এই সংখ্যায় ২৪টি কবিতা - লিখেছেন – সৌমিত্র চক্রবর্তী , সাঈদা মিমি, অমিতাভ দাশ, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপম দাশশর্মা, মধুমিতা ভট্টাচার্য, মোহম্মদ আনওয়ারুল কবির, কাজরী তিথি জামান, পল্লবগ্রাহী গুপ্ত, অনুপ দত্ত, আফরোজা অদিতি, সুবীর সরকার, হরপ্রসাদ রায়, অনিন্দিতা ভৌমিক, রাজেশ দেবনাথ,সতীনাথ মাইতি,আলি আফজল খান,শৈলেন্দ্র প্রসাদ চৌধুরী মানিক দীপ বণিক, চন্দন কুমার পাল, অনিমেষ সিংহ,সোহান সরকার, ইন্দ্রজিত সেনগুপ্ত এবং কাব্যগ্রন্থ আলোচনা কবি সুবর্ণা গোস্বামীর ‘কীর্তিনাশা’

          সূচিপত্রে ক্লিক করেও কবিতা পড়তে পারেন

অন্যনিষাদ’এর পাঠকরা জানেন যে আমরা কোন শারদ সংখ্যা বা পূজা সংখ্যা প্রকাশ করি না । স্মরণীয় সামাজিক ঘটনা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের অনন্যসাধারণ কৃতি পুরুষদের প্রণাম নিবেদন করা আমাদের দায় । আমরা তা করে থাকি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে । আগামী ১৬ই সেপ্টেম্বর কবি দিনেশ দাস’এর শততম জন্মদিন । ঐ দিন প্রকাশিত হবে বিশেষ সংখ্যা ‘শতবর্ষের কবি দিনেশ দাস’ । প্রস্তুতি চলছে । লেখা আহ্বান করছি – তাঁকে ছোঁয়া কবিতা কিংবা তাঁর কোন একটি কবিতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত গদ্য । ১৩ই সেপ্টেম্বরে মধ্যে পাঠাতে হবে ।

২) আগামী ২৪শে অক্টোবর ‘অন্যনিষাদ’ তৃতীয়বর্ষে পা দেবে । ঐ দিন প্রকাশিত হবে বিশেষ সংখ্যা  ‘পায়ে পায়ে তিন’ । ঐ সংখ্যাটি ‘অন্যনিষাদ’এর ১৫০তম সংখ্যাও বটে । ‘অন্যনিষাদ’ সম্পর্কে আপনার নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মুল্যায়ন / অভিমত জানতে চাইছি । গদ্য এবং কবিতা দুটোই এক পৃষ্ঠার মধ্যে হবে এবং ১৩ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঠাতে হবে এই ঠিকানায় – phalgunimu@gmail.com
কেন মোছা যায়না হৃদয়
মুছে ফেলো বললেই
সব কিছু মুছে ফেলা যায়?
এমনকি জলও  দাগ রাখে

পাঁচ হেমন্তের বেড়ে যাওয়া নখ,
মাঝেমাঝে ভাসমান জল কুমীর খেলা,
ডোবানো মরিচজলে ছয়ঋতুর ফ্যাকাশে সিঁদুরদান -
মোছা যায় কি কখনো?

পিঠের কানাচে আঁকিবুকি
বসন্ত আদর ক্ষত
কিম্বা এলবামে
কানা ছেঁড়া ধূসর স্মৃতি,
ঠোঁটের অবতলে গোপন দুপুর
পিন চেরা চিহ্ন রেখে দেয়

আঙুলের অন্ধ শাখায় প্রশাখায়
নিবারিত অনলসময়ের ঈশপ গল্পমালা
চিরহরিৎ বাসা বাঁধে অভিমানী সান্ধ্যঘাসে

সবকিছু মুছে দিলে
অবয়ব মিশে যাবে,
না বলা কথায় 


এখন গলিপথগুলো চিনি

এখন গলিপথগুলো চিনি, যে কোন
সংযোগবিন্দু থেকেই ঠিক
ফিরে আসি দরোজায়; সাদাকালো
ছাপ বেড়ালটার মতন, একটু
অলস পায়ে, মধ্যপথের বাজারটাকে
এড়ানো যায় না, জ্যামিতিক
সংযোগবিন্দু তারপর বহুভূজ বাহুর
মত অলিগলি, ময়লার গাড়িগুলি
বেহদ্দ মাতাল, লাল সিরামিক করা
বাড়ীটা, এখানে বুঝি
ফেরেশতা থাকে? একসার মেহগণি,
সৌখিন পাম, পাতাবাহারের
সাথে লাগোয়া হাস্নাহেনা, কোন
কোনদিন খুব রোদ ঝরে, এক একদিন
বৃষ্টির সঙ্গেই হেঁটে যাই





এ আহূতিবেলায় 

রাত্রে নাকি...বৃষ্টি ঝরেছিল
অন্যরকম দূরের আকাশ থেকে
নক্ষত্রর কাছে-আসা আলো
ঘুমের মাঝে গিয়েছিলই ডেকে
রাত্রে নাকি...বৃষ্টিইই ঝরেছিল
অন্যরকম দূরের আকাশ থেকে
নক্ষত্রর কাছে-আসা এক আলো
ঘুমের মাঝে গেল নীরবে ডেকে
তাই কি শরীর ঈষৎ থরথরো
ফুলফোটান কুঁড়ির সুখে কাঁপা
এমন ম্যাজিক ইথার আনতে পারো
আত্মঘ্রাণে উতল কাঁঠালীচাঁপা?
গন্ধবিধুর সন্ধ্যা সমীরণে
উলুস্থুলু স্পর্শ শিহরণ
আলোয় ভরে অন্ধকার এ ঘরে
মুহুর্মুহু স্মৃতির বিচ্ছুরণ
তুমিও পেলে? রাতের ছটফটানি?
নীল নীল নীল কষ্ট সুখের জোনাক
ঘুমিয়ে পড়তে দেরী অনেক জানি
স্বপ্নপুরুষ তোমায় নিবিড় জড়াক
রাত্রি নাকি ... বৃষ্টি ভরেছিল
স্বপ্ন জুড়ে উল্কা রাশি  রাশি
এই শ্রাবণে...ফাগুন এনে দিল
আনমনা এক অন্যরকম হাসি


পার্থিব

যতদুর চোখ যায়
জোছনা ভেজা মাঠ
ইতিউতি ছড়ানো শৈশব ঘাসফুল্র মাঝে
দূরে, আরও দুরে--কারা যেন কথা বলে
কামগন্ধ শিউরে ওঠে নিঃশ্বাস্ব নিঃশ্বাসে
মোহময় যন্ত্রণা, দুরন্ত যৌবন...
জোছনা মিলায়ে যায়
মৃত শব পড়ে থাকে এখানে ওখানে
সোনালী ভোর জেগে ওঠে  তবু---
বৈদিক মন্ত্রের মত সুললিত স্বরে
ঘাসফুল ফুটে রয় শৈশবের বুকে.....


বিকলাঙ্গি

তাকে দেখলাম সিঁড়ি বেয়ে
সে উঠছিল টলে টলে
তার চোয়ালে গভীর জেদ
তার চোখদুটো ঝলমলে
তার শরীর সেধেছে বাদ
তার চলন ছন্দহীন
তার জড়তা পদক্ষেপে
শুধু মনটুকু উড্ডীন
তার পোশাক চমকহারা
নেই নারীর লাস্যরেখা
তার আপস-বিমুখ মন
হাঁটে চুপচাপ একা-একা
তার প্রকৃতি অন্তরায়
সে তবু ভ্রূক্ষেপহীন
তার হাত ধরে নেই কেউ
তবু নিয়ত স্বপ্নলীন
ঐ মেয়েটাকে নাই চিনি
সে হয়তো যে কোন নারী
ঐ সংগ্রামরতাটিকে
আমি প্রণাম করেতে পারি


কাঁচের জলসায়.....


শরীর তখন থাকে নির্ভার পালকের ওমে
 
রোমকূপে শীতল ফল্গুস্রোতে অবোধ মনের
 
নিজস্ব পদচারণা
কল্পলোকের সুদৃশ্য ফলকনামা এক্সপ্রেস
 
একেবারে সরল ঢেউয়ে আচ্ছন্ন।

 
অচেতন নজর উড়ে বেড়াচ্ছে কখনও
 
চেনা বাঁকে কখনও বা হিম পড়া
 
আবিষ্কারের সাজঘরে।
 
রোদ্দুরে সেঁকে নেয় যে জীবন রোজ উদর
 
সে দারিদ্রের ও চোখের পাতায়
 
রঙিন নীহারিকা।

 
ওরা আসে রাত্রির গভীর নাভীবৃন্তে
 
শত শত পায়রা উড়িয়ে
 
ওরা আসে সারেঙ্গীর আপনভোলা
 
খোয়াইশ কুঁড়িয়ে।

 
ঊষার ঘোলা চোখে যখন একটু একটু করে
 
জাগে পলাশের রং
 
আবার আসবার প্রতিশ্রুতি লেগে থাকে ঘোরে
 
আর অস্ফুট আবেশে স্বপ্ন ঘুমায় তখন।
‘কীর্তিনাশা’ / সুবর্ণা গোস্বামী
আলোচক – ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

       নবীন প্রজন্মের কবি সুবর্ণা গোস্বামীর  কাব্যসংকলন ‘কীর্তিনাশা’ প্রকাশ করেছে ‘ধানসিড়িটির তীরে’ প্রকাশন । ৫৫টি কবিতা নিয়ে এটিই সুবর্ণার প্রথম কাব্যসংকলন ।

      সংকলিত কবিতাগুলি কেমন ? আমি বলবো কবিতাগুলি নিশ্চিত ভাবেই সৎ, পরিচ্ছন্ন ও হৃদয়বোধ সম্পন্ন এবং  বেশ পরিশীলিত কবি-মনের পরিচয় বাহী । আমার প্রাথমিক পাঠ প্রতিক্রিয়া এমনই ।

     সংকলিত কবিতাগুলির রচনাকাল ২০১১ পরবর্তী সময়ে । মীরপুর, ঢাকা নিবাসী পেশায় শিক্ষিকা, এখনও ত্রিশ না ছোঁয়া সুবর্নার কবিতা লেখার শুরুও ২০১১তেই । প্রেম, প্রকৃতি , আমাদের যাপন চিত্র, জীবনের অন্বেষণ ও জিজ্ঞাসা, দ্রোহ – সবই আছে কবিতাগুলিতে । কবিতা তাঁর কাছে কি ? তাও জানিয়েছেন সুবর্ণা “ কবিতার চরণে যার হৃদয়, বাঁচেনা সে /তবুও বাঁচার যদি সাধ, প্রতিস্থাপন করতে হবে/দ্বিতীয় হৃদয়, ক্ষুধার দুর্বিপাক অসুখেরও নির্বাসন” (‘কবিতার গ্রাস’) । কবিতাকে ভালোবাসেন সুবর্ণা, কবিতা তাঁর কলমে ধরা দেয় স্বতস্ফূর্ততায় । সুবর্ণা লেখেন “ কবিতার সোজা সাপটা ঝড় হানা দেয় অন্দর মহলে” (‘কবিতার ধাঁধাঁ’) । তবুও নিজেকে কবি বলতে কুন্ঠা বোধ করেন তিনি । বলেন “আমি সবিনয়ে বলি আমাকে কবি বলে ডাকবেন না” ।

না, এই পংক্তিটিকে আমি কবির নিছক স্বীকারোক্তি রূপে দেখছি না । বরং এই উক্তির পিছনে খুঁজতে চেয়েছি কবির না বলা যন্ত্রনার ইঙ্গিত । মনে হয়েছে, কবিতার বিষয় ভাবনায় পীড়িত মানুষের বেদনার কেন্দ্রে হাত না রাখতে পারার যন্ত্রণা হয়তো বা কবিকে বিদ্ধ করে । এই কবিতাটিতেই কবির সাহসী উচ্চারণ –

“আমি বসন্তের ফুলকে ঠেলে দেব আহত বাঘের খাঁচায়
রঙধনুকে মুড়িয়ে দেব কাফন-চাদরী সাদায়
গোধুলির ঘোমটা খুলে নগ্ন স্বাধীনতা দেখাব মাঝ দুপুরে
রক্তজবাকে শেষ বারের মত উষ্ণ রক্তে ধুয়ে – ঘুচিয়ে দেব
দেবই – নিরীহের রক্তে করা শাসকের স্নান” ( ‘সনির্বন্ধ অনুরোধ’) ।
কবিতাগুলির নির্বাচনে বেশ যত্নের ছাপ রয়েছে । বিষয় ভাবনায় ভিন্নতা আছে, কিন্তু কোন অপটু কবিতা যায়গা পায়নি । আটপৌরে দেশজ শব্দের ব্যবহারে কবিতাগুলি পড়তে ভালো লাগে । সংকলিত কবিতাগুলির বিষয় ভাবনায় আপাত ভিন্নতার মধ্যেও একটা ঐক্যের সুর প্রচ্ছন্ন – তা হ’ল এক মহত্তর জীবনের বোধ, অন্বেষণ ও জিজ্ঞাসা । মহত্তর জীবনের অন্বেষণেই কবি উচ্চারণ করেন 
“আমি জীবন্ত মানুষের জন্য খুঁজি
পোড়া রুটি চাঁদ,
শীতবস্ত্র, ছাদ
অস্ত্র হাতে মানুষের কঙ্কাল খুঁজি না” (‘অহংকারী’) ।

এই উচ্চারণের মধ্যে নিশ্চিত ভাবেই কবির কাব্যদর্শনের ইঙ্গিতও পাওয়া যায় । ‘কীর্তিনাশা’র কবিতাগুলি পড়ে আমার মনে হয়েছে কবিতাগুলির মধ্যে নিজেকেই খুজতে চেয়েছেন । কবিতার তন্ময় প্রেমিক কবি সুবর্ণা লেখেন “নির্বাক করে আমায় তোমার ধ্বনির উদ্দামতায় ! আকুল প্রসব কর কবিতা ... / নীলাদ্রী যেমন অনিবার জন্ম দেয় ঢেউ এর পর ঢেউ” ( ‘নীল চন্দনের জন্য’) । চেয়েছেন ‘শব্দের বোধনে প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ ।
  
     সংকলিত সব কটি কবিতাই লিখেছেন আমাদের নিত্যদিনের পরিচিত সহজ শব্দে, আর এই আটপৌরে দেশজ শব্দেও লাবণ্যের দ্যুতি ছড়িয়েছেন সুবর্ণা । পাঠক তো কবিতার কাছে আসেন মাধুর্যের আকর্ষণেই ।


‘কীর্তিনাশা’র প্রচ্ছদ একেছেন অমিতাভ দাশ । বেশ উজ্জ্বল ও শোভন ও আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ । বইটির মুদ্রনেও যত্নের ছাপ স্পষ্ট । ৬৪পৃষ্ঠার বইটির দাম ভারতে ১০০টাকা, ঢাকায় ১৫০টাকা । নবীন কবি সুবর্ণা গোস্বামীর বইটি দুই বাংলাতেই সমাদৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস ।

About