এই সংখ্যায় ১৬টি কবিতা - লিখেছেন রত্নদীপা দে ঘোষ, অঞ্জন খান, অনিন্দিতা ভৌমিক,অলক বিশ্বাস, আনওয়ারুল কবীর, মেঘ অদিতি, রেজা রহমান, সুবীর সরকার, আলি রেজা, গোলাম মোর্শেদ চন্দন , লিক্ষণ কুমার ঘটক,সতীশ বিশ্বাস, রূপম রায় , সোনালী বেগম , আকাশ দত্ত, শশাঙ্ক বিশ্বাস এবং পুস্তক পর্যালোচনা- সুবীর সরকার’এর ‘এপিটাফ’, আলোচক  -  সৌমিত্র চক্রবর্তী

ছায়ানদী

সে আকাশ মাত্র ত্রিশ শুদ্ধ স্বর তুলে নিলো জোনাকির ঠোঁট থেকে

নদীর লালবট গুছিয়ে রাখছে ব্যথার চুপ গোধূলির রোদরঙ


গান হয়ে যাচ্ছে অথবা গানের ছায়া আতসের জলে বোনা ঘাগরা

জন্ম মুহূর্তে কৃষ্ণচূড়া খুলে রাখছে কমলাকোয়ার মিহিন আর

ঘাসফুলের শিষে জমছে বারিষ


শস্যবালিকার নীল তানপুরা অবাধ্য হয়ে উঠবে তোমায় ছুঁয়ে


নাম রেখেছিলে

মাকে আর মনে পড়ে না !
যেমন মনে পড়ে না হরিণের বিলের পাশে
ধান খেতের মাঝখানে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা শিরীষ গাছটি
তুমি যার নাম রেখেছিলে 'অঞ্জন' !
আজকাল তোমার ভুলে যাওয়ার অসুখটা বেড়েছে আবার
যখন আমরা চিঠি লিখতাম তখন ছিলো
আগের চিঠির উত্তর ভুলে গিয়ে তুমি
প্রসঙ্গান্তরে চলে যেতে
প্রায়শই অন্য পথে
আমি জানতে চাইতাম এক তুমি জানাতে আরেক
বকা ঝকাও কম খেতে না ! বিরক্ত হয়ে


কত চিঠির উত্তর দেয়নি আমিও
চিঠি না পেয়ে পেয়ে
না পেয়ে পেয়ে
একবার তুমি
চুড়ুটের রাংতা কাগজ ছিড়ে চিরকুট পাঠিয়ে
জানতে চাইলে, বেচে আছি নাকি !
সে সময় রাজপথ উত্তাল ছিলো !
প্রতিদিন ঢাকার খবর শোনে লাল হয়ে উঠতো মফস্বলের মাটি
একটাই দাবী ছিল : গণতন্ত্র
স্কুল পালিয়ে মিছিলে যেতাম বলে তোমার উদ্বেগের সীমা ছিলো না !
একবার বন্ধুদের সঙ্গে গাঁজা খেয়ে
দুম করে পরে গিয়েছিলাম ক্লাবের চেয়ার থেকে
পরের চিঠিতে এ গল্প শোনে তুমি কেদে কেটে অস্থির হয়েছিলে
টানা তিন দিন খাওয়া দাওয়া নেই, কলেজ নেই
বললে তুমি মরলে আমার কি !
আমিও নাকি লিখেছিলাম এ রকম, তাই প্রতিশোধ !

চিঠির পাতা ছেড়ে তোমার সঙ্গে যেদিন প্রথম দেখা
বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাশে ; সেদিনও এমন শীত ছিলো
তোমার হাত ছুয়ে দেখি কি ঠান্ডা !
আজকাল তোমার হাত আরো বেশি ঠাণ্ডা !
আজকাল আমি ঘরে বসে গাঁজার আসর জমালেও
তুমি চেয়ে দেখো না !


আজকাল তোমার মনেও পড়ে না
কোনকালে তুমি একটি গাছের নাম রেখে ছিলে 'অঞ্জন' !


নতুন বছর 


দেবে আমায়
একটা জীবন ?
সোনার মত
না হোক দামী ,
তবুও আমি
চেটেপুটে
বাঁচতে পারি ,
সুখদুঃখ জারিয়ে নিয়ে
অগাধ ভালবাসতে পারি
ইচ্ছে মতন
উড়তে পারি ,
যেমন খুশী
আঁকতে পারি ,
কিম্বা ধরো
গাইতে পারি
মুক্তির গান ,
দেবে আমায় ?
গরম ভাত আর
একটু কাপড় ?
শিশুর হাসি ?
কথাও কোন
রেষারেষি -
থাকবে না আর -
সবাই তখন
সাগর হবে ,
সব কালোকে
ভাসিয়ে দিয়ে
আলোর স্রোতে
পাল তুলবে -
দেবে আমায়
নতুন বছর?
একটা জীবন
আলোর মতন?

বৈশাখ

দুশ্চিন্তার কপালে একরাশ বলিরেখার জন্ম দিলে নববর্ষ
হাজার কৃষ্ণচূড়ায়ও ম্লান হবে না।

আশ্চর্য ব্যথায় বয়ে যাচ্ছো নদী
ঢেউ হয়ে আবার এসো
আজ সন্ধ্যায় তোমাকে ছুঁয়ে জ্বলবে মোমবাতি, শোক
দৃপ্ত প্রত্যয়ে জলবিন্দু ভেজাও ভালোবাসা।

চৈত্রের শেষ রাত পুড়েছে দুর্গন্ধে, এখনো বেহুঁশ ভোর
ভয়ের বাতাসে এলে বোশেখ
স্নেহময়ী শ্যামল বাংলায় ! 


ডিলিরিয়ম

থা নয়, সংকেত রেখেছো দরজায়
দরজা আটপৌরে, দরজা সাংকেতিক
               যেভাবে নতুন পথ ভাষা বদলে চলে
               তোমার চোখের ভাষা সেভাবে বদলায়

কোথাও আকাশ ভাঙছে, ভেঙে যাচ্ছে সিদ্ধান্ত অটল
এ কেমন ভ্রান্তি..
বিরহের ভেতরও এত সুললিত গান
কাচের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিচ্ছে যখনতখন ইচ্ছেপুতুল

ভেসে যাই, ফিরে আসি, পুড়ি যে কতবার
সমস্ত ধ্বংসের মুখে নতজানু হই,
তবু চোখের ভাষা অথবা সংকেত
আজও কিছু বুঝি না তোমার।


কবিও ঈশ্বর
কোরান, বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক -
আয়াতে আয়াতে ঈশ্বরের নিবাস;
অবিনশ্বরের দিব্য চোখ খুঁজে পায়
ধার্মিক হৃদয়, হৃদয়ের আকুলতা
অত:পর ভক্ত ক্বলবে আসীন ঈশ্বর জায়নামাজ পবিত্রতায় ।

কবিও ঈশ্বর; যতই সীমিত হোক সৃষ্টির শিল্পীত নীলিমা,
কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে কবি মৈথুনরত হংসবলাকা
কবিতার মায়াবী চোখে কবি দ্যাখে,
পাঠক বোধে সাড়া জাগায় কবিতার নির্যাস
উৎফুল্ল কবি পাঠক হৃদয়ে আসীন আত্মার আত্মীয়তায় ।


অচলা

মাটি থেকে উঠে এসে
মাটিতেই রয়েছি দাঁড়িয়ে
কে কবে পেরেছে যেতে
মৃত্তিকার সীমানা ছাড়িয়ে!
যতই আকাশে উড়ি
মাটিতেই এসেছি তো নেমে
মাটিতে হেঁটেছি যদি
মাটিতেই মিটে গেছি থেমে।
যতই থাকিনে কেন
আদিগন্ত দুহাত বাড়িয়ে
যদি যেতে চাও যাবে
-আমাকে মাটিতে মাড়িয়ে।
একটিই প্রশ্ন শুধু যদি যেতো বলা
মৃত্তিকার মত কেন হলে না অচলা?



আলোচক – সৌমিত্র চক্রবর্তী
          
      পায়ের তলায় সরষে নিয়ে যারা কবিতা লিখে চলেছেন তাদের মধ্যে আগুয়ান সারিতেই আছেন সুবীর সরকার। বাড়ীর মধ্যে আরামচেয়ারে বসে কল্পলোকের প্রেম সৃষ্টি নয়। হাটে মাঠে, গ্রামে গঞ্জে, বনে জঙ্গলে এ দেশ ও দেশ একাকার করা এই পদচারণায় বারবার উঠে আসে প্রান্তিক মানুষেরা। ফিরে ফিরে আসে মাটি, ধূলো, জঙ্গল, পাখ পাখালির হৃদবৃত্তান্ত। কি কবিতা, কি গদ্যে সুবীরের এই বিচরণ অবিরাম বহাল। সুবীরের সাম্প্রতিকতম বই, প্রকাশিত দ্বিতীয় গদ্যগ্রন্থ এপিটাফএর প্রতি ছত্রে, প্রত্যেক ভাবনাকাশে এই চলন দেখা যায়।
 “হাটগঞ্জ কোরাসএবং এপিটাফএই দুই স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে মূল গ্রন্থখানি। হাটগঞ্জকোরাস আবার পনের অধ্যায়ে ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু সব পথ শেষে মিলেছে রোমে। একটি চরিত্র বারবার ঘুরেফিরে এসেছে-সেহয়ত এই সেহল লেখক নিজেই। লেখকের অবচেতনমন কখন যেন পার্থিব কায়া থেকে নেমে এসেছে প্রান্তরে, আঞ্চলিকতায়। ফেলে রাখা ছবিদের দিয়েছে বিশ্বময়তা। ঐ সন্যাসী ঠাকুর, যিনি উড়ে বেড়ান প্রতি রাতে পিঠে ডানা গুঁজে, টহল দেন রাজ্যপাট। মানুষ ক্রমশ মিথে পরিণত হয়ে বন্দনাগানে রাখেন পায়ের ছাপ। সমগ্র জঙ্গলকে, জঙ্গলের পশু, পাখি, পাখির ডাক, সবুজ শষ্যক্ষেত, জলজলার বাতাসকে পিঠে বয়ে স্বপ্নের পথ ক্রমান্বয়ে অতিক্রম করতে থাকে ওদলাবাড়ীর হাতি। কিম্বা যে মানুষটি তার বর্মণত্ব লুকিয়ে ফেলে হেঁটে যেতে যেতে কখনো হয়ে যায় হালুয়া, জালুয়া, হাটুয়া কিম্বা নদীরাম গীদালই, সব চরে বেড়ায় কবিসত্ত্বাকে পূর্ণ ইচ্ছায় বহন করে।
 লেখা হাঁটে। লেখক হাঁটেন, হাঁটেন পাঠকেরা। জীবনের সমস্ত আচ্ছন্নতাকে যেন একধরনের ট্রমার ভেতর দেখা যায়। হাঁটাইয়ের প্রান্তে নকশা তোলে রংপুরিয়া-দিনাজপুরিয়া সঙ্গীতের মিঠে সুর। এত নির্মিতি বিনির্মিতির মধ্যে নিঃশব্দ পদচারণে চলে যায় বিস্মরণফেরত নিঃসঙ্গ বাঘ। মানবজমিনের সন্ধান করতে করতে সে দেশকালের সীমা অতিক্রম করে লালজী রাজার নাচের মুদ্রায়, মরুচমতীর দুঃখ লুকানো নৃত্যবিভঙ্গে পৃথিবীর রূপকেই বিশালকায় বাদুরের ডানার ছায়ায় ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়তে থাকে। অনন্ত সৌন্দর্যের কথায় সে তার শরীর জোড়া এক গানই যেন রচিত করতে করতে দার্শনিকতার দর্শনের দিকেই যাত্রা করে। নাব্যতা হারানো নদীখাতে সে আবিষ্কার করতে চায় জলঘুঙুরা। মানুষ তার ব্যাক্তিগত কে ছাপিয়ে সমষ্টিগত তে পৌঁছে হয়ে ওঠে লোকমানুষ। দূর কোন পৃথিবী থেকে ঝড়বৃষ্টির লৌকিকতা থেকেই বাজতে থাকে তান্ত্রিক বাজনা ডারিয়াঘরত। হাটুয়া থেকে সন্যাসীঠাকুর হয়ে ওঠা এই অপার্থিব সেহাটগঞ্জকোরাসে তাল মিলিয়ে নিজেকে পরিশ্রুত করে ফিরে আসবে কোন আলোর জাফরি কাটা অত্যাশ্চর্য কোন পার্থিবতায়।

এপিটাফভাগ হয়েছে মাত্র পাঁচটি নামহীন অধ্যায়ে। এখানেও সেই চলন অব্যাহত। গ্রাম, গ্রামের বাজার, নদী, শ্যাওড়া গাছ, খয়েরকুল জংগল, বাঁশবাগান। নির্জনতা আর শুন্যতাবাহী নদীঘেরা জনপদ থেকে উঠে আসে জাদুবিশ্বাস, সংস্কারগাথা। একে একে পেরিয়ে যায় নামহীন সময়। উষ্ণতার অবসানে শীতের প্রবেশ। অন্ধকার ও আলোয় পূর্ণ হতে হতে আমরাও এগিয়ে চলি দুহাতের মুঠোয় পুজোর শিউলিফুল কুড়িয়ে নিয়ে মদ্যপানের দোলাচল এবং দোলাচল অবসানের দিকে। কাহিনী সমূহে ফিরে ফিরে আসে লোকগান, লোকবাজনা এবং অবশ্যই নারী। একা আর নিজস্ব চোখে সেই দেখায় ভালবাসায় ভেসে যেতে যেতে নারীর কষ্ট ও একক নিঃশব্দ লড়াই টোকা হয়ে যায় ডাইরীর পাতায়। একসময় সেই মানসচরী দুর্লভ অবসরে নিজস্ব স্থায়ী আসন পাতে। এভাবেই বাঁশের সাঁকো সঙ্গীসহ অথচ সঙ্গীহীন পেরতে পেরতে সেই ছায়াময় প্রান্তর ছুঁয়ে ফেলি আমরাও।
          অসাধারণ মায়াময় লেখনীতে একনিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মত বই এপিটাফ অসাধারণ মুন্সীয়ানায় প্রচ্ছদ এঁকেছেন আর এক কবি মাসুদুর রহমান। ঝকঝকে অফসেটে ছাপা এবং নজরকাড়া পাতা, অলংকরণের বিনিময়ের এই সুখপাঠ্য গ্রন্থটির প্রকাশক অভিযান পাবলিশার্স। মূল্য ষাট টাকা ।

About