এই সংখ্যায় ২৬টি কবিতা লিখেছেন – নাজনীন খলিল, অব্যয় অনিন্দ্য, কচি রেজা, ইন্দিরা দাশ, সৌমিত্র চক্রবর্তী,শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, তপন মন্ডল, মমতা দাস, সুধাংশু চক্রবর্তী, ইন্দ্রজিৎ মাজি, অনুপম দাশশর্মা, শিবলী শাহেদ, অনুপ দত্ত, মতীন বৈরাগী, সোনালী বেগম, পিনাকীপ্রসাদ চক্রবর্তী, শঙ্কর দেবনাথ, সুজাতা ঘোষ, কিংশুক ভট্টাচার্য, সুমিত্রা পাল, স্রোতস্বিনী চট্টোপাধ্যায়, সোনালী মিত্র, বুবাই চক্রবর্তী, ভাস্কর গুপ্ত ও মনোজিৎ কুমার দাস
পরিসর

তুমি মেঘমল্লার হতে চেয়েছিলে
;অথচ বর্ষা তোমার প্রিয় ঋতু ছিলনা ।
তোমার কড়ে আঙ্গুলে এই প্রবল সত্য  বারবার  ফুটে উঠেছে
আর  তুমি লুকিয়ে ফেলেছো তোমার আঙ্গুল , নখরসুদ্ধ ।
তারও বহু আগে
আমি ছুঁয়ে ফেলেছি তোমার হাত
বিষনখ
এবং
আগুন।

পুড়ছে অথবা বিষিত .........


মেঝেতে পড়ে থাকা  আপাতঃনিরীহ পোকাটাই
একদিন কিলবিলে শরীর বেয়ে ঠিক পৌঁছে যাবে
মগজের প্রগাঢ়প্রকোষ্ঠে ।
নীলব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে তুমি ছুঁতে চাইবে এক বিষন্ন বরফ।

একদিন তুমি ঠিকই জানবে
আকাশ এক প্রখর হাহাকারের শূন্যশব্দ ছাড়া আর কিছু নয়..........




পাসওয়ার্ড


ভালবাসার দৌড়ে চাতক আর এখন জিততে পারে না। খরগোশ লুটেপুটে নেবার পর কচ্ছপও কিছু পেতে পারে, কিন্তু চাতক নৈব নৈব চ।

টেরামাইল গতির খরগোশগুলোর কাছে সব আপেল, টমেটো মাইক্রোসেকেন্ডেই লাউ হয়ে যাচ্ছে - কোন কূটনৈতিক চুক্তিই থামাতে পারছে না বিবর্তন।

আখের ছিবড়া নিয়ে আমি কী করব - 
দোহাই তোমার - ঈশ্বরের সফটওয়্যার হ্যাক করে সব আপেলে পাসওয়ার্ড দিয়ে দাও।


মাছের আঙুল 

এক

মাছের আঙুল
অপেক্ষা এমন এক শিস যা কখনও বাজে না
 দু' একটি নীল ট্রেন তবু আসে
কেউ বিদায় নিলে কিছুক্ষণ থমকে থাকে ছাতিমের ঘ্রাণ 

দুই

যখন গলিতে বেড়ালের চিৎকার
 চাঁদভেজা রাস্তায়  ছুটে  যাচ্ছে   এম্বুলেন্স
ভরসাহীন  খাবি খাচ্ছে  আমার চোখ

জ্বরের আগে  যেমন খাবি খায় মাছের আঙুল
পাগলি রে

এক দৌড়ে হবেই পার..কাঁঠালতলা পুকুরপাড়
পেরিয়ে আগে এগিয়ে গেলে বছর তিনের বড়
কেঁদেকেটেই একশেষ, তার গোঁসা ঘোরতর। 

পাগলি,
বেশ, ইচ্ছে হারাই হারবো
নাহয় তুইই এগিয়ে থাকলি।

চৈ দুপুরে সর্ষেক্ষেত, স্কুল পালালেও সইবে বেত
হারিয়ে সোনার নাকছাবিটা, ভেবেই সারা কন্যে
সাঁঝ আগে তো খুঁজেই দিলাম, হয়ে রে মেয়ে হন্যে।

পাগলি,
অবাক সে সব দিনের কথা
কই বা মনে রাখলি!

গায়ে হলুদ তত্বসাজ, দস্যি মেয়ে আজ সলাজ
তোর পিঁড়েখান ঘুরিয়ে নিতে পরাণ এলোমেলো
হোমের ধোঁয়ায় বোধহয় আমার চোখ ভরে জল এলো। 

পাগলি,
দ্বিরাগমন ফিরতি পথে
কোথায় ফিরে ডাকলি?

আজ যে এত যুগের পর, রূপো চুলে বাপের ঘর
হঠাৎ কেন পড়ল মনে পাতা ঝরার খেলায়! 
ছিলে কোথায়শুধোস না রে, এমন বিহান বেলায়।

পাগলি,
মনের কথা কওয়ার সময়

কাছে কোথায় থাকলি।
ফাঁন্দে পইড়া কান্দে বগা

বছর ঘোরে, ঘুরবেই জানা দুগ্ধপোষ্যেরও
দ্বিপদ মাথা ঠোকে অন্ধ দেওয়ালে-
ঠুকবেই, জানা পাহাড় ও সমুদ্রের:
অথচ অম্বুজা সিমেন্টের চেয়েও শক্ত প্রাচীর
অটুট, নির্বিকার।

দেখতে দেখতেই এক বছর শেষ
আর এতদিনে হঠাৎ এক সদ্য কুঁড়ির ভোরে
কাঁচা ঘুম ভেঙে অকালে পক্ককেশ
হাট্টাকাট্টা সাজোয়ান রাজামশায়ের
নিমপাতা চেবানো জিভে মনে পড়ে গেল
জরুরী অবস্থার গুলির শব্দ!

মন্ত্রীমন্ডল বড়ই বিপদে,
আগেকার রামরাজত্বের সুখ উধাও
পেছনে সদা কাঠি দেয় বজ্জাত গণতন্ত্র,
একটু আধটু স্বজনপ্রীতি কিম্বা
সার্টিফিকেটের জালজোচ্চুরি অথবা...
অথবা ... অথবা ...
বাছতে গেলে কম্বলই উজাড়!
এত ত্যাগস্বীকারের দাম সামান্য রূপোলী টাকায়
আশ্চর্য, সেখানে কিসের ভুল!

তবু চাঁদ ওঠে, তবু আষাঢ়ের মেঘ অকারণে
ঢাকা দিয়ে চাঁদের শ্লীলতাহানি করে,
রাজার স্বাস্থ্যবান ছাতি আর হৃষ্টপুষ্ট
চওড়া কবজি দেখেও কোনেকাঞ্চিতে
ফিসফিস অকারণেই চলে,
অচ্ছে দিন এখনো এলোনা!

বারবার রাবণ সন্ত ছদ্মবেশে দরজায়
এলেই কি মায়াগাছ আপনি গজায়
অন্ধকার কুঁড়ের ঝাপসা স্যাঁতসেঁতে ছায়ায়!
বারবার বোকা হয় আমজন রাজমহিমায়...

তারপর ...
তারপর ...
তার আর কোনো আগে নেই, পিছে নেই
দিনাতিপাত অসহ হয় নিত্য উর্দ্ধগ্রাফে,
ফাঁস জড়িয়ে শক্ত হয়ে গলায় বসলে
চোখ শুকনো হয় আপনিই
জিভ বাইরে এসে সূর্যের আলো দেখে:
কোটির সিংহাসনে বসে মহিম রাজা
জরুরী অবস্থার গল্প শোনায়

গল্প শোনায় অচ্ছে দিনের।
তিস্তা’কে আমন্ত্রণ

 মেঘের বুকে ঢেউ উঠেছে
রোদের চোখে জল,
আঁচল ভেজায় গাছ-গাছালি
তিস্তা ছলাৎ-ছল ।

ভিজছে চড়াই, ভিজছে শালিক
টাপুর-টুপুর গান,
তিস্তা তোর বুকে দিলাম
আনন্দ সাম্পান ।

মেঘমুলুকে ছুটির মেজাজ
দিনবদলের খেলা,
চল না তিস্তা পালিয়ে যাই
এক্ষুনি, এই বেলা ।

আমার বুকেও জলতরঙ্গ
তোর উজানের মত,
এমন মাতাল শাওন বেলায়
থাকে কি সংযত !

ঝর ঝর ঝর অঝোর ধারায়
জীবন ভেসে যায়,
আয় না তিস্তা, এমন দিনে
আমার হবি আয় ।


বৃষ্টিদিনে

আর ভিজবো না বললেও বৃষ্টি হয়
জানালার কাঁচের ওপারে
নাইটল্যাম্পের আলোর অস্পষ্ট দৃষ্টি
ভাসিয়ে দেয় নদী নালা বাতায়ন

এবার আঁচল ঢাকো প্রিয়তমা

আমি আর বৃষ্টিতে ভিজবো না
সুদূরের পিয়াসী মন 

মাধবীলতার গায়ে ফোটা ফোটা বৃষ্টি
ঝরে পড়ে অবিরাম
ঝম্‌ ঝম্‌
শব্দ তোলে সাহাদের টিনের চাল
বাতাস মাতাল
হয়ে হয় পথভুলো
পাঁপড়িও ঝরে পড়ে ছিলো যতগুলো
তারপর সব চুপচাপ
হয়ে আসে আরও একধাপ ।
আমিও বিবশ হয়ে বসে থাকি
জানালার ধারে,
মনপাখি ওড়াউড়ি করে
এখানে সেখানে ইচ্ছেডানায়
ভর করে ।

তবুও ক্লান্ত হয় শরীর,
অবসন্ন মন অস্থির
চঞ্চল চপল পায়ে
মেঠো পথ ধরে হেঁটে যেতে চায়
যদিও দিনগুলো থেকে যায় বাসি
আর রণক্লান্ত মনখানি থেকে

যায় সুদূরের পিয়াসী ।
ফেলে আসা দিন
              
হাহাকারের মত বাজে
ধুসর অতীত , আমার বিস্মৃত দিন ,
সব কি ভুলেছি ?
সেই উদ্বেলিত দিন-রাত , সেই ছেলেখেলা ,
কোথায় লুকিয়ে থাকে
স্মৃতিজলে ,অতলে বিলীন আমার ছেলেবেলা ?
মনের বিরাট প্রেক্ষাপটে
রেখে দেয় একটুকু  স্মৃতিময় ঋণ !
ঘুনপোকা বাসাবাঁধে ,কুরে খায়
চেতনার গভীর  প্রত্যয়।
প্রতিদিন  বড়  হই ,মনে  মনে ছোট হয়ে হয়ে,-----
দিকভ্রান্ত বর্তমানে বাঁচি ,
অতীতকে উপভোগ অবরে-সবরে , রয়েসয়ে।
জল-ভেজা চোখের নীচে স্মৃতির মাধুরী অমলিন ,
বার বার ছায়া-ডানা মেলে
ফিরে আসে কৈশোর-এর ভুলে যাওয়া  দিন !
বর্ষা চিত্র

ভেজা স্কুলকে কোনো রেনি ডে
দেওয়া হয়নি বলে
সে এক পুকুর কান্না নিয়ে

দেখে নিচ্ছে
কিভাবে হাঁসেরা ডানা থেকে
খুঁটে নিচ্ছে জীবন

শুকিয়ে আসা জারুলেরা
ঝরে পড়ছে
আত্মীয় স্বজনের মতো
মাটির নরম  স্নেহে
খামতি নেই গ্রহনের

গ্রহের ভেতরে
যে কষ্টের গ্রাম
তাকে কেউ আর ওজনের
মধ্যে রাখে না

বৃদ্ধকে চশমার নীর মুছে
মনে করতে হয়
পরিচিত মুখ
আটাত্তরের গল্প
মানে দমকা মেরে
অনেক স্রোতের  ঢুকে পড়া
আর সামনে পিছনে
ডাইনে বাঁয়ে শুধু বিরোধী পক্ষ


জল...
ক্লান্তি ও তুমি

কেননা পাহাড়ের মত ক্লান্তি জমাতে জানো ।
ব-দ্বীপের মত বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি -
তোমার চলমান ক্ষয়ের স্পর্ধায় ।
থেমে যাওয়া আদর্শ নয়, তাই কি -
নির্জলা উপবাসে বসিয়েছ বিশ্রাম ।
বিসর্জনের শোক নেমে এলে বিছানায়
তুমি ঘুম ছুঁড়ে দাও নাগরিক খোঁয়াড়ে ,
জাগরণ সামলে সেরে নাও শোকার্ত অবগাহন ।
নিরুপায় কর্তব্যের কোলাহলে মুখ গুঁজে -
নাগরিকত্ব পালনে তুমি দ্বিধাহীন প্রেমিকা ।
পার্কের যে ঝোপে বসন্ত চিরহরিৎ
অক্লান্ত ওখানেই জেগে থাকে আত্মহত্যা ।
দুর্নিবার বৃক্ষের অনুযোগে কান রেখো না
প্ররোচনা ছুঁড়ে দেওয়া সরীসৃপের জিভেই মগ্ন হও ।
নির্বিচারে চাগিয়ে তোলো ক্লান্ত স্নায়ু
অসুখের মুখে গুঁজে দাও ছেলে ভোলানো টফি
তারপর , রপ্ত কর আয়ুর্বেদিক মৃত্যু ।
শুধু সূর্যশোকে আমাকেই বলতে দিও -
হে দ্বীধাহীন স্তব্ধতা তুমি স্ফীত হও,

আমার গ্লানির বোঝা বেড়েছে ।।
খেলার ধূলো....

খেলাটা কোথায় ভালো খোলে
আমাদের হৃদয় সরোবরে না কী..
বিরুদ্ধতার নোংরা পরিসরে

রাস্তায় দেখা হলে জানতে চাও না?
'আছো কেমন? কাজকারবার ভালো তো?'
পিঠোপিঠি বাস অথচ পরিচিতির ফলকে
খোদাই 'প্রতিবেশী' বলার সু-অভ্যাস

সেও তো ছিল ভালোই
আরো ভালো হয় খেলার প্রতিদ্বন্দিতা
মর্যাদার মুকুট পরাজিতের হাতে পরে
তাহলে কাঁঠাল পাতায় লুকিয়ে পড়ে কেন
বন্ধুত্বের আঁঠা
মেঘ ঝ জমলে বৃষ্টি না চেয়ে কেন দৌড়ে
লুফে নাও হিংসের জমাট অন্ধকার?

পুরোনো খাতার পাতা ঘাঁটলে এখনও
উঠে আসে পরাধীনতার পচা গন্ধ
আজ যখন একটা কবিতায় দপ্ করে
জ্বলে ওঠে অলৌকিক ভালবাসা
দরকার কী কাঁটাতারে

বারুদ ঘষে দেবার
পাপঘর

আহ্ মাঝরাত, দুধ শরবত
তোর বক্ষেই খুব খুঁজবেন
সব ভুলচুক কাজ গড়বড়
তোর মনকেই আজ দুষবেন।

তুই হয়রান, তোর হাতযশ
দ্যাখ্ টিপটিপ এই গালটায়
খুব কম কম, নয় দিলখোশ
রোজ সাতরঙ ভোল পাল্টায়।

এই চিন্তায় সব অস্থির
নাই নিস্তার, কর্ হাতজোড়।
বীজ সঙ্গীত সেও জানছেই

তোর ঠোঁটটাই এক পাপঘর।

About