এই সংখ্যায় ১৫টি কবিতা । লিখেছেন – অলক বিশ্বাস, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, রহমান হেনরী, হিমেল হাসান বৈরাগী, সাঈদা মিমি, ভগীরথ মাইতি, আবদুল্লাহ জামিল, জিনৎ জাহান খান, হরপ্রসাদ রায়, ঊষসী ভট্টাচার্য, রাহুল রায়চৌধুরী, চন্দন ঘোষ, কাজরী তিথি জামান, অরুণ সেনগুপ্ত, শিবলী সাহেদ এবং কাব্য-গ্রন্থ আলোচনা অলক বিশ্বাস’এর ‘মন খারাপের গল্প’ ।
কাব্য-গ্রন্থ আলোচনা

মন খারাপের গল্প – অলক বিশ্বাস

আলোচক – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

কবি অলক বিশ্বাসের নতুন কাব্য-সংকলনের নাম ‘মন খারাপের গল্প’ । প্রকাশিত হয় এবছরের কলকাতা বইমেলায়, প্রকাশক বাংলার মুখ প্রকাশন । 

কবি অলক বিশ্বাস এই সময়ের এক প্রতিষ্ঠিত কবি, নানান পত্র-পত্রিকায় ও অন্তর্জাল পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়  । ‘মন খারাপের গল্প’ তাঁর পঞ্চম কাব্য-গ্রন্থ । প্রথম কাব্য সংকলন ‘জলবিছানা’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৭এ । অলকের আগের কাব্য-গ্রন্থ ‘ঈশ্বরবাড়ি’ প্রকাশিত হয়েছিল জানুয়ারি ২০১২তে , সুতরাং ধরে নিতে পারি আলোচ্য গ্রন্থের কবিতাগুলির রচনাকাল ২০১২তেই ।

ছত্রিশটি কবিতা নিয়ে অলকের এই কবিতা সংকলন। আবার সাতচল্লিশটি কবিতার সংকলনও বলতে পারি । শুরুতেই – ‘মন খারাপের গল্প’ শিরোনামে যে দীর্ঘ কবিতাটি রেখেছেন, সেটি ১২টি খন্ড কবিতার মালা । ‘মন খারাপের গল্প’ নামটি বেশ ইঙ্গিতবাহী , এই নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে বিষন্নতা , সংশয়, ক্লান্তি । আর এখান থেকেই পাঠক কবির বিষন্নতার, ক্লান্তির সূত্র সন্ধান করবেন ।

‘মন খারাপের গল্প’ নামে দীর্ঘ কবিতাটি অথবা তাঁর শরীরে গাঁথা ১২টি খন্ড কবিতার পংক্তিমালায়, কবির প্রচ্ছন্ন বিষাদ বোধ - “চাদের কাছে বেদনার কথা বলা বৃথা, তবুও - / আঁধারে লুকোলে সে কেন যে নিঃসঙ্গ হই খুঁজে খুঁজে মরি অতলান্ত আকাশে/কেন গো সই” ? ... সারাটা দিনের হিসেবের খাতা দেখি প্রত্যহ / ঝুড়ি ঝুড়ি মাখা অবসাদ, দিনশেষে ওড়ে বিশ্বময়” । তবুও এই কবিতাটি বা সংকলিত কবিতাগুলি কখনোই একান্ত নিজস্ব ‘বিষাদ গাথা’ হয়ে ওঠেনি । বরং “যে বৃষ্টি ভিজিয়েছিল, এতদিন পরেও থেকে গেছি ঋণী তার কাছে / সে কারণেই এই গল্প বলা । একা একা পথ চলা”। সেই পথেই কবি দেখেন “নতুন ধানের গন্ধে বাঁধ ভাঙা হাওয়া লেখে নতুন স্বরবর্ণ”...কবি দেখেন “রাজপথে ঘুম ভাঙা ইতিহাস । সমবেত মানুষেরা হাসছে-কাঁদছে-গাইছে হৃদয়ের কলি” । তাহলে ‘মন খারাপের গল্প’কে কবির একান্ত ব্যক্তিক বিষাদগাথা বলি কি করে !

সংকলনটিতে ‘গল্পকথা’ শিরোনামে নটি বাক্যের অতি ক্ষুদ্র ভুমিকায় কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত জানিয়েছেন “মন খারাপের গল্প’র মূল ভাবনা প্রেম । এই প্রেমের সঙ্গে কবি কোথাও কোথাও জারিত করেছেন প্রকৃতিকে , লিপ্সাকে এবং গোপন পাপকেও” । কবিতাগুলির মূল ভাবনা প্রেম অবশ্যই, তা কিন্তু ব্যক্তিক প্রেম নয় বরং প্রকৃতির রহস্যের মাঝে আমাদের পারিপার্শ্ব ও চলমান সময়ের অনুষঙ্গে মহত্তর জীবনের যে বোধ, ব্যঞ্জনাময় পংক্তিমালায় উজাড় করা প্রেম সেই বোধ’এর জন্যেও । আমি এভাবেই বুঝেছি সংকলিত কবিতাগুলিকে । “বিষাদ যেটুকু নিজেকে ভেঙে / সুচতুর গিলেছে দেহতাপ,...”(‘চাদর’)। তবুও কবির প্রত্যয়ী উচ্চারণ “যে মিছিলে হেঁটে হেঁটে হয়েছি বড়ো / অন্ধকার সমুদ্র পার করে আমাকে দিয়েছে রদ্দুর / সেই গঙ্গায় রেখেছি বিশ্বাস” (‘শঙ্খচূড়’) । সুতরাং ‘প্রকৃতি’ , ‘লিপ্সা’ বা ‘গোপন পাপ’ সংকলিত কবিতাগুলির ভাব বীজ নয় । বরং বইটির শেষ প্রচ্ছদ-লিপির বয়ানটিকেই মান্যতা দেব,' যা থেকে জানতে পারি   “কুয়াশা রোদ্দুর ভেঙে পলে পলে স্বপ্নের সেতু ছোঁয়া । এই ভাবে সকাল-দুপুর সন্ধ্যায় নিজেকে জড়ানো । দুচোখের ছবি ছবি নৈঃশব্দ চৌচির করে । কবি থাকেন মানুষের কাছাকাছি”। এখানেই যেমন কবির মন খারাপের উপকরণ , এখানেই কবির অন্ধকার ভেঙে দেখা আলোর বীজ । কবি বলেন “অন্ধকার ভেঙে দেখি যাকে দিয়েছি সব / হয়েছে আলোর বীজ, আমি কৌরব” (‘কৌরব’) । আমি এ ভাবেই কবিতাগুলিকে বুঝতে চেয়েছি ।

বস্তুত আমরা কেউই ভালো নেই ।  না কি ভালো আছি ? এই রকম ভালো থাকা -  প্রয়াত পূর্নেন্দু পত্রীর পংক্তিতে যেমন, “চারকোণা সংসারের চতুর্দিকে গ্রীল এঁটে খুশী ...যে বাতাসে কাশের কথ্বক / এয়ারকুলারে সেই বাতাসের বাসী গন্ধ পেয়ে বড় খুশী” । আমাদের বিষণ্ণতা লেখেন অলক একই রকম ভাবে । “ ঘুমে আচ্ছন্ন মানুষ জানালায় হাওয়া খায় বটে / দক্ষিণের সেই পথে, ... কালবৈশাখী আসে না এখানে” । (‘অর্ধেক তুমি’) । সংবেদনশীল কবি আমাদের যাপনের বিষাদ গাথা লিখেছেন (না কি এঁকেছেন ?)

পাঠক কবিতার কাছে আসেন শব্দ সুষমার নিবিড় আকর্ষণে । আলোচ্য সংকলনটিতে পাঠক বারবার ফিরে যেতে চাইবেন কবিতার শরীরে ধরা নিবিড় অর্থময় অনেক পংক্তির কাছে, ‘ডুবু ডুবু সূর্য ছুঁয়ে যে মানুষ হারিয়েছে সাগর গভীরে’ (পয়লা বৈশাখ), ‘ভালোবাসা কাছে এলে সমুদ্র দূরে চলে যায়’(ভালোবাসা কাছে এলে), ‘যে শব্দেরা মিথ্যা কথা বলে / ধর্মকথা অকারণে/রদ্দুর ঠেলে দেয় দূরে’ (ঘুড়ি),’জোতদার সাজায় তোমাকে পঁচিশে বৈশাখ’ (পঁচিশে বৈশাখ), এ গান সাহস লেখে, হৃদয়ের পতাকা ওড়ায়’মে মাসের গান) । এরকম অনেক  ব্যঞ্জনাময় পংক্তি্র গভীরে ডুব দেবেন পাঠক ।

‘মন খারাপের গল্প’ আমাদের একলা যাপনের বিষাদগাথা এবং একই সঙ্গে বিষন্নতা সংশয়, ক্লান্তি কে অতিক্রম করারও কাব্যগাথা । আমি একাত্ম হই কবির ভাষায় – “মৃত্তিকা দিয়েছে জল, মহাভারতের ভাঁজে ভাঁজে ফসিল কথা/এত ফুল এত ফল হৃদয় তরঙ্গে / স্পর্ধিত আমার পাহাড়” (‘স্বদেশ’) ।


বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন মেঘ অদিতি । মেঘ অদিতি অত্যন্ত দক্ষ ও কুশলী শিল্পী তাঁর আঁকা উজ্বল প্রচ্ছদ বইটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে । পরিপাটি মুদ্রনে বইটির মূল্য ৬৫টাকা ।

প্রথম কবিতা

এসো, এসো ঝর্ণাতলায় করি স্নান

এমন সুগন্ধবেলা ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে

সাঁতারে ছোটাব জল

নদী হয়ে এসো নীল ...

তাকে রাখা ইচ্ছেকে বলো

ওখানে ফুটুক ফুল এ সময়

আমাদের চারপাশ সুশোভিত

মৌমাছি আয় আয় ...

সাজানো সংসারে পূর্ণ চাঁদের আলো

দুচোখে সমুদ্রে রাত জাগা রাত পোড়ে

সোহাগ নৌকা হারাবে হারাবে উদবেল

ঠোটে রেখে যা চুমু আজ অভিসারে ...

খুলে দাও বাঁশরী তুলোর বালিশ

বিষণ্ণ ভিজুক বৃষ্টিতে,

প্লাবন নদীর জলে

আমার প্রথম কবিতা ... ।
অগ্রগতির ত্রিশ বছর

আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি

আমার মেজদা ঢুলে ঢুলে পড়ে যেত

‘ভারত এক প্রগতিশীল দেশ’

পিচবোর্ডে বাঁধানো পুরনো নোট-বই

পঁচিশ বছর আগে ঐ বই পড়েই

আমার বড়-কাকু স্নাতক হয়েছিলেন



স্কুলের চৌকাঠ পেরিয়ে একদিন আমিও

কলেজের চৌহদ্দিতে পৌঁছে গেলাম

সেই পৃষ্ঠা হলুদ হয়ে যাওয়া পুরনো নোট-বই খুলে

আমাকেও পড়তে হল

‘ভারত এক প্রগতিশীল দেশ’ ......



রাজাকে বৃক্ষের কথা বলো

রোজ দিনই কিছু কিছু পাতা খোয়া যায়
ওগুলো ফেরত চাই তার
ফলে, এই উন্মাতাল শাখার দুলুনী

পরিণামে
আরও বেশি পাতা খুইয়ে ফেলা

রাজাকে শক্তির কথা বলো

ক্ষমতা স্বয়ং এক শূন্যতার নাম
প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে থাকে...
আমি চাই...

আমি চাই, আমার মা একটি কবিতা লিখুক
কুসুমকুমারী দাস কিংবা সুফিয়া কামালের মত করে নয় ।
একদম নিজের মত করে ।
যেভাবে তিনি বোঝেন- একটি তরকারীতে কতটুকু নুনের প্রয়োজন ।
তেল এবং পেঁয়াজের মিশ্রণে কিভাবে একটি অমৃত পরিবেশন করতে হয় ।
তোষকের নিচে জমানো টাকায় বৃদ্ধ শ্বশুরের ঔষধের জোগাড় তিনিই করেন
তিনি জানেন সংসারে বৃদ্ধ কবিতাগুলো কত অসহায় !
বেহিসেবি ছোট ছেলের বৈরাগীত্বে বড্ড বেশী আপত্তি তার ।
দুর্মূল্যের বাজারে দূর্বোধ্য কবিতার ব্যাঞ্জনা তিনি বুঝেন ।


আমি চাই এমনি একটি কবিতা আমার মা লিখুক ।
অষ্টাদশী বালিকার সংসারে অভিষেক,
তারপর দুইযুগের মধ্যবিত্ত সংসারে-
অসঙ্খ্য কবিতার বেড়ে উঠা ও ঝরে পড়ার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী তিনি ।


আমি চাই এমনি একটি কবিতা আমার মা লিখুক ।
ষ্টীলের আলমারী খুললেই ধেয়ে আসে ন্যাপথলীন বায়ূ
খুব যতনে আগলে রাখা কচুয়া রঙের শাড়ি, বাবার পাঞ্জাবী,
পৈতৃকভাবে পাওয়া কয়েককাঠা জমির ধুলাবৃত দলীল ।
আমি ঠিক এমনি কিছু কবিতার কথা বলছি ।

আমি চাই এমনি একটি কবিতা আমার মা লিখুক ।
মাস শেষে বাড়িভাড়া, কারেন্টবিল, মাস্টারের বেতন,
সমস্তকিছুর টানটান হিসেব তিনি যেভাবে করেন
ঠিক সেভাবেই তিনি একটি কবিতার হিসেব কষবেন ।
আমি চাই এমনি একটি কবিতা আমার মা লিখুক ।
বৈকল্যের দিনে

বৈকল্যের দিনে ফিরে যেতে

ইচ্ছে করে না, আল্লাহর

কিরা লাগে, আমারে ফালাইয়া

যাও মৃত্যুর ময়দানে, মন

রোগে ঝাঁঝরা দেহ, জ্বালাও

ঘিয়ের চিতা, একলার কবর..

ঘুমালেই কু স্বপ্ন আসে,

নুলো বুড়ি হেসে বলে,

সব জানি ছেনালী কেত্তন!

সম্মোহন 

প্রতীক্ষায় বসে থাকা কিছু রাতপাখি

রাত্রি ঘুমুতে গেলে মেলে দেয় ডানা চুপিসাড়ে-

চাঁদতিথি না হলেও দূরের পাহাড়ে

জেগে ওঠে আলো ধীরে ধীরে

এ সময় অন্ধকার রাতের শরীরে ৷

আলো ! নাকি সেও এক অন্য অন্ধকার !

পথ চেয়ে বসে থাকা তীব্র প্রতীক্ষার কোনো সম্মোহন !

অথবা সে অন্য কোনো মিথ্যে স্বপ্নে ঘোর নিয়ে আসে !

রাতপাখি- ঘুম নেই চোখে ইচ্ছের উষ্ণতা

দাউ দাউ পালকে পালকে গা পুড়ে যায়-

আলেয়ার আলো নিয়ে

মরা চাঁদ দূরে ওই পাহাড়ে তাকায় ৷





এভাবেই বিনষ্ট


এভাবেই বিনষ্ট সব কিছুর

বিফলতায় পর্যবসিত সুউদ্যোগ

শান্তিময় বসতির ভেতর সৃজিত কুরুক্ষেত্র

দলাদলি, সাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়ায়

হানাহানি বিভাজিত গোষ্ঠিতে গোষ্ঠিতে



এভাবেই উপেক্ষিত অনিন্দ সুন্দর

আর দলগত স্তুতিবাক্যেমহীয়ান অসুন্দর অশ্লীলতা

আর এভাবে নিমন্ত্রিতজনের অপমান

এভাবেই বিনষ্ট সব কিছুর

পাখি ও পাপড়িরা 

ঝুলে আছে মেঘগুচ্ছ, বিরহতুমুল রাতে।

শূন্যমগ্ন আকাশেও অতীত বিষুবরেখা।

কোলাহল আর ভীড় ঠেলে,

চেনামুখ, অর্থহীন স্বপ্ন লুট করে,

গোপন সে, বর্তমান, বেহাগপ্রণয়ী এক পাখি,

উড়ে আসে ঠোঁটে, মেলে ধরে

কেঁপে ওঠা ঐ দুটি পাপড়ি।

স্পর্ধাহীন সে, সুন্দর। পাশাপাশি হাঁটে,

নির্জনের হাত ধরে।





মনে হয় ছুঁয়ে দেই ...


বৃষ্টি তুমি অকৃত্রিম ভালবাসা

অবাধ ঈপ্সিত এই শ্রাবণ সন্ধ্যায়

ইচ্ছে চোখে অনায়াস বিমূর্ত আবহে
নিশুতি খেয়াল কোন হেম বেহাগের ।

সন্ধ্যের মাল্লার সেতো পায়ে পায়ে পরিচিত ষোড়শী আবেশ
নিবিষ্ট নক্ষত্র ঘ্রাণে সমাহিত প্রতীক্ষিত চোখ ।
কেউ কি বলেছে আজ গভীর রাত্রির কাছে ?

বৃষ্টি তুমি প্রিয় কোন পরিচিত নাম
সন্ধ্যের অমোঘ নেশা, রাত্রির সংরাগে ।

মনে হয় ছুঁয়ে দেই
ভেঙে দেই সৌজন্য প্রাচীর ।
শ্রাবণ সন্ধ্যা 


হাত ধরে নদী পার,

এক ঘরে পাশাপাশি রাত

ব্রিজের ধারের ছোট্ট ঘর,

মুর্শিদাবাদের এক তলা ঘরে

অসময়ের বৈঠকি আড্ডা,

বিপিনদা’র চারমিনার,

আর

তোমার বেলা বারোটার ছ’ কাপ চা-

স্মৃতির রোদ্দুর আর কিছু

রোদ্দুরের স্মৃতি ...

অনবরত বৃষ্টি মনের আকাশ ঘিরে মিতা,

স্বপ্নের কার্নিশে তুমি

নামহীন গন্ত্যব্যে হেঁটে গেছ।

আমি বারবার পিছু ডেকেও রাস্তা পাইনি,

কোন পথে মেলাবো সাঁকো

বুঝতে পারিনা সত্তরের রুগ্ন চোখে,

একটা দুটো করে ডিসেম্বর কাটে

ব্যালকনির স্মৃতিতে,

মার্বেল ফ্ল্যাটে শহুরে আদরে আছি,

তুমি হাত মেলে ধরো জোনাকির

তবু পাখা পাইনি আমি,

অনন্তের পথে হেঁটে চলেছ তুমি,

আমি বারবার ডেকেছি,

পথ বলতে বাঁশের সাঁকো যখন,

গন্তব্য তখন ধোঁয়ায় মিলিয়ে,

খেলার বয়স পেরিয়ে আজ,

‘খেলা ভাঙ্গার খেলায়’

পেরবো পথ, পেরবো সাঁকো,

আজ আমি পেরিয়ে যাব এক দৌড়ে স্মৃতির গলি,

হাজার ডাকেও সাড়া দেবনা আজ

মিতা, স্বপ্নের কেরোসিন নাম নিয়ে ফুরিয়েছে বোতলে

ঘুমোও সুখে,

চশমা তো আর স্বপ্ন দেখেনা

ছানিতে ঘিরেছে চোখ,

মন খারাপের দিস্তা তোমার ভেসে নিয়ে চলে অলকানন্দা

তোমার প্রায় হলদে সাড়ি, চিলতে সিঁদুর

আর পাঁজর জুড়ে ফুটো,

চিতাতে জ্বলেছ শরীর নিয়ে,

আকাশ নিয়ে লুটিয়েছ ফের এ বুকে।।






নষ্ট প্রেম 

তোমার গহীনে হেঁটেছি

পরশু সন্ধ্যা ঝিনুকে ভরেছি কুড়িয়ে বালির স্বপ্ন

ভোরের আলোকে দণ্ড দিয়েছ

ব্যঙ্গে পাণ্ডুর হয়ে ফিরেছে রক্তবর্ণ

ধূর্জটি জানে আমার স্বপ্নভঙ্গ ধ্বনিত মুকুলে

শিশিরের কানাকানি প্রপঞ্চে

তুমি বিষিয়েছ প্রত্যয় নির্মূল আজি আমার প্রেমিক ধর্ম



প্রস্তুতি

তার জন্য কীভাবে প্রস্তুত হব বল

হাতের মুঠোয় প্রিয় হাত নিয়ে বলব, জল মোছো, এইবার আসি

নাকি শত্তুরকে বলব, দোস্ত, জ্বালিয়েছো তো অনেক

আর কোনও রাগ নেই, হয়ত আবার দেখা হবে;

আস্তিন থেকে এইবার ছুরিটা সরাও

দেখ, আর অন্য কোনও রাস্তা ছিল কিনা


কীভাবে, কীভাবে তৈরি হব বল

কষের রক্ত মুছে নিয়ে আবার দাঁড়াবো সোজা হয়ে?

লাল শালু হাতে নিয়ে

অনেক কৌশল হল, জেনো তবু

তার শিং কিছুতে যাবে না ফাঁকি দেওয়া


নতজানু হতে হতে রক্তাক্ত হয়েছি

প্রস্তুতির ফুরসৎ নেই আর

এক বুক নিশ্বাস নেবার সময় হয়েছে

কীভাবে যে মুখোমুখি হব, সেই প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর দাঁড়িয়ে রয়েছে ।


                               
                                   


এখানেই..... 

এখানে রেখেছিলাম আমাকে, এখানেই কিছু রঙ একান্ত ।

এখানেই গোপন ভুল, এবং ডুবন্ত ইচ্ছে বুকের,

এখানেই খুঁজে যাই প্রতি মুহূর্ত, আমারই ।

আলো জ্বেলে তুমি পেতে পারো টুকরো আমায় ।

ভালোবাসো যদি, আবারও মেঘ হবো সাতরঙে,

এখানেই প্রতিবার সাত রঙ বরষায় ।
মনের কথা

পেলব মাখাতে পারিনা পালক রাখি

পাতাবাহার না থাক ফুলদানিও ।

মেঘলা আকাশ

মেঘলা বরষা নেই

গভীর বিষাদে মনন অঙ্কণ কই ?

জানালা আকাশ ওই যে

যতটুকু খোলা নয়নে রেখেছি

মনন সে প্রত্যাশা ।

আবেগে ভেসেছি কখনো

রেখেছি যত ভুলেছি

সব কিছু ভুলেছি ক্ষত ।

মেয়েটি

মেয়েটি ঢেউয়ের কাছে থাকে
ঢেউয়ের বিলাসিতা নিয়ে গল্প লেখে ,
রাতে বিয়ার খায় ।
আগুন জ্বালাতে জানে না মেয়েটি
আঁধারে হাত কাঁপে শুধু
হাত ফসকে লাইটার প'ড়ে যায়।
সুতরাং তোমাকে আসতেই হলো
'দিবারাত্রির কাব্য ' !

আচমকা হাত ধরলে
শেখালে আগুনের সমীকরণ
দেখালে কিভাবে ভোর আসে প্রার্থনা নিয়ে ।
আহা! ভোর মানেই তো জাফরানি ঘুম ...

শরীরী ব্যবধানে ঢেউয়ের দূরত্ব বাড়ছে
দূরত্ব নিজেই এখন সওয়ার হয়েছে নক্ষত্র-পিঠে
চাঁদের আওয়াজ মৃদু হয়ে আসছে
মেয়েটি দিয়াশলাই জ্বালাতে শিখে গেলো
এই সংখ্যায় ১৯টি কবিতা লিখেছেন - অয়ন দাশগুপ্ত,সুজন ভট্টাচার্য,সরদার ফারুক, মোহম্মদ আনওয়ারুল কবীর,অরিন্দম চন্দ্রও, মোনালিশা চট্টোপাধ্যায়, অনুপম দাশশর্মা, ফারহানা খানম, বেবী সাউ, অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী। মাহবুব অনিন্দ্য, বিনু মাহবুবা, সোনালী বেগম, ইন্দ্রাণী সরকার। বাদল রায়, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, শশাঙ্কশেখর পাল ।
এভাবেই অনন্যতা

যারা যারা পলায়ন মনে করে, লন্ঠন উঁচিয়ে

আমায় খুঁজতে যায়নি জ্যোৎস্নায় -

যারা যারা আমার ব-খবর চলে যাওয়াগুলো ভেবেছিলো

যেন নিছকই এক অভিযান... তারা কি কখনো কেউ নক্ষত্রের সকাশে

এমনটা হীন করে নিজেদের দ্যাখেনি কোনোদিন... ?


আর আমিও নিঃস্ব ঋণ... তাদের কীই বা বলতে পারি আজ - !


তবু এসমস্ত খবর আমি কিছুই রাখিনি -

শুধু শূন্যময় ছেড়ে দিতে দিতে বুঝে গেছি -

এভাবেই অনন্যতা তৃতীয় বিস্ময় নিয়ে

অপলক চলে যেতে পারে -

যেমনটা জীর্ণ জরা রাতের আদরে

ফেলে যাওয়া শিকারও পেয়ে যেতে পারে

দু' দশটা মর্মহীন... সাফল্য বিভ্রম - —

এপিটাফ



যদি বল, চলে যেতে পারি,অনায়াসে নয়, শুধু এক প্রমাণেয় দায়ে
সবকিছু রেখে দিয়ে তোমাদের ঘরে।
যত আছে অক্ষর – অধুনা ও প্রাচীন,
অথবা আমৃত্যু পৃথিবীর সমস্ত শিশু –
যারা নিজেরাই বেছে নেয় জীবনের কোল –
তাদেরই স্বচ্ছন্দ থাক ইঙ্গিতে নদী।
ঘোলাটে ভোরের আলোয়
যে হাঁসেরা পায় নি খুঁজে দীঘির সরণ,
তবুও তাদের বুকে জীবনের বাঁচা
সোচ্চারে কতকিছু চাওয়া-পাওয়া নিয়ে।
ঘুম ভেঙে গেলে মানুষ আদিম,
শুধুই রসদ খোঁজে পাতাদের ভিড়ে।
তারপরে, যেখানে লড়াই শেষ
সামান্য কুসুম ফেরে ঘুমের সন্ধানে।
কোন ঘুম প্রাপ্ত নয় ক্লেশহীনভাবে,
যেহেতু থাকে না গ্লানির কোন বিকল্প কথা;
পৃথিবীর সকল শ্রম একবিন্দু হয়ে
একমাত্র এনে দিতে পারে ঘুমের ঠিকানা।

অ্যালবাম


ধৃত অপরাধীদের মতো নিচে বসে আছো

গ্রুপফটো ,সাদাকালো ,উনিশশো সাতাত্তর সাল

বিশিষ্ট জনেরা সব পেছনে দাঁড়ানো

টাই আর চশমায় বোঝা যায়


বাঁ থেকে চতুর্থ ,মাংকি ক্যাপ

হ্যাঁ উনিই ,কণিকার ছোটমামা

একবার সবার সামনে...


চিঠিটা কী করে তাঁর হাতে পড়েছিলো?

জিন কোডে থেমে যাবে কেরামুন, কাতেবিন

ধমনীতে প্রবহমান পূর্বপুরুষের শোণিত -
পূর্বপুরুষ মানে পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ,
তারো পিতা, তারো পিতা, তারো পিতা ... বাবা আদম তক
জিন মানচিত্রে মননের মূলসূত্র -
ইডেন গার্ডেনে আদি পিতা-মাতার অদম্য কৌতুহল
হেরে যায় ঈশ্বরের নিষেধের তর্জনী।

অত:পর স্বর্গচ্যুত অভিশপ্ত মানব আমি পৃথিবীর পথিক
জিন কোডে কেরামুন, কাতেবিন ব্যস্ত নিয়ত
ধারাবাহিক লিখে চলে পাপ-পূণ্যের খেরোখাতা।

ধমনীতে প্রবহমান পূর্বপুরুষের শোণিত সাক্ষী-
তুচ্ছ কবি আমি পৃথিবীর পথে
মননের মূলসূত্রে অদম্য কৌতুহল
চর্তুমাত্রিক বিশ্বেই জেনে যাব আমি
নদী, নারী আর সময়ের গুঢ়তত্ত্ব;
অত:পর একদিন সসীম চেতনায় ফ্রেমবন্দী অসীম ঈশ্বর তুমি!

[ কেরামুন, কাতেবিন = হিন্দু পুরাণে যেমন চিত্রগুপ্ত]

মলাটে কবি .....

কত রাত ঝরে যায় আগামী ভোরের দিকে
যদি আসে আচমকা কোকিলের শিস
বহুগামী ইচ্ছেরা ছাড়বে কি অভ্যেস
জিজ্ঞেস করে যদি 'কেমন আছিস' ?

এ্যাই দ্যাখ, হাসি সব টগবগে ঘোড়া যেন
কোথায় খুঁজে পেলি নোনতার স্বাদ
অক্ষর শুঁকে দ্যাখ রজনীগন্ধা ঠিক
ঢেকে দিয়ে হয়েছে প্রতিপদ চাঁদ।

মুঠোভরা আবেগের যত্নশিখা কি আর
প্রদোষের হাত ধরে পারে ঝাঁকাতে
ভীড় করে মেঘেরা দুদ্দার দু'চোখে
অবাধ্য চেতনার খাঁচা নাড়াতে।
কত রাত সরে যায় বেদখল কবিতায়
কত কবি ছায়াময় মলাটে..!


ভোর

ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে এখনও জেগে আছি-

এখনও-এখনও ঘুলঘুলি দিয়ে

আলো আসেনি...

নাইট্রোসান-ভাঙ্গা ঘুম থেকে জেগে

এখনও-এখনও ঠায় বসে আছি-

সুপবন বয়ে আনা আলোর অপেক্ষায়.........।

আবোল তাবোল 

দেখেছ ঝড়ের আগে বকুল ফুলের দৌড়

আমাকে বকুল কেন বলো ?

আমি পুরুষ কঙ্কাল ।


দেখেছ নারীর হাতে অখন্ড আঙুল

আঙুল তোমাকে ইন্দ্রজালে বুনি

আমরা তখন ভিন্ন পরদেশী ।

দেখেছ আদিম নদীর বহুমুখী গতি ?

বর্ণহীন অপা্র্থিব ভালোবাসা !

জাগরণে যায় বিভাবরী ।

দেখেছ উল্লাস কত বিষাদ বিভ্রম ?

সরল গানের ছায়াসুশীতল লয়

একলা মানুষ ক্ষনস্থায়ী ঢেউ

বকুল তোমার শান্ত তটভূমি ।
আমি এক অখন্ড কবিতা

আমি এক একনিষ্ঠ বেদুইন ৷
তোমার ভুবনে মহত্ত্ব কাড়া, ইনসাল্লাহ ৷
আমি শাহরুখ লড়াই স্বদেশ জন্মভূমি
আমি হৃত্ত্বিক ঐকান্তিক কৃষ্ণ ম্যাজিক
আমি অমিতাভ বৃদ্ধ রাজা অডিওপাউস৷
আমি রেসের শরীরে দুরন্ত অর্শ্ব হ্রেষা৷
আমি হাতির কালো খোদাই চিত্র বিশালতা
আমি অনন্য৷ আমি স্হবিরতা৷
তুমি আমার প্রেমে অসীম প্রভুত্ব
তুমি আমার নির্জন দুপুর সঙ্গবিহীন নারী
তুমি আমার সঙ্গবিতান পরিবর্ত্তন সেই ট্রাডিশন
তুমি আশা আমার সমস্ত পরিবর্ত্তন সমীচিন৷
আমি বর্ত্তমান নই৷ আমি নই আগামী কাল৷
আমি আমার সমস্ত অতীত
আমি ভবিষ্যৎ ৷ ভালবাসা মন কাঙ্গাল ৷

আমি নিজেই এক অন্তরীন প্রশ্ন
আমি হিপোক্রিট নই অশুভ অর্বাচিন বিবাদী
আমি এক অখন্ড কবিতা ৷ কবি মানস
আমার মানসে, মানসী এক শান্ত উদার পদ্মফুল৷




উশুল

এ দেনার বুঝি শোধ নেই
মহাজন তুমি কত দেনা লিখেছ বলত ?
শপথ করে বলছি আমার কোন ঋণ নেই
তোমার কাছে,
একটা শালিক পুষেছিলাম
তুমি সেটাও বেনামে রেখে দিলে
ভেবেছ বুঝিনা কিছুই আসলে বলিনা
রুচিতে বাঁধে,
কাঁচপোকার টিপ, পাতার বাঁশি, মাটির পুতু্‌ল,
আনন্দ আর কত নেবে? শালিকেও
চোখ গেল তোমার! এবারে তুমি
নাটাই আর ঘুড়িটাও নেবে ঠিক!
জমি নয় টাকা নয় বন্ধক রেখেছ শুধু শখগুলো ?
তাও চড়া সুদে,
সুদকষার নিয়মে অনেক করেছি হিসেব,
উত্তর মেলে না আসলের চেয়ে সুদই বেশী।






সে আসবে

তার আসা নিয়ে সংশয় নেই কিছু
আজ আসেনি কাল পরশু অথবা আরো কিছু দিন ......
তুমি চাও বা না চাও সে আসবেই ।
বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে ঢেকে
নখ দাঁত
প্রবঞ্চিত স্রোতে পথভ্রষ্ট করে
দূরে নিয়ে যাবে ।
তোমার সাধ পুরণ হবে না ।

পথ ভুলিয়ে বা বন্ধ করে পথ
ভেবোনা বাজিমাত হলো
তাতে কতটুকু দেরি হবে বলো ?

পথ খুলবেই
একদিন স্রোতের মুখের পাথরটা হয়তো
তোমার উত্তর পুরুষ
ঠেলে সরাবে তোমার সামনে
তুমি শুধু দেখবে
কিছুই করার থাকবে না ।

সে আসবে , মেঘের আড়ালে সূর্যের
মুচকি হাসির মতো
অবধারিত তার আসা
আজ আসেনি, কাল, পরশু

আরো কিছু দিন ।

About