এই সংখ্যায় – সম্পাদকীয় 'মৃত্যুঞ্জয় অভিজিৎ’,অভিজিৎ রায়ের লেখা (পুনপ্রকাশ), সরদার ফারুক, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, সৌমিত্র চক্রবর্তী, বৈজয়ন্ত রাহা, পৃথা রায়চৌধুরী, নাশিদা খানচৌধুরী, শৌনক দত্ত, অনুপম দাশশর্মা, মমতা দাস(ভট্টাচার্য)

মৃত্যুঞ্জয় অভিজিৎ

ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারির রাত্রি সাড়ে ন’টা এক মর্মান্তিক সংবাদ নিয়ে এলো । মানুষের মুক্তচিন্তার প্রকাশ ও মিলনমেলা ঢাকার একুশে বইমেলা আরো একবার সাক্ষি থাকলো ধর্মীয় মৌলবাদীদের রক্তপিপাসার । ‘মুক্তমনা’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, ধর্মীয় মৌলবাদ বিরোধী, বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে খুন করলো কিছু দুর্বিত্ত । ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এভাবেই বইমেলা থেকে ফেরার পথে অস্ত্রধারী যুবকদের হামলার শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও  লেখক হুমায়ুন আজাদ । 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতকীর্তি অধ্যাপক অজয় রায়ের পুত্র অভিজিৎ ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী লেখক । মৃত্যুর দিন অপরাহ্ণেও তার শেষ পোষ্ট করেছিলেন । ধর্মীয় মৌলবাদবিরোধী লেখায় অভিজিৎ কখনোই কোন আপোষ করেন নি ।
তাঁর ব্লগে একটি সাম্প্রতিক পোষ্টে অভিজিৎ লিখেছিলেন "যেভাবেই হোক, জিহাদী ভাইরাসের এন্টিবডি তৈরি হোক, ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই এখন কাম্য। সভ্যতা বাঁচুক এই সব উগ্র বিশ্বাসের মহামারীর হাত থেকে" । এই কাপুরুষোচিত হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বিশ্বজোড়া ধিক্কার ধ্বনীত হচ্ছে, হবে ।

ঘাতকের চাপাতিই শেষ কথা বলে না ।
এখনই সময় – শুধু শোক নয়, বরং কবি নন্দিতা ভট্টাচার্যর পংক্তি ধার করে বলি
“মোমবাতি জ্বালিয়ো না আর, শিখার ওপর
হাত রাখ, তর্জনিকে শক্তিশালী কর......”
ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তীব্রতর করার এইইতো সময় ।

বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সংখ্যাটর প্রকাশ করলাম অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে । শোকের আবহে অন্য কবিতা, যাদের লেখা আজ প্রকাশ করার কথা ছিল, প্রকাশ করলাম না । মার্জনা করবেন । কবিতাগুলি ১৫ই মার্চ সংখ্যায় দেবো ।
অভিজিৎএর লেখাটি সংগ্রহ করে দিয়ছেন কবি মিতালী মুখোপাধ্যায় ।



অভিজিৎ রায়ের লেখা

ধর্ম একটি ভাইরাস। পাকিস্তানের পেশোয়ারে তালিবানদের বর্বরোচিত হামলার পর যদি এ নিয়ে কারো সংশয় থাকে তা ঝেড়ে ফেলা উচিৎ। স্কুলের ১৪০ জন নিষ্পাপ শিশুদের গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিতে যাদের হাত এতোটুকু কাঁপে না, তাদের মস্তিষ্ক ভাইরাসাক্রান্ত নয়তো আর কি! বিশ্বাসের ভাইরাস !
যতোই ভাবি এগুলো নিয়ে আর পোস্ট দিব না, ততই দেখছি ঘটনাগুলো অক্টোপাসের শুর দিয়ে জড়িয়ে ধরতে চায়। আইসিসেরা সহি উপায়ে গলা কাটা শুরুর পর কেবল ধর্মকে ভাইরাসের সাথে তুলনা করেছিলাম একটা লেখায়, তখন - জামাতি, বামাতি আর আগরবাত্ততিওয়াল্লারা একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে আমাকে সালাফি সেক্যুলারবলে ট্যাগ পর্যন্ত করে দিল। বাংলাদেশের স্বার্থেই নাকি আমার বিরুদ্ধে তাদের লেখা লাগে। ঠিক আছে, বাংলাদেশের স্বার্থ বলে যখন কথা, মুখে কুলুপ আঁটাই তো ভাল। কিন্তু আমি কুলুপ আঁটলে হবে কি, বাচাল বিধাতা কি আর থামবেন, না তার তাগুদি বান্দাদের থামাবেন? কত ঘটনা যে এর মধ্যে ঘটে গেল রেইহানা নামে এক মেয়েকে ধর্ষণ করা হল, আবার উল্টে শরিয়া আইনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়া হল। সৌদি আরবে এক মুয়াজ্জিন আজান দিতে দেরী করায় গুলি করে দিয়েছে ধর্মের এক দ্বীন এক পাগলাসেবক। অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে এক ক্যাফে দখল করে মানুষজনকে জিম্মি করে রাখল আইসিসের পতাকাবাহী এক মধ্য বয়সী যুবক। আর এখন তালিবানী গুলিতে শিশুরা কচুকাটা দেখতে হচ্ছে।
অবশ্য এর মধ্যেই আবারো পুরানো ন্যাত ন্যাতা ত্যানা ছয় গিট্টু মেরে আবারো প্যাচানো শুরু হয়েছে – ‘তালিবানদের এই কাজের সাথে সহি ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই
এহ!! ভাল তো, ভাল না?
আমার মনে হয় কথা না বাড়িয়ে আগেকার একটা স্ট্যাটাসের পুরনো তালিকাটা আপডেট করাটাই এক্ষেত্রে বুদ্ধিমানের কাজ হবে -

- মক্কা বিজয়ের পর, মহানবী নাকি কাবার সমস্ত মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন। তালিবানরাও প্রায় একই কায়দায় আফগানিস্তান দখলের পর ঐতিহাসিক বৌদ্ধমূর্তি ধ্বংস করেছিল। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- বাংলাদেশে পূজার সময় যেভাবে প্রতিমা ভাঙা হয়, চিটাগং এ লালনের মূর্তি ভাঙা হয় এগুলোর সাথে সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ইসলামী জিহাদের নামে গত বারো শতক ধরে সারা পৃথিবীতে মিলিয়নের উপর মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- সৌদি আরবে মেয়েদের বাইরে কাজ করার অধিকার নেই, স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার নেই, ড্রাইভিং এর অধিকার নেই, নেই পুরুষদের সমান সাক্ষ্য কিংবা উত্তরাধিকারেও। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ইসলামে বহু বিবাহের বৈধতা আছে,মুসলিম বিশ্বে একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখারও বিধান আছে। কিন্তু তাতে কি। সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ইরানে সম্প্রতি দত্তক নেয়া কন্যা শিশুকে বিয়ে করার আইন পাশ হয়েছে, কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- মুসলিম দেশে গার্ল উপভোগ, কিংবা যুদ্ধের সময় তাদের যুদ্ধবন্দিনী ধর্ষণ, মালে গনিমত হিসাবে বিধর্মীদের স্ত্রী-কন্যাদের দখল কোন কিছুর সাথেই সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- পাকিস্তানে এত দিনের সিয়া সুন্নি বিরোধ, মারামারি, হানাহানি, লোকক্ষয় - সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- আইসিস, আল্ কায়দা, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, ইসলামিক জিহাদ, হামাস, হরকত-উল-জিহাদ, হরকত-উল-মুজাহিদিন, জেইস-মুহম্মদ, জিহাদ-এ-মুহম্মদ, তাহ-রিখ-এ-নিফাজ-সারিয়াত-এ-মুহম্মদ, আল-হিকমা, আল-বদর-মুজাহিদিন, জামাতে ইসলামিয়া, হিজাব-এ-ইসলামিয়া, জমিয়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশ (হুজি), শাহাদাত ই আল হিকমা ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), শাহাদাত-ই আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি, শহীদ নসুরুল্লাহ আল আরাফাত বিগ্রেড, হিজবুত তাওহিদ, জামায়াত-ই ইয়াহিয়া, আল তুরাত, আল হারাত আল ইসলামিয়া, জামাতুল ফালাইয়া তাওহিদি জনতা, বিশ্ব ইসলামী ফ্রন্ট, জুম্মাতুল আল সাদাত, শাহাদাত-ই-নবুওয়ত, আল্লাহর দল, জইশে মোস্তফা বাংলাদেশ, আল জিহাদ বাংলাদেশ, ওয়ারত ইসলামিক ফ্রন্ট, জামায়াত-আস-সাদাত, আল খিদমত, হরকত-এ ইসলাম আল জিহাদ, হিজবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, মুসলিম মিল্লাত শরিয়া কাউন্সিল, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট ফর জিহাদ, জইশে মুহাম্মদ, তা আমীর উদদ্বীন বাংলাদেশ, হিজবুল মাহাদী, আল ইসলাম মার্টায়ারস বিগ্রেড ও তানজীম এত শত জঙ্গিদল ইসলাম কায়েমের বাসনা নিয়ে জিহাদ, কতল সবই করে যাচ্ছে, কিন্তু এদের কারো কর্মকান্ডের সাথেই সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারের ওপর আল কায়দা আত্মঘাতী বিমান হামলা চালায়। এই হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বসে পড়ে। মারা যায় ৩০০০ আমেরিকান নাগরিক। আক্রমণকারীদের নেতা মোহাম্মদ আতা নিজেও তার সুটকেসে কোরআন বহন করছিলেন। ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত আতার কাছ থেকে পাওয়া তার শেষ নির্দেশাবলীগুলোও সেই সাক্ষ্যই দেয় যে, তারা পবিত্র আল্লাহ এবং ইসলামের প্রেরণাতেই এই জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন (Last words of a terrorist, Guardian UK দ্রঃ)। কিন্তু তাতে কি! সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০০২ সালে বালি বোম্বিং, ২০০৫ সালে লণ্ডন পাতাল রেল বোম্বিং, দিল্লিতে ২০০৮ সালে বোম্বিং, বোস্টন ম্যারাথন বোম্বিং, নিদাল হাসানের শুটিং - কোন কিছুর সাথেই সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০০৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের প্রথা-বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের উপর হামলা চালায় মৌলবাদী একটি দল। চাপাতি দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয় তার দেহ, যা পরে তাকে প্রলম্বিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০০৪ সালের ২রা নভেম্বর চিত্র পরিচালক থিও ভ্যান গগকে প্রকাশ্যে রাস্তায় গুলি এবং ছুরিকাহত করে হত্যা করা হয়; নারীবাদী লেখিকা আয়ান হারসি আলীকেও মৃত্যু পরোয়ানা দেওয়া হয়। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস নামের একুশ বছরের যে যুবক জিহাদ করতে এসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গ্রেফতার হয়ে বিশ্বব্যাপী পত্র-পত্রিকার আলোচিত খবর হয়েছিলেন। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের একটি ঘটনা। সৌদি আরবের এক হতভাগ্য নারী তার এক স্কুল-বন্ধুর কাছে থেকে একটি ছবি আনতে গিয়ে সেই বন্ধু আর তার ৬ জন সাঙ্গপাঙ্গদের দ্বারা ধর্ষিত হন। সৌদি আইনে (যার মূল ভিত্তি হচ্ছে ইসলামের শরিয়া), হতভাগ্য নারীটিই উল্টে বিচারের রায়ে দুশোটি বেতের আঘাত পেয়েছেন, কারণ, তিনি সুরা নিসায় (৪:১৫) বর্ণিত চারজন লোকের ইতিবাচক সাক্ষ্যআনতে পারেননি। তাই শরিয়া মতে - বিনা প্রমাণেধর্ষনের অভিযোগ উত্থাপনের মাধ্যমে আসলে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেন যে তিনি বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কেজড়িত ছিলেন। কিন্তু তাতে কি, এটার সাথে সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। সহি ইসলামের সাথে সম্পর্ক নেই রেইহানার ফাঁসির ঘটনারও।
- ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রাজীব হায়দার শোভনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। ধৃত অপরাধীরা স্বীকার করে ঈমানী দায়িত্বপালনের জন্য ইসলামবিদ্বেষী এই ব্লগারকে তারা হত্যা করেছে। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- ২০১৪ সালের মে মাসে নাইজেরিয়ার বোর্নো এলাকা থেকে ২২৩ জন স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করে মুসলিম জঙ্গি দল বোকো হারাম। বিবৃতিতে তারা বলে, ‘মেয়েদের স্কুলে যাওয়া উচিৎ না। বরং তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া উচিৎ। কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- আইসিস আজ কোরান এবং সুন্নাহ মতাবেক বিধর্মীদের ধরে ধরে জবাই করছে। সম্প্রতি পাথর ছুঁড়ে হত্যা করেছে ওক দম্পতিকে, সমকামীদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলছে, কিন্তু সহি ইসলামএর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
- অস্ট্রেলিয়ার সিডনীর ক্যাফেতে আইসিসের পতাকাবাহী যুবকের জিহাদী জোশপূর্ণ কর্মকাণ্ড এবং মানুষজনকে জিম্মি হিসেবে আটকে রাখার সাথে সহি ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।
- পাক তালিবান প্রধান সহি বুখারির রেফারেন্স দিয়ে বলেছে, তাদের পেশোয়ারে গনহত্যা মুহম্মদের জীবনী এবং হাদিস শরিফ দিয়ে সমর্থিত। পেশোয়ারে যা তারা করেছে, তা ইসলামী 'সুন্নত' কিন্তু তারপরেও ....
পেশোয়ারে স্কুলের নিরপরাধ ছাত্রছাত্রীদের গুলি করে হত্যার বর্বোরেচিত সাম্প্রতিক ঘটনার সাথেও 'সহি ইসলামের' নাকি কোন সম্পর্ক নেই। 




কোথায় লড়াই হবে, কাকে সাথে পাবো--

সেসব ভাবনা পরে, বন্ধু

আগে চোখ মুছে নেই

সড়কে এখনো রুধিরের দাগ লেগে আছে

কলম থামিয়ে দেবে ভোজালির ঘায়ে, এভাবেই ?

মানুষের মুখের আদল, আসলে নেকড়েদল


কে কে সাথে আছে , কার হাত কাঁধে-

আগে চোখ মুছি , তারপর কথা বলি ?

মৃত্যুঞ্জয়

কালরাতে কুয়াশা ছিল না
অন্ধকার শলাপরামর্শ সেরে নিচ্ছিল
আর চাঁদের আলোয় শানিয়ে নিচ্ছিল চাপাতিদের
অক্ষরগুলো প্রস্তুত ছিল বড়ো খবরের জন্যে

অন্ধকারের ভেতর ভয় থাকে
সে জানে আসলে তার ভেতর কিছু নেই
সে আসলে ভন্ড প্রতারক
চাঁদ আর তারার লোভ দেখিয়ে সে বশ করছে হাজার
আর তার গায়ে আফিমের গন্ধ

আমাদের নদীর কান্না ভুলে
উল্টো রাস্তার কথা শুনতে বলে
সবুজ পাতার দীর্ঘশ্বাস উপেক্ষা করে
অলস হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিতে বলে

তবুও সত্যিটা আমাদেরই মুঠোয়
অন্ধকার স্থায়ী নয়
ভোর আর রোদের উচ্ছাস আমরা লুট করে নেব

ভীত অন্ধকার রাতের বাঘনখে রক্ত ছড়ায়


কিছুটা স্তদ্ধ হলেও আমরা ফের ভোরের দিকে হাঁটি .....


আলোর খোঁজ করা মানুষের রক্তদেহ

অন্ধকারও ঘুমিয়ে পড়েছে

আলোর খোঁজ করা মানুষের

রক্তদেহ অনেক কিছু বলে যায়

বাতাসের কাঁপুনি আরো কিছু

দুঃস্বপ্ন আঁকে সেইসব অন্ধপাতায়

যাদের অস্তিত্ব নিয়ে ভয়

তারা সাহসী পাথরের গায়ে

চপার চালিয়ে ক্রমশ দেখে

সব অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গেছে

আর তাদের ঈশ্বরও ক্রমশ লুপ্ত

অথচ পাথর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর

রাত পার দিনের রোদ ছুঁয়ে


মানুষের আকারে আমায় ঘিরে

এবার শিকার কর মানুষখেকো

অনেক হয়েছে চুপ...
শুধু চুপিচুপি চুপ চুপ বলা,
অনেক হয়েছে চামড়ার নীচে
লুকানো শোণিত-কান্নার জল,
এবার একবার
অন্তত একবার বন্দুকের নল
ধরে মুচড়ে দাও,
চোখের জলকণা এসিডে বদলে
শেষবার ছুঁড়ে দাও

মানুষখেকোর লোমশ মুখে।

ঈশ্বর রক্ষা

যে মুক্তমন ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ধর্মের ধ্বজা ওড়ালে
সে মুক্তো ছড়িয়ে দিলো অযুত কোটি
চাপা পড়ে যাচ্ছ প্রতিটা রক্তবিন্দুর নির্ঘোষে, হে খুনি...
অস্ত্রজন্ম দাও আরো আরো,
মুক্ত মনে ছেয়ে যাচ্ছে চরাচর!
ঈশ্বরেরা তোমার আমার...

ঈশ্বরেরা মুখ ঢেকে...।
ছিঃ

সেতো বাড়ি ফিরে এল না!

আস্তে আস্তে পাতাদের ফিসফাস বন্ধ হয়ে গেল,
মৃদু নদীর কান্না,
অন্ধকারে সান্ত্বনার হাহাকার,
যাত্রার প্রতিবিম্ব কিরকম ফ্যাকাসে হয়ে এল।

অনন্ত অপেক্ষা--
যদি কোনোদিন ফেরে
তার কপালে মানুষের লক্ষণ থাকবে তো?
গলায় ইতিহাসের কোপ?

দেখে সবাই নিজেদের বলে উঠতে পারব?
ছিঃ


আর ক্রমাগতঃ রক্তের জোয়ারে ঢেকে যাবে সভ্যতার নগ্ন শরীর...

নিষিদ্ধ খেলাঘর

তুই আমি সাজা দেবার কে ?
ধর্মকে বর্ম করে যে অপকর্ম ,
ঈশ্বর তার কতটাই বা চেয়েছে !

হে ঈশ্বর তুমি ক্ষমা করো !
যারা এ পাপের ভার তোমার কাঁধে তুলে আনন্দে সোচ্চার,
তোমার দেয়া মূল্যবোধ অবমাননা করলো তোমাকেই কাঠগড়ায় তোলে,
চেনেনি তোমার ক্ষমতা ।

আশরাফুল মাখলুকাত তোমারই নির্বাচিত ।
এ যজ্ঞে তারা ভোলে,
শান্তিপ্রিয়তা তোমারই সর্বোচ্চ কাম্য ।

শয়তানের ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ -
বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারী মনে রাখে না,
দিন শেষে প্রত্যাবর্তনকারী সকলে তোমারই মুখাপেক্ষী ।

ঈমান ওরা আনতে পারেনি, তাই তুমি কাঠগড়ায় ।
আমিও ।

জালিম তুই বুঝিসনি,
তার কৃতকর্মের ভার এখন তোর কাঁধে...
শুধু বর্মের দোহাই দিয়ে তাঁকেই প্রশ্নবিদ্ধ করলি !
বিচার বরং বর্বরতার হলো বাকি ।

তোকে আমি চিনিনা হে মোহরবিদ্ধ পাপী ...
তোরই কারণে হলাম ছোট,

তীব্র বাক্যে জর্জরিত আজ, লজ্জায় মুখ ঢাকি ।


সব কিছুই নিয়মমমাফিক চলে

মরে যায় শুধু অভিজিতরা

কলমের কাছে নতজানু থেকে


কৃপানের হোক নরকযাত্রা ।

 মন খারাপ

মন খারাপ মন খারাপ

এ তোমার , এ আমার পাপ

আমাদের নীরব নিস্পৃহতা

বাড়িয়েছে শয়তানের দাপ !

মৃত্যু ছাড়িয়ে যায় ধীরে

জীবনের একেকটা ধাপ

এভাবেই বাসা বাঁধে বিষাক্ত সাপ

সমাজ ঘিরেছে আজ ক্লিন্ন অভিশাপ

জীবন , জীবন শুধুই সন্তাপ !

সুশীলের নাপিত ন্যাকামী...

প্রিয়
দূর্বলতা আর নিধিরাম সর্দার,
এখানে শোক মানে
অসংখ্য স্টেটাস
মোমের বিক্রি সংকট
ন্যাকা কান্না মুক্ত চিন্তা,উদারতা
হুমায়ুন আজাদ কিংবা বিশ্বজিত্‍
তারা ভালো আছে তো!
মুক্তবাতাসে ওরা বেশ আছে
গতকালও বলে গেলো
গলি আর গুলি নয়
রাজপথেও ওদের চা আর পাতি
ফুটবে খানিক তারপর দোল
আবীরের বিক্রিবাট্টায় সব
চাপা পড়ে যাবে রঙে উল্লাসে
কেবল মৌলি আজাদ কিংবা
অজয় রায়ের পাশে কাঁদবে

'পাক সার জমিন সাদ বাদ'...

 অন্যনিষাদ ভাষাপ্রণাম

বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকোনো উঠোনে ঝরে রৌদ্র, বারান্দায় জাগে জ্যোৎস্নার চন্দন ! বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে । খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে নদীও নর্তকী হয়

এই সংখ্যার সূচি  প্রবন্ধ - সুদীপ নাথ, শ্রী শুভ্র, সৌনক দত্ত । রম্য গদ্য-জয়া চৌধুরী, কবিতা - বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, রত্নদীপা দে ঘোষ, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, সৌনক দত্ত, আলি রেজা, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, হরপ্রসাদ রায়, সৌমিত্র চক্রবর্তী, অনুপম দাশশর্মা, অরুণ সেনগুপ্ত, শেখর কর, শঙ্কর দেবনাথ, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, মিতালী মুখোপাধ্যায়, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রজিৎ মাজি,অদিতি চক্রবর্তী, জয়া চৌধুরী, রুদ্রাক্ষ রায়হান,  মুক্তা রহমান, রিয়া চক্রবর্তী, সতীশ বিশ্বাস, দেবাশিস লাহা, মনোজিৎকুমার দাস

                  পড়ুন সূচিপত্রে ক্লিক করে


সময়ের ব্যবধান মাত্র তিন দিনের । ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল ‘স্মরণে জীবনানন্দ’, আজ ‘ভাষাপ্রণাম’ সংখ্যা । তিনদিনের ব্যবধানে পত্রিকার দুটি বিশেষ সংখ্যার প্রকাশ শ্রমসাধ্য ঠিকই, কিছু সংশোধনযোগ্য ভ্রান্তিও থেকে যেতে পারে । তা সত্তেও ৩টি মননশীল প্রবন্ধ সহ ৩০টি লেখা দিয়ে সাজানো ‘ভাষাপ্রণাম’ সংখ্যা একুশের সকালে প্রকাশ করতে পারার যে অনন্য তৃপ্তি, তা প্রকাশ করি কি করে ? অন্যনিষাদের শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে সেই তৃপ্তি ভাগ করে নিলাম ।
একুশে স্মরণ তথা বিশ্বমাতৃভাষা দিবস উদযাপন মর্যাদাময় হোক এই কামনা করি । আজ ভাষা-শহিদ স্মরণ এবং বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসও । সুতরাং একটা প্রত্যয় জন্ম নিক আমাদের মধ্যে । আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে আরো বেশি বাংলা ভাষার ব্যবহার করি, পরস্পরিক আলাপচারিতায় আরো বেশি বাংলা শব্দের প্রয়োগ করি, নিজ সন্তানদের মাতৃভাষার আরো বেশি কথা বলতে প্রাণিত করি । এই সংখ্যাটি সম্পর্কে পাঠকের মতামত জানতে পারলে খুশি হবো ।
একটি তথ্য সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম । আমার অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে অন্যনিষাদের পৃষ্ঠা-দর্শন বা ‘পেজ ভিঊ’ সংখ্যা ১লক্ষ অতিক্রম করে গেছে গত সপ্তাহেই । গুগুলের তথ্য জানাচ্ছে যে, ‘স্মরণে জীবনানন্দ’ সংখ্যাটি প্রকাশের আগের দিন মোট পৃষ্ঠা-দর্শন ছিল ১লক্ষ ৫৯ । আর ‘স্মরণে জীবনানন্দ’ সংখ্যাটি প্রকাশের পর এই চার দিনে আজ সকাল ছটা পর্যন্ত মোট পৃষ্ঠা-দর্শন ১লক্ষ ৯০১জন মানুষের । সকলেই সব কবিতা পড়েন এমন নয়, তথাপি এই তথ্য নিশ্চিত ভাবেই অন্যনিষাদের লোকপ্রিয়তার সূচক, সংশয় নেই ।

শুভ হোক । ভালো থাকুন । অন্যনিষাদের সঙ্গে থাকুন । পরের সংখ্যা ২৮শে ফেব্রুয়ারি ।

ভাষা দিনের গান

 একুশের চোখে আকাশ দেখেছি আমি
 পুরানো গন্ধে স্মৃতিধূপবাতি জ্বলে 
 মায়ের আঁচলে মিশে আছে  কথামালা
 স্তব্ধ রাত্রি নির্বাক কোলাহলে ।

একুশ এলেই ইচ্ছের মেঘে আলো
আমি পুরুলিয়া মানভুমি কথা বলি
অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দশেকল ভেঙে
স্বাধীন আবেগে ভরেছি নিজের থলি ।

নিমতেল মেখে ওই আদিবাসী মেয়ে
অলচিকি লিপি প্রেমচিঠি দেয় চাঁদে
একুশের চোখে জ্যোৎস্না্র দিঘিজল

ভালোবেসে  সেও বুকে টেনে নিয়ে কাঁদে ।

মাতৃভাষা দিবস প্রসঙ্গে

আমরা এমন একটা সময়ে পৃথিবীতে বাস করছি যখন আমাদের দেশে দেখা দিয়েছে এক বিপজ্জনক ঝোঁক। প্রত্যেকটি দুর্বল ভাষাই উন্নত কোনো ভাষার বর্ণমালা দিয়ে লেখার প্রবণতা বেড়েই চলেছে । ফলে আঞ্চলিক অনেক ভাষার বর্ণমালা ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে, মরে যাচ্ছে প্রাচীন ভাষাগুলো।
ভিন্ন কোনো ভাষার বর্ণমালা দিয়ে বিশেষ কোনো ভাষা লিখতে গেলে কী বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার উদাহরণ পাওয়া যাবে বলিভিয়ার ভাষা থেকে। বলিভিয়ার মানুষঅতীতে কথা বলতো দুটি ভাষায়হয় আয়মারা’, নয়তো কুয়োছুয়া। তেল ও সিসারআকর্ষণে যখন স্প্যানিশরা দলে দলে ঢুকে পড়লো বলিভিয়ায়, তখন দেখা দিল ভয়ঙ্কর ভাষা-বিপর্যয়। স্প্যানিশ ভাষায় লেখা শুরু হলো বলিভিয়ার মানুষদের মনের ভাবব্যবহৃত হলো স্প্যানিশ বর্ণমালা। কয়েক বছরের মধ্যে স্প্যানিশ, আয়মারা ওকয়োছুয়া ভাষার মিশ্রণে সৃষ্টি হলো অদ্ভুত এক জগাখিচুড়ি ভাষা।
এ প্রেক্ষাপটেই তাৎপর্যময় হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ইউনেস্কো, জাতিসংঘ এমনকি তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ এ প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। তাহলেই এই দিবস পালন হতে পারে অর্থবহ। পৃথিবীর শত শত ভাষার মতো বাংলা ভাষাও আজ আসন্ন এক বিপন্নতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

মোবাইল আর ইন্টারনেটের-এর মাধ্যমে ভাষাকে যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে, যেভাবে টিভিতে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার করাহচ্ছে, তাতে কোন দিন না আমরাও হারিয়ে ফেলব আমাদের ভাষা। বাবু শ্রেণী বাংলার পরিবর্তে ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে   প্রতি। ঔপনিবেশিক মানসিকতা এই এলিটদের ভাষাবোধ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কারণেই দোকানের বাংলা নাম ইংরেজিতে লেখা হয়, নিমন্ত্রণ পত্র লেখা হয় ইংরেজিতে। আইন প্রণয়নে যদি বিদেশি ভাষা চলতেই থাকে, তাহলে মাতৃভাষা টিকে থাকবে কীভাবে ? রোগী ইংরেজি না জানলেও, ডাক্তার  ব্যবস্থাপত্র ইংরেজিতে লিখবেনই, গ্রাহকের ইংরেজি জ্ঞান থাকুক আর না থাকুক ব্যাংক-বীমার কাগজপত্র ইংরেজিতে লেখা হবেই, বিপনী বিতানের পরিবর্তে আমরা খুঁজবো শপিং মল, আদর্শ শহরের পরিবর্তে জায়গা খুঁজবো মডেল টাউন বা এনক্লেভে।

সাম্রাজ্যবাদি পুঁজিই প্রধান অন্তরায় তৃতীয় বিশ্বের ভাষাগুলোর টিকে থাকার প্রশ্নে। ভাষা আগ্রাসনের দাপটে পৃথিবীর অনেক ভাষার মতো বাংলা ভাষার অবস্থাও আজ ভালো নয়। ভয়াবহ দুরবস্থার শিকার সমস্ত আদি নৃগোষ্ঠীর ভাষাও । কেন্দ্রের দাপটে প্রান্তের মানুষদের মতো প্রান্তের ভাষারও আজ ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কেন্দ্রলাঞ্ছিত প্রান্তের জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর উন্নয়নের পরিবর্তে লক্ষ করা যায় কেবলই বিপন্নতা, শুধুই অবহেলা । প্রান্তিক মানুষদের মাতৃভাষা রক্ষা করার জন্যে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। চারদিকেই একটা গা-ছাড়া ভাব দেখে মনে হয় এ বিষয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই । এ অবস্থার আশু পরিবর্তন দরকার।

এই বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য, অনেক কিছুই আমাদের করণীয়, হতে পারে। তবে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন সমাজ-ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা। কেননা, অর্থনৈতিকস্বাধীনতা ব্যতীত ভাষার স্বাধীনতা রক্ষা পেতে পারে না । আমরা কোনো ভাষারই বিরোধী নই, তবে মাতৃভাষাকে উপেক্ষাকরে বিদেশি ভাষা চর্চা যে সুস্থ চেতনার লক্ষণ নয়, একথা সবার উপলব্ধি করা দরকার । মাতৃভাষা রক্ষাকল্পে আন্দোলন সংগঠিত না হলে, আগামী দিনে, বিশ্বায়নের আগ্রাসনে এবং ইংরেজি আর হিন্দি ভাষার আগ্রাসনে আমাদের মাতৃভাষা নির্মম পরিণতির শিকার হতে বাধ্য।

একদা কবিবিষ্ণু দে বলেছিলেন—'তুমি শুধু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'? কেবল ২১শে ফ্রেব্রুয়ারিতেই তুমি আসবে, তারপর ডুব-সাঁতারে গোটা বছরটা কাটিয়ে দেবে? একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের পিছনের ইতিহাস কম-বেশি সকল বাঙ্গালিরই জানা আছে, অন্তত যারা এসব নিয়ে চর্চা করেন। ১৯৫২ সালে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ২১শে ফেব্রুয়ারিতে চূড়ান্ত আকার নেয়। এই ঘটনার ৪৮ বছর পর  ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করায় এই ভাষা আন্দোলন পৃথিবীর জাতিস্বত্তাগুলোর অধিকারে রূপান্তরিত হয়েছে।  পৃথিবীর সব দেশে কিনা জানা নেই, তবে অনেক দেশেই ২০০০ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। আজ একথা অবশ্য স্বীকার্য যে, বাঙালি জাতির জীবনে এমন গৌরবোজ্জ্বল অর্জন আর কখনো ঘটেনি। ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা এখন আমাদের অহঙ্কার। পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার মাতৃভাষা নিয়ে নতুন সম্ভাবনার উৎস হয়ে উঠতে পারে এই দিবসটি, এমনি প্রত্যাশা ছিল আমাদের।

এটা সর্বজনবিদিত যে, ভাষা সৃষ্টির পেছনে প্রতিটি জনসমষ্টির মধ্যে অবস্থানকারী সকলের সম্মিলিত প্রায়াস কার্যকরী থাকে। আর সুদূর অতীতে, বেঁচে থাকার এবং জীবনযাত্রা আরো উন্নত করার সামাজিক তাগিদ তথা প্রয়োজনীয়তা থেকেই ভাষার উদ্ভব হয়েছে, একথা বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখেনা। উৎপাদন ব্যবস্থার যৌথ প্রয়াস মানুষকে ভাব বিনিময়ে বাধ্য করেছে। আর সেই প্রচেষ্ঠারই ফলশ্রুতি হচ্ছে সেই সেই জনগোষ্ঠির নিজস্ব ভাষা। এমনও দেখা গেছে, এক একটা পরিবারে তাদের নিজস্ব ভাষা প্রচলিত ছিলো। একটা পরিবার নিয়েই সেখানে একটা গ্রাম গড়ে উঠত। তারা যৌথ চাষ আবাদ করত। এসবের চিহ্ন এখনো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এমন যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিটি জনগোষ্ঠিতেই কোন না কোন সময়ে বিদ্যমান ছিল। তারপর এক বা একাধিক গ্রাম একটা গোত্রে অঙ্গীভূত হতে থাকলো। এই গোত্র বলতে যা বুঝায়, তাকে কিন্তু ইংরাজ সাহেবরা ট্রাইব বলেই চিহ্নিত করে । আর আইরিশদের গোত্রকে ওরা বলে ক্ল্যান। যাইহোক, এই গোত্র বা ট্রাইবগুলো উৎপাদন ব্যবস্থার অগ্রগতিতে নিজেদের ভাষায় অনেক সংযোজন ঘটায় । তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক জীবন, সাংস্কৃতিক জীবন আর প্রয়োজনীয় সামাজিক আচার আচরণ তথা নিয়মাবলী আর ভাষা একে অপরের পরিপূরক হয়ে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু আগের সে যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা একসময় আর রইলো না। তখন এসে গেলো যার যার জমিতে যার যার আলাদা উৎপাদন ব্যবস্থা। গড়ে উঠতে থাকল তাদের নিজস্ব ভাষা, যদিও তা অন্যান্য সবকিছুর মতই, সব সময়েই চলিষ্ণু। এটা মনে রাখতে হবে সব স্থানেই কিন্তু একসময়ে এই গোত্র বা ট্রাইবগুলো গড়ে উঠেনি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক তথা ভৌগোলিক তারতম্যের কারণে, বিভিন্ন সময়ে এসবের আলাদা আলাদা অগ্রগতি ঘটেছে। আবার স্থানান্তরও ঘটেছে। ফলে এখনো বিভিন্ন গোত্র বা ট্রাইবগুলোর মধ্যে বিচার করে দেখলে, তাদের অগ্রগতির ধারার পার্থক্য দেখা যায়।

গোত্র বা ট্রাইবগুলোতে তাদের ভাষায় নিজস্বতা চুড়ান্ত আকার নেয়। আর ঠিক তখনই উৎপাদনের অগ্রগতির কারণে, সামাজিক প্রয়োজনীয়তা তথা তাগিদ থেকে এক বা একাধিক গোত্র বা ট্রাইব জাতিতে উন্নীত হতে থাকে। জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় ক্ল্যানের ভাষাগুলো নিয়ে মিলেমিশে আরেকটা নূতন ভাষা তৈরি হয়। কিন্তু তখনও ট্রাইবের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে সেই ট্রাইবেল ভাষায় ভাব বিনিময় করে, যখন তারা তাদের বাড়িতে, বা নিজস্ব কাজকর্মে মিলিত থাকে। কিন্তু হাটে বন্দরে, রাস্তাঘাটে তারা জাতীয় ভাষাতেই কথা বলে। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় উপর-নীচে দুটো ভাষাই চালু থাকে। অন্য ট্রাইব তথা গোত্র তথা ক্ল্যানের সাথে রাস্তা-ঘাটে, বাজারে-বন্দরে বা অফিস-আদালতে যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষাই সেই জাতির জাতীয় ভাষা। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চলতে থাকে। ট্রাইবের ভাষা তখন উপভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়। কখনও ঘটে যায় আত্তীকরণ, কখনো কখনো দেখা যায় একটা বা একাধিক ট্রাইব যখন জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় আছে, ঠিক তখনই, রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতির চাপে, সেই জাতি গঠনের প্রক্রিয়া আর চুড়ান্ত আকার নিতে পারেনা। উদাহরণের জন্যে বেশি দূরে যাবার প্রয়োজন নেই। চাকমা জনগোষ্ঠির মানুষেরা এখনো ট্রাইবেলই রয়ে গেছে। অথচ, তার জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় চুড়ান্ত আকার নিতে যাওয়ার আগেই, বিধ্বস্ত অবস্থায় চলে এসছে। তাদের নিজস্ব ভাষায় তারা, এমনকি নিজস্ব লিপির পর্যন্ত উদ্ভাবন করে ফেলেছিল।
ট্রাইব তথা গোত্র তথা ক্ল্যানের যেমন কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট থাকে, তেমনই প্রতিটি জাতিরও কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট থাকে। জাতির বৈশিষ্টগুলো হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাস, নিজস্ব অর্থনৈতিক জীবন ধারা, নিজস্ব সাংস্কৃতিক জীবন আর নিজস্ব ভাষা। মানব গোষ্ঠীর উৎপাদন কাজকর্মের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও বিকশিত হয়। ভাষা তার মূল শব্দ ভাণ্ডারকে বাড়িয়ে তোলে, ধীরে ধীরে তাকে পরিবর্তিত করে এবং ধীরে ধীরে তাদের ব্যাকরণকেও সংশোধিত করে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীতে যেমন বিভিন্ন ভাষার বিকাশ ঘটে, তেমনি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গেও তার বিকাশ ঘটে। এইভাবে একসাথে যাত্রা শুরু করে বিভিন্ন ভাষা বিভিন্ন পথে ছড়িয়ে পড়ে। পারস্পরিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে, এক ভাষা আরেক ভাষাকে বদলেও দেয় এবং পুরানো ভাষাগুলির সমন্বয়ে নূতন নূতন ভাষার সৃষ্টিও হয়। কোন জনগোষ্ঠী যখন অপর জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন করে, তখন নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাষার বিকাশ ব্যাহত হয়। আবার এক জনগোষ্ঠী যখন অপর জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে ফেলে, তখন তাদের ভাষাকেও ধ্বংস করে ফেলতে পারে।

মাতৃভাষা নিয়েও একটা সংশয় সমাজে বিদ্যমান। মাতৃভাষা কি আমাদের জন্মদাত্রী মায়ের কথ্য ভাষা নাকি আমাদের জাতীয় ভাষা অথবা যার যার ক্ল্যানের তথা গোত্রের ভাষা সেই প্রশ্ন এখনো পরিষ্কার নয়।ভাষা বলতে বোঝাতে পারে মাতৃভূমির ভাষা। আর মাতৃভূমি বলতে বোঝায় কোন জাতির ভৌগোলিক স্থান। একটি শিশুর পিতা যদি ফরাসী ও মা যদি বাঙালি হয়, আর দুজনে যদি দুটো ভাষাতেই সন্তানের সাথে কথা বলে তাহলে সেই শিশু সন্তানটি দুটো ভাষাই শিখে নেবে অতি সহজেই। তখান তার মাতৃভাষা কোনটা হবে। আর যখন একটি শিশু মায়ের কাছে না থেকে অন্য কোন প্রতিপালিকা বা প্রতিপালকের তত্ত্বাবধানে বা সাহ্নিধ্যে বেড়ে উঠে, তখন দেখা যাবে, শিশুটির মায়ের ভাষা যাই হোক না কেন, সে তার প্রতিপালক বা প্রতিপালিকার ভাষাই আত্মস্থ করে নিয়েছে। আবার, একজন বাঙ্গালী মা কোন প্রদেশ থেকে বাসস্থান পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে গিয়ে, একমাত্র সেই স্থানের ভাষায় শিশুর সাথে কথা বলে, তখনও কিন্তু শিশু সেই স্থানীয় ভাষাই শিখে যাবে। এমনটা কোলকাতায় হামেশাই দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে প্রদেশ থেকে উঠে আসা মা বাবা কোলকাতার স্থানীয় ভাষাতেই কথা বলতে দেখা যায়। অথচ মায়ের মাতৃভাষা কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সেই প্রাদেশিক ভাষাই।

তাই সব দিক বিচার করে মাতৃভাষা শব্দটির যথাযথ অর্থ বুঝে উঠা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভাষা বলতে জাতির ভাষাকেই বোঝায়।

কোন শব্দ সময়োপযোগী না হলে তার স্থানে সঠিক অর্থবহ একটি নূতন শব্দ দিয়ে তা প্রতিস্থাপিত করা যেতেই পারে। আবার এমনও দেখা যায়, প্রয়োজন তথা পরিস্থিতির তাগিদে, নূতন নূতন শব্দ অনবরত সব ভাষাতেই স্থান করে নিচ্ছে। তবে এটা স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে, অবদমিত জনগোষ্ঠীর ভাষায় অবদমনকারি জনগোষ্ঠীর ভাষা ঢুকে পড়ছে বেশি। ইংরেজরা আমাদের দেশে রাজত্ব করার সুবাদে, আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে তাদের ভাষা। ফলে জীবনযাত্রায় তাদের ভাষা না শিখে উপায় নেই। চলতে গিয়ে প্রয়োজন হচ্ছে ইংরাজি ভাষা শিখে নেবার। ইংরেজ, ফরাসি ও জার্মানেরা পৃথিবীর নানা দেশে সাম্রাজ্য বিস্তার করে রাখার ফলে, পৃথিবীর সুবৃহৎ অঞ্চলেই এইসব ভাষা স্থায়িভাবে ঢুকে পড়েছে। যেমন স্পেন বলিভিয়াতে তাদের বর্ণমালা চাপিয়ে দিতে বাধ্য করেছে। এমন অনেক উদাহরনই রয়েছে। আবার পাশাপাশি অবস্থানে থাকা জাতিগুলির মধ্যেও ভাষার অবদমন তথা আধিপত্য ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। যেমন ভারতে হিন্দি ভাষা রাষ্ট্র ভাষা করা হয়েছে। অথচ হিন্দি ভাষা শুধুমাত্র গো-বলয়ের ভাষা। গোবলয়ের জনগোষ্ঠী ভারতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকায়ই তা সম্ভব হচ্ছে। প্রচার যন্ত্রকে ঢালাও হারে ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের ভাষাকে চাপিয়ে দিতে।

কোন জাতির পরিচয়ে যেমন ভৌগোলিক স্থান একটা শর্ত, ঠিক তেমনি সেই জাতির নিজস্ব ভাষাও একটা শর্ত। তাই কোন জাতির পরিচয়ের প্রশ্নে ভাষাকে ঠিকে রাখতেই হবে। নাহলে সেই জাতি ইতিহাসের বস্তু হিসেবেই স্থান করে নিতে বাধ্য হবে। হারিয়ে যাবে তার অস্তিত্ব।


About