্ডার।
একটা কাজ কর অবাধ্য হও।
নিরাশা হোক প্রয়াসে অকৃতকার্য। তবুও সান্তনা,
বলা যাবে অকপটে সাহসী। অসামর্থেও অক্ষয়।
আবার কষ্ট পেলে তাই না! তাকিয়ে খোঁজ
যে আশ্রয় সেই বনভুমিজুড়ে ভরা বৃষ্টিতে
ফিরিয়ে দেবার কালো রাত।
তুমি কি শোননি ছায়ালীন কাব্যে বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস?
বিচ্ছুরণে তোমাকে মানায় বিরুদ্ধাচরণ।
আমি তাকে ইর্ষা করি! ইর্ষা করি! ইর্ষা করি!
তরতাজা বাতাসে তোমার গন্তব্য পোড়ায় আমার সবই।
তবুও ফিরবো না! দুর্গের প্রাচীরে লিখেছিলাম
যে কথা আমার রক্তের ভেতর ব্যাকুল ভাঙ্গে তোমার সন্যাস।
কই সেদিনতো তুমি আসোনি!
শুধুই অস্থিত্ব কবচে বলে দিলে অবিম্বাস।
ধ্যান ভেঙ্গেছি। খুচিয়ে তুলেছি অমিত সম্ভাবনা।
একদিন দৌড়ে আসতেই হবে। এসেছো!
এবার আঘাত সামাল দাও। ভেবো না,
নৈশব্দ থিতিয়ে আসলে আমিও ধরতে জানি ছায়াপথ।



বৃশ্চিক 

বৃশ্চিক সময়।
ঘটন-অঘটনের সীমান্তে দাঁড়িয়ে
জ্বলন্ত চোখ স্পর্ধাভরে তাকায়
আমার, তোমার, প্রত্যেকের
মনের মধ্যে যে অমোঘ অস্ত্র আছে,
সে চাইলে ভবিষ্যতকে বেপরোয়া গুঁড়িয়ে দিতে পারে।
আমাদের অনিশ্চয়ে বাস
এইমাত্র যে পাখি তীক্ষ্ণ চিৎকারে উড়ে গেল
শূণ্য জুড়ে বাতাস কেঁপে ঊঠল সেই স্বরে
প্রজাপতির ডানায় তবুও কত রঙ শামিল...
হুড়মুড়িয়ে সময় এগিয়ে চলেছে আগে
আবার কোন কচি স্বরের হাসি বা কান্না,
আবার গদ্য, আমার জীবন, আবার চলা নতুন উৎসবে...

তোমার বিষণ্ন চোখে

দেখো আমি টুকরো হয়ে যাব,
এ শহর আমাকে শিখিয়েছে !
কি তুমিও ঝ'রে যাবে ?
তবে আমি কুড়িয়ে নেব আর শুক্নো পাতার মর্মর শব্দে
নায়কের মত হেঁটে যাব দূর কোনো পাহাড়ের পাদোদেশে !
সেখানে তোমাকে কবিতা শেখাবো,
ঝর্ণার জলে পা ডুবিয়ে চাঁদ দ্যাখাবো,
রাত্রির গায়ে মাথা রেখে রবীন্দ্র শুনাবো-
কবর কবিতার অভিনয় শেখাবো,
স্রষ্টাকে স্পর্শ করে দ্যাখাবো,
আর...আর পদ্ম পুকুরে সাতারও শেখাবো !
কি অবাক হলে ?
আমি পারি; তোমার পায়ের নুপুর হতে, হাতের চুড়ি হতে,
তোমার কানের দুল হতে, নাকের ফুল হতে এমনকি
তোমার ভিজে শাড়ির নিচে লুকোনো লজ্জা হতেও !
কা-পুরুষ ? এগুলো অতী সাধারণ ?
আরে ধ্যাত, আমি তো আরো কিছু পারি !
এই ধরো তোমার জন্যে কাল্‌ বৈশাখীর ঝড় হতে পারি,
বুকের একশ আট বিঘে জমি তোমাকে লিখে দিতে পারি,
বার্মার দ্য লেক আব নো রিটার্ন-এ যেতে পারি,
দিল্লির কুতুব মিনারে জুতো পায়ে উঠতে পারি,
‌ইসরাইলে দাড়িয়ে সাম্যের গান গায়তে পারি এমনকি
তাজমহলে মমতাজের নাম কেটে তোমার নাম লিখতে পারি !
অধরা,অমরাবতী- অবনীচারিতা,অজবীথি আরো কত কি !
আচ্ছা তোমার নাম যদি শেফালী দেই কেমন হবে ?
যে রাতে ফোঁটে আর ভোরে ঝ'রে যায় !
কোথায় পেয়েছি নামটি ?
কেনো, তোমার বিষণ্ন চোখে !


অঝোর

এভাবেই একে একে সমস্ত নিশ্চিহ্ন হয়
চিহ্ন খোঁজার প্রয়াস...
অতীতের ভবিষ্যৎ সব নিঃশেষিত ছাই -
উদ্‌ভ্রান্ত ছড়িয়ে পড়ে থাকে
চেনা মুহূর্তের টুকরো সব
যে অচেনায় স্পর্শ নেই আর
হাহাকার অনন্তে মিশে থাকে
অশ্রাব্য অশ্রুত...


মনে পড়ে তোমার কথা

হৃদয়ের সকল মায়া-মমতা,প্রেম-প্রীতি,দৃষ্টিকে উদার করে
উন্নত মননে আমি-
মনে পড়ে তোমার কথা।
জীবনের সব আবেগ,আনন্দ-বেদনার নিখুঁত অনুভূতিগুলো
আপন বুকে মেখে নিয়ে চির অপেক্ষমান আমি-
মনে পড়ে তোমার কথা।
কর্মক্লান্ত দিনের ব্যস্ততা,কিষ্ট-পীড়িত চিত্তের ক্লান্তি দূর করে
অনাবিল প্রশান্তিতে আমি
মনে পড়ে তোমার কথা।
সত্য ও সুন্দরের সাধনা করে মনের ক্ষুধা মিটিয়ে আমি
যখন মহাসমুদ্রের কল্লোল শুনি,
মনে পড়ে তোমার কথা।
জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে বিপর্যস্ত আমি,
হাবুডুবু খাই হতাশার চোরাবালিতে-তখন
মনে পড়ে তোমার কথা।
যখন আমি জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট,হতাশা-বেদনা ভুলে
অপূর্ণ থাকা দুর্দান্ত ইচ্ছাগুলো পূর্ণ করতে চাই-তখন
মনে পড়ে তোমার কথা।
হতাশা বিজড়িত নিরশাচ্ছন্ন সংসারে মাঝে মাঝে আমি-
তন্দ্রার মধ্যেও জেগে ওঠি,অবসাদের মধ্যেও শান্তি পাই
শুধু তোমারি কথা মনে করে।


শ্বেতা স্বয়ম্বরা

একপাশে ধনবান বৃদ্ধেরা
অন্যপাশে পড়ে থাকে বীর্যবান তরুণেরা।
কালো রাস্তা ধরে হেঁটে যায় শ্বেতা স্বয়ম্বরা।
রাস্তা শেষে অশ্বত্থের তলে,
মালা পড়ে, রাখাল বালকের গলে।
অতঃপর কোলাহল,
কোটর থেকে বেরিয়ে আসে,
কূট হলাহল।
ফিরে চায় রুদ্রাণী,
নিমেষে ঘরমুখী-
হতোদ্দ্যম পুরুষেরা ।
বৈকালী বাতাস,
ডাকাতিয়া হাসি হেসে,
মিশে যায় সমুদ্রের নীলে।
এখনই আঁধার হবে,
শ্বেতা স্বয়ম্বরা যাবে মধুবনে,
রাখাল বালকের সনে।
অন্যপাশে পড়ে থাকে বীর্যবান তরুণেরা।

About