এই সংখ্যায় ৩০টি কবিতা । লিখেছেন - অমলেন্দু চন্দচন্দন ঘোষদেবাশিস মুখোপাধ্যায়ইন্দিরা দাশপ্রণব বসু রায়মধুমিতা ভট্টাচার্যফারহানা খানম, আনওয়ারুল কবীরসঞ্জয় সোমদর্শনা বোসস্বপন দেবরেবা সরকাররুবি মুখার্জীইন্দ্রনীল চক্রবর্তীসিয়ামুল হায়াৎ সৈকতদেবলীনা দেকাজরী তিথি জামান, শিবলী শাহেদদীপঙ্কর বেরাপ্রবণ পালন চট্টোপাধ্যায়সর্বাণী গোস্বামীইন্দ্রজিৎ দত্ত, বচন নকরেকসুমনা ভট্টাচার্যআবির খানমামুদ নজিররিংকু কর্মকার ও বাবুল হোসেইন ।

              সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন
সোনাগাছি

মাঝরাত চিকুর খেলানো আলোয়
চাঁদ ঝুলে আছে বিবর্ণ দেওয়ালে
দুর্বৃত্ত কাল দেউলিয়া স্পর্ধায় আন্ধার ফিরোজায়
তারার আলোর ডাকে বেলেল্লাপনায় বহুগামী
স্বেচ্ছাচারের ক্যানভাসে
বেলিফুল শস্তা মদ আসক্তির হলদেটে ছাপ
পাটভাঙা শাড়িটির অনেকটা জুড়ে
ঝিম মারা শেষরাত
অপেক্ষারা ঠোঁট চোষে লম্পট আহ্লাদে
জনপদবঁধু আধো ঘুম আধো জাগরন ছুঁয়ে
থাকা না থাকার ঘোরে অতিপুরাতন কিছু খোঁজে -
কেউ তার বেদনা দেখুক
কোনও একজন তাকে রমনী বলুক

[শেষ দুটি লাইন আবুল হাসানের কবিতার লাইন  একটু বদলে নিয়েছি ।ওই লাইন দুটি থেকেই এ 
কবিতার ভাববীজের জন্ম ।]
বিকেল

সূর্য নামের ছেলেটি চা ঢালতে
ঢালতে দেখে
নিভে আসা উনানের
দুধ উপচে পড়ে যায়
ট্যুইশন পেরোয় লাল সোয়েটার
বালিকা সাইকেল
সন্ধার চুলে কোনো ক্লিপ ছাড়াই

বিবাহ পূর্ব কথা 

পুকুরে নেমেছে মেয়ে 
বিবাহের আগে 
জলকে আলিঙ্গন 
আর ভিজে পা এঁকে 
চেনা জানা পথ ছেড়ে যাওয়া 
সেই চিহ্ন  পথ ছুঁই 
সেই কুমারী  জলে হাত রাখি  
শুদ্ধ হতে হতে শুনি 
চারদিকে শাঁখ ও জোকার 
নিখিলের


উত্থান

তাকে বলি, ওঠো
নিজের ধ্বংসস্তুপ থেকে ওঠো
নিজেরই অস্তিত্বপোড়া ছাইপাশ থেকে

তারপর শূন্যে ওড়ো
দ্যাখো, দুদিকেই তুষের আগুন
কীভাবে সাপ্টে খাচ্ছে, আমূল, সত্ত্বার গাছটিকে

অথবা ধর্মের ঘরে চোর হয়ে
ঢুকে পড়ছে চাপাতি ও ছোরা
কী কৌশলে মুষল পর্বের শুরু হয়

কিম্বা এমন ওড়ো, পাখার ঝাপটে ঝড় ওঠে
ধ্বসে পড়ে স্বর্গ-নরক,

জ্বলে যায় রাক্ষসের পাপ ও কালিমা।
নিজের কাছেই রাখা প্রশ্ন
      
ভাসমান ভ্রমণেই থেকে যায় শিমুল তুলো
জননী-গাছের থেকে একবার খসে গেলে
কোনদিন ফিরেও আসে না

এখন ইলিশ-জালের মতো চার পাশে দীর্ঘ জটিলতা
আভ্যন্তর গভীরে দু' একটি দ্বীপ, কিছু প্রত্ন পাথর,
কোনদিন এরা সূর্য দেখে নি, শ্যাওলার চাদরে ঢাকা

এরা কি আপন ভেবে নেবে?
এরা কি পানীয় কিছু দেবে?

কিছু গান বাজবে ওখানে?
শেষ শীতে, শেষ পাতা ঝরা

ঐ যে অমন করে সাদা জামা কয়েকটা মানুষ
সাথী একজন কাকে বয়ে নিয়ে
ধরেছে যে হাঁটা
কার যেন শৈশব কৈশোর সাদা খই উড়ে উড়ে পিছুপিছু কিছুক্ষণ
একটানা হরিবোলে তখন
যে হচ্ছে প্রস্তুত চার কাঁধে পাল্কীতে
রওনায় খুঁজে নিতে মরণ রে শ্যামসমান
এ গ্রহের প্রাণী সব এভাবেই জানায় তারা বিদায়ের গান।
তাদের একটি জন বিবর্ণ হলুদ হলে হেমন্তের শেষে।
এইখানে দূর উচ্চতায় এই চরাচরে এসে
দেখা যায় ঐ ধোঁয়া ওঠে এঁকেবেকে-
ছোট ছেলেটার হাত ধরে বিমূঢ় পুরুষ
একপাশে লোলচর্ম বৃদ্ধ, কার শোকে মর্মাহত, হাতে মুখ ঢেকে!
শরীরই তো শেষ হোল শুধু, যে রয়েছে এইখানে বেশ
বাতাস, মাটিতে, জলে ভারহীন, ব্যাথাহীন হয়ে
সেই তাঁর শেষ নেই, নেই অবশেষ।
কে বা পাবে শাড়ি জামা পাটিহার, কঙ্কণ জোড়া
পিলু-বিলু খেল কি না দুধ, সন্ধ্যে দেওয়া হয়েছে কি আজ
নাঃ, আজ আর নেই কোনও কাজ।

ধুয়ে দিতে উপস্থিতি, ওরা এসে গেছে এইবারে
বুড়িগঙ্গাটির ধারে
নির্বোধ কান্নায় কেন যেন ভেঙ্গে খান খান, ওরা তো না জানে
যেমন না মানে
মাটির ফাটল থেকে ঘুম ভেঙ্গে কচিপাতা চারা
গোগ্রাসে টেনে টেনে জল হাওয়া আলোর রসদ
তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে মনে মনে ভেবেছে বিশদ
আরও তো অনেক কটা হোল ডালপালা, এবারের ফুলের বাহার
নুইয়ে আসা স্তনবৃন্তে ফলের সম্ভার
আমার সংসার, এখানে সবই আমার
এই উত্তরের বড় ডালখানা, অসংখ্য পাতাও
এমনকি শ্যাওলা সবুজ ছায়াটাও
ইতিমধ্যে তাও
বৃদ্ধ সময়, পাশ দিয়ে হেঁটে যায় চলে
যতিচিহ্নে ঠিক তাঁর পৌঁছিয়ে যেতে হবে বলে।

সেই শীতে শেষ পাতা ঝরে গেলে, গজায় না আর
ডালপালা, কোমর, শরীর, পা
সব কেটে নিয়ে চলে যায় জ্বালানির প্রয়োজনে
কোনও এক অভাবী কুঠার
হাস্যকর হয়ে যায় প্রাক্তন সমস্ত আদানপ্রদান
লাভ ক্ষতি সব অবসান
সে সময়ে গাছ আর সেই একটি একদা মানুষ

সঙ্গী মুক্তপ্রাণ।
ছবি

থাকার চেয়ে না থাকাটাই দামী
ছবির ফ্রেম-ই রজনীগন্ধা পায়
বাঁচতে বাঁচতে শিরদাঁড়া নোয়ালে
জং ধরে যায় শীতল প্রেমের গায়।

কর্মব্যস্ত অবিন্যস্ত দিন
সন্ধে নামে টিভির সিরিয়ালে
মুঠোয় জাগে সুদূরভাষের চাবি
রাতের পাখি চরে আন্তর্জালে।

না থাকাটাই তখন বেশি প্রিয়,
মালার গায়ে ধূপের ভালবাসা
লেপ্টে থাকে অবিস্মৃত শোকে
নীরব ছবির অনুক্ত জিজ্ঞাসা!  


বিম্বিত প্রতিবিম্ব

শিশির ভেজা ঘাসে তখনো একফালি চাঁদ
ডুবে যাবার আগে শেষবার দেখে নিচ্ছে বিম্বিত
 প্রতিবিম্ব;
 পাণ্ডুর জ্যোৎস্নায় কবি দাঁড়িয়ে থাকেন নিশ্চুপ
 অবয়বে জড়ানো  শব্দদের উফুরান উপহাস 
এখন কলম শুধুই আল্পনা আঁকে, অথচ হৃদয়ে
 অনন্ত বিলাপ ।
 নপুংসক ক্রোধের দাবানল নিভৃতে ছড়িয়ে পড়ে
  তার নিগুঢ় অস্তিত্বে 
রাত্রি জুড়ে তোলপাড় করে বৃক্ষদের
 চাপা দির্ঘশ্বাস !
 কুয়াশার জাল বুনে চলেছে উত্তুরে হাওয়া ,
বিহ্বল জোনাকির চঞ্চলতায় আদিগন্ত কিছু

 সুখের আভাস!
শ্বাশ্বতে চোখ

বিউটি পার্লারে ঘষামাজা
বাড়ছে রুপ -
অযাচিত লোম গেছে ঝরে
ঢেকে গেছে কুঞ্চন রেথা।

খাঁচায় কি এসে যায় !
আমি তো খুঁজি কবিতা ...

অচিন পাখি, তোরও কি কোলাজেন ঝরে পড়ে?

 তবু রয়ে যাবো

চুপসে যাওয়া বেলুনের কসম- আমিও একদিন ফুরিয়ে যাব!

চলে গেলে তবু ঘ্রাণ রয়ে যায়, অন্নপ্রাসন্নের স্বাদ জিভে লেগে থাকে

আমিও রয়ে যাবো ...

কাফন ঠিকরে বেরিয়ে আসা আমলনামা ছুঁয়ে দেখো শুধু।
কাঙাল

যদি ঝোড়ো হাওয়া হয়ে উড়ে যেতে যেতে
খানিকটা থমকে দাড়াই তোমার ছাদের কার্নিসে
ভেবো না,থেকে যাবো ভেবে!  

আমাকে উড়ে যেতে হবে অলিগলি পথে
রাজপথ ছেড়ে রেলস্টেশনের ধার দিয়ে
উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে । 

অপেক্ষা কোরো না ফিরে আসবো ভেবে
চেনা পথে , দ্যাখা হবে ভেবে !
আমার অপেক্ষায় রয়েছে
শত কাঙাল ভিক্ষুক ।

শুনতে পাচ্ছনা চিৎকার,হাহাকার 

সবাই নিঃস্ব,আমার মত ।  
নিবিড়তর অজন্তা ইলোরা

অতলান্ত গভীরতায়
স্রোতের বিপ্রতীপে
নিজের দন্ডায়মান অবয়ব
বড় অচেনা লাগে।

নির্ঘুম শীতকাতরতায়
চেতনার অলিন্দে খেলা করে যায়
এক অপরূপ সিম্ফনি।
তখনি রাতের মসৃণ শরীরে
খোদাই হতে থাকে

নিবিড় থেকে নিবিড়তর অজন্তা ইলোরা।
মন ভালো নেই

ঝরে যাওয়ার আগে,
ক্যালেন্ডারের শেষ কটা দিন
গভীর শীতঘুমে মগ্ন। 
পৌষের রিক্ত মাঠে
 
দিগন্তব্যপী কুয়াশায়
 
ডুবে যেতে যেতে
প্রবল আলস্যে
 
কেটে যায় দিন।
 
হাবিজাবি কতকিছু অর্থহীন
জমা হয়
 
ভালো থাকার প্রবল প্রচেষ্টায়।
এখানে মেঘেরা ভুলে গেছে উড়ে যাওয়া,
 
এখানে সোনালি রৌদ্র চুপ
এখানে আকাশ পায়নি জলের আয়না
কাজেই দেখেনি রূপ।
নতুন বছর রওনা হয়ে গেছে
আমার পোস্টাল ঠিকানায়, 
ঝিকমিক ঘাসফুল -
উজ্জ্বল সময়ের আশ্বাসে
 
গোলাপ কুঁড়ির ঘুম ভাঙ্গে ।
তবু মন ভালো নেই --
এক মুঠো বিষণ্ণ স্থবির সময়
আর এক জীবনের বিপুল অপচয়
 
বসে থাকি, বসেই থাকি
… 
জানি না কিসের প্রতীক্ষায়।


তিস্তার ঢেউ

পাহাড় থেকে আসে পাথর সমেত
খোঁজে জলপথ
নৌকা মাঝি
জলতরঙ্গ সংগীত।

সাগরসঙ্গমে হাত ধরে
  বুকের খাঁজ টুকু দেখে
নৈঃশব্দ পাহাড় ভাঙে।

ঝিনুুক তোলো
এক সাথে মুুুক্তা পলা
এখাানে ঝাউতলা
বালিহাঁস পাখামেলা।

জলছোঁয়াচোখ নিথর দৃষ্টি ...

আমি পলা নই ...

তোমার জন্য পাহাড়িয়া তিস্তার ঢেউ ...
সোহাগী

জড় -জীবনের কাঁটা তুলে,
এক সুন্দর শুদ্ধতা যখন জীবনকে ভালোবাসে-
একঝলক ফাগুন বাতাস
মাতাল করে মনের অঙ্গন...
শীত-রোদের মত ওম ওম পরশে-
জীবনেও মাদকতা আনে !
'এই তো নিয়ম' ভেবে
বয়ে চলা প্রাত্যহিকীর সাথে গাঁটছড়া বাঁধি,
বুঝিনা..শীতের রোদ বড়ই ক্ষণস্থায়ী,
দখিনা বাতাসও ...
হঠাৎ ভীষণ তুষার-দিনে-
হিম-শীতল অনুভূতি...
প্রাণের অতলে লিখে রাখে সেইসব কথা,
ফাগুন-দিন ...হতে পারে অমলিন, চিরস্হায়ী
পায় যদি আবাহন মর্যাদার..

সে যে বড়ো সোহাগী, অনাদর তার সয় না !!
 মাংসপিণ্ডের ঈশ্বর

আমাকে আরেকটি চাঁদ দিতে পার?
  যে চাঁদ অমবশ্যার মত বসে থাকে
            ক্ষুধিতের ঘরে।

আমি তার কালো জ্যোৎস্নার মত স্তনের
          মাঝে হাত রেখে বলব,
একদিন যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছিলাম,
       আজ তা উপড়ে ফেলতে চাই।

ছোঁড়া তীরের মতন তরঙ্গরাশিরা
    তাদের ফেরার পথে আমাকে
ছন্নছাড়া করে দেয়, আমি উন্মাদের মতন,
   বেঁচে থাকার জন্য ঈশ্বর খুঁজে যাই।

ভোর চুরি করা স্বপ্নের মতন বেঁচে থাকে কর্তব্যবোধ।
    আর যে পথে এসেছিল ঈশ্বর, সে পথে ছিল একটি মাংসপিণ্ড।
একটা ছোট্ট মাংসপিণ্ডের কি ভীষণ দাপাদাপি,
         জানতে চাওনি কেন?
কাকে আশ্রয় করে প্রমাণ করব আমি মানুষ
    তোমায় নাকি সেই মাংসপিণ্ডকে।
দাও, দাও আরেকটি চাঁদ দাও আমায়,
আমি আজ প্রাচ্য, পাশ্চাত্যের স্মৃতি ভুলে
তার কালো জ্যোৎস্না গায়ে মেখে
বসে থাকব, যদি এ পথ দিয়ে তুমি আস
বা আসে এক টুকরো মাংসপিণ্ড।


কন্ঠস্বর

পাহাড় বেয়ে কণ্ঠের উচ্ছ্বাস হয়
ঘুঙুর ছিঁড়ে মাটির স্পর্শ-অথৈ-
তোমায় নিয়ে সপ্তাহজুড়ে কানাঘুষা,
জলের শব্দে ঘুম নেই !
আমাদের ঘর বুনোহাঁস; বুনোমধু
এই সেই প্রেমিকাকে সে?
দ্বন্দ্বের ভিড়ে মাখামাখিতে সে অথবা..
দীর্ঘ মুখোশ কাঠিতে জ্বলছে
পুড়িয়ে দিই ঘুমঘর-আত্মহত্যা !


অকপট স্বীকারোক্তি
   
সাতপা  হাঁটলে বন্ধু হওয়া যায় ,
আমি তোমার বন্ধু নই
রোজ যে নৌকায় তুমি ফেরো
আমি তার পালটা ছুঁই।

দুপুরের আলটুসে রোদের হাত
ধরে এগিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
মাঠ পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত
নীল আকাশ হাতছানি দেয়
তুমি , যাবে আমার সঙ্গে।

তোমায় দেখেছিলাম আমি
শারদ প্রাতে রোদের আভায় ,
তোমায় পেয়েছিলাম খুঁজে
হেমন্তের একটি শিশির বিন্দুতে।

নদীর জলোচ্ছাসের গতিবিধি
তোমার জানা ,
গতদিন তাকে ছুঁয়েছিলে
উচ্ছাসে মেতেছিলে কিছুক্ষণ
সামিল হয়েছিল নুড়ি-শ্যাওলার দল
খবর দিয়েছে তারা।



About