এই সংখ্যায় ২৫টি কবিতার লেখকসূচি - অমিতাভ দাশ, অভয় বর্মণ রায়,জয়ব্রত বিশ্বাস, জয়া চৌধুরী, মধুমিতা ভট্টাচার্য, সুবীর সরকার, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, অনিমেষ সিংহ, গোলাম মোর্শেদ চন্দন, সঞ্জয় সোম, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, দময়ন্তী দাশগুপ্ত, মধু ভট্টাচার্য, সুজাতা ঘোষ, শৈলেন্দ্রপ্রসাদ চৌধুরী মাণিক, সুমিত্রা পাল,  শিখা কর্মকার, ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী, কোয়েলি ঘোষ, জয়দেব বিশ্বাস, লিপিকা বিশ্বাস, মণিকাঞ্চন ঘোষ, চন্দনকুমার দাশ ও পলাশকুমার পাল ।

গোপন তব চরণ ফেলে

কে জাগে অন্তরালে ঝিনুকশুভ্রতা!
আশা ও অভিমান রাতের ইথারে
বৃষ্টি থেমে গেছে তবু ভেজা সব কথা
তোমারই প্রান্তরেখা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ওড়ে

ভিতরদেহলিময় অনাবিল আলো
টানটান ক্যানভাসে আঁকবো যে মুখ
অন্তরমোম যে প্রেমকে জ্বালালো
এঁকে নয়, -- ভেবে ভেবে রয়ে গেলো সুখ!

বিশ্বাসতুলি তুমি ঘুমিয়ে না জেগে?
অপূরণ রেখো না ও সরল চাওয়াকে
রঙ নিও আলো নিও শ্রাবণের মেঘে
তৃষ্ণা-ডুবিয়ে এঁকো আমার নদীকে

প্রতীতি দ্বিধায় মিশে মেঘ ঘনঘোর!
ফিরে পাবে বলে তবু আশা জেগে বসে...
খোলা সব জানালারা. খোলা সব দোর,
শ্রাবণগহন মোহে সে যদি বা আসে?


সনির্বন্ধ

একটা কবিতা লেখো না কবি
আমায় নিয়ে।
অক্ষরের সাথে অভিসারে যেতে-
আমার শাড়িতে
মাখিয়ে নিয়েছি আকাশের -
নিস্তব্ধ নীল রং।

একটা কবিতা লেখো না কবি
আমায় নিয়ে।
সূর্য্যের সাত রঙ থেকে
সকালের কাঞ্চন রোদ
গায়েতে মেখেছি-
শুধু তোমায় রাঙাবো বলে '
অস্তাচলের শেষ অস্তরাগ -
মেখেছি দুই গালে।

একটা কবিতা লেখো না কবি,
আমায় নিয়ে।
ধনুকি ভুরুর ভঙ্গিমা তুলে
চকিত চঞ্চল হরিনীর
অবাক চাহনী,
ত্বরিতে সচল হোক
তোমার লেখনী।
ঝরনা কে বলেছি, ' আমার হাসিতে এসো '
জল প্রপাতের সুরে হাসতে,
বসন্ত দূত যেনো কন্ঠে বসতি করে,
পারি যেনো সবে ভালোবাস তে।
তোমার লেখনীর গুনে,
এ মাটির ধুলি কনা নর-নারী
গাছ - পাতা
আমায় নিক চিনে।

একটা কবিতা লেখোনা কবি,
আমায় নিয়ে।


আগমনী বার্তা

আহ্নিকগতির আলোছায়া ডুবিয়ে রাখি চেতনার স্থির জলে
কক্ষপথে ভাসিয়ে রাখি ভেলা তুলে ধ'রে সাদা পাল হাওয়ায়
গাছেরাও ঘুমিয়ে গেলে অতিপৃক্ত জলের বাস্পায়ন শেষে
অন্ধকারে সরাই লতাপাতা পাটকাঠি পাথরের ভার
তখন মিষ্টি এক গন্ধে নিষিক্ত হয় চেতনার শরীর
অন্ধকার অলিগলি বেয়ে ছুটে চলে সুরভিত এক আলো

আসবগন্ধে ভারী হাওয়ায় অপলাপ তোমার জিয়ন্ত জলসায়
পয়ঃপ্রণালীতে জ'মে আছে সুখ ভালো থাকার নির্যাস                      
নিরুদ্বিগ্ন মাছিদের ডানায় ডানায় ছড়িয়ে দিয়েছ ভাবনায় ভাইরাস
কাঠমেঘের ঝাপসা ছায়ায় সেই কবে থেকে মরে গেছে
.....................   তোমার বৃষ্টির প্রার্থনা

ভারাক্রান্ত সব কটু গন্ধের আবরণ খুলে দাঁড়াও ফলন্ত উর্বরতায়
দ্যাখো সুরভিত সেই আলো তোমার সব অলিগলি  বেয়ে
..................... অবলীলায় খুঁজে নেবে রাঙা রোদ্দুরের আবাহন ।


মানডেন

রোজই বলো তুমি নাকি মানডেন, তুমি না কি সামান্য...
আমি ঠিক ভেবে দেখেছি জানো...
গতকালও রেগে গেলে যেমনটি গম্ভীর হয়ে যেতে
আজ তার চেয়ে ভঙ্গী অন্যরকম
আজ তুমি আর একটু বেশি আমার ভেতর
গতকাল তুমি যেমনটি চুমো খেয়েছিলে
আজ আমি দেখি আর একটু গভীরতর
গতকালও তুমি যে কথায় তর্ক জুড়তে
আজ তুমি কেমন আর এক পোঁচ স্থৈর্য সহ
গতকালও তুমি যেমনি বেহিসেবী
আজকে তোমার বোকামি গাঢ়তর
স্বপ্ন দেখে ঘেমে জবজবে উঠে বসে ভাবি
কাল তোমাকে কেমন রঙে পাবো...
কাল তোমাকে কেমন প্রেমে ভাসাব...
কাল তোমাকে কেমন মেঘে কাঁদাব...
এমনি যদি নতুন তুমি রোজ
এমনি করেই মানডেন হয়ে থেকো
গতকাল আজ এবং আগামীকালও।



দেওয়াল

ঘর এক, দেওয়াল তো চার,

কান আছে, বোবা মুখ, বলতে লাচার।

সাক্ষী হয়, সাদা চোখ, কথা জমে বুকে,

ইতিহাস সিঁদ কাটে ইঁটের চিবুকে

ভালবাসা, প্রেম, খুনসুটি, মনব্যথা

চারটি দেওয়াল জানে গৃহস্থের কথা।


থাবা



জানলা খোলা রাখলেই চকোয়াখেতির

                      রাস্তা

রাত্রির এক নিজস্ব নির্জনতা থাকে

কী কী দৃশ্য দ্যাখো তুমি!

দুরপাল্লার বাস এসে থামে

তারপর জোড়া বাঘের থাবা


একটি মহাপুরুষের জন্ম

সেও জন্মেছিল এভাবেই
তোমার মত, আমার মত
মায়ের শরীর দুমড়ে-মুচড়ে, ভেঙ্গেচুরে
হাড়মজ্জ্বা নিংড়ে, পড়েছিল মাটিতে...
যে মাকে সে ত্যাগ করেছিল স্বেচ্ছায়
সেও বেড়ে উঠেছিল সেভাবেই
একজন রাজার ছেলের মত
ঘোড়ায় চড়ে, শিকার করে
পুরললনা দের সঙ্গে নৃত্য করে...
যে রাজপুরী সে ত্যাগ করেছিল স্বেচ্ছায়
সেও পিতা হয়েছিল এভাবেই
রাজকন্যাকে গ্রহণ করে, ভালবেসে
তার কামনায় মদির হয়ে...
যে স্ত্রী-পুত্রকে সে ত্যাগ করেছিল স্বেচ্ছায়
পিছনে পড়েছিল রাজপথ
কিছু মানুষের কান্না
কিন্তু সে থামে না......
তারপর?

তারপরের গল্প অন্যরকম--
জীর্ণ-শীর্ণ, অনাহার-উপবাসে ক্লিষ্ট সেই রাজার ছেলে
একদিন আলো দেখে,
আশার আলো, মুক্তির আলো 
যে আলো সে জগতকে দেখায়
ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এক মহামানব......


প্রস্তর স্তুপ

তুমি যখন জলস্রোত হয়ে বহে চলো
আমি ঝর্ণা আর নদীর কলকল শব্দ শুনি ।
আর তোমর রুপোলি ঝিলিকে বিমুগ্ধ
বিস্ময়ে তোমাকে দেখি
যখন তুমি ভালোবেসে একলা কাঁদো
বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে আমি তোমার
কন্ঠস্বর শুনি
বৃষ্টিস্নাত আমিও তখন অশ্রুপাত করি
অস্থির অনলে দাবদাহে জ্বলেপুড়ে মরি
প্রচন্ড ঢেউএ দুকুল ভাসিয়ে তোমাকেই খুঁজি ।

গোধুলির আঁধারে নীল জল
প্রশস্ত আকাশ ঢেকে যায়
আবারও ইশারায় ইঙ্গিতে আভাসে ডাকে
গুনগুন গুঞ্জরন বিচিত্র জীবন
ওচেনা অজানা সীমাহীন অতল গহ্বরে
বিষবাষ্পে ডুবে আছে পানামা নগর
হৃদয়ে নীল-কাপালি লালগির্দি
কেয়াহুলিয়া বিরানভূমির জীবাশ্ম
প্রস্তরীভূত প্রস্তর স্তুপ ।


হৃদয়ের নদীখানি

তোমাদের কারো মাথাব্যথা নেই !
আমি তো বসে আছি
আমার নদীর সাথে।
জল নেই।
তোমার নদীটি দিও
কখনো অবকাশে।

ডাঙার যন্ত্রনা বোঝে মহিরূহ ।

আমি বুঝিনা ।
তবু বসে থাকি ঠায়।
রোদ্দুর আসে চলে যায়,
ছায়া আসে চলে যায় !

আমার নদীটির পাশে
সন্ধ্যা নেমে আসে


ছড়াচ্ছে শব্দের গন্ধ

ছড়াচ্ছে শব্দের গন্ধ
ঝরে পড়া প্রাণের উঠোনে।
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, আলো, ধুলো খেলা
চেতনার স্নান
সমস্ত শোকের ঊর্ধে,কালি মাটি কান্নার নির্যাস
সব কিছু ।
ছোট খাটো পল হাসি উদাসীন ক্ষণ খুচরো বেলা
মনের পকেটে রাখি।
চূর্ন চুলে রাখি মেঘদূত।
পূর্বাভাস ভরে রাখি কপালের মন্দাক্রান্তা ভাঁজে
রূপোলি রংগের চুলে জীবনের ছন্দ লিখে রাখি
সুতো হাতে কুঁড়ি গাঁথা
ফুল রেনু সূচি শিল্প
অথবা জীবন


সুপ্রভাত

চোখ মোছা সকাল
বারুদের গন্ধে ম ম
রক্ত খেলা প্রতি মুহূর্তে
তুমি বলছ সুপ্রভাত !

আমি ও আমরা সুসময় খুঁজি
তোমার শুভেচ্ছায় ,
খুঁজে পাই গতকালের কান্না !
কাঁদছিল নিথর লাশের পরিজন ।

বিকেলটা ভালো হবে নিশ্চয়
আত্মশান্তনা দেই ,
গড়িয়ে যায় রাত ,অবশেষে
আরও একটা সকালের অপেক্ষা ,
আরও একটা সুপ্রভাত , শুভেচ্ছা ।




মৃত্যুদণ্ড

হত্যাকে হত্যাই বলি আমি

সে রাষ্ট্রই করুক অথবা মানুষ।

অন্ন আর শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল যার -

কথা ছিল দেবে আশ্রয় আর শ্রমের মূল্য।

তার বদলে মৃত্যু দেবে সে কোন অধিকারে?


প্রেম –ভালোবাসা ইত্যাদি

ছাইপাঁস ঘেঁটে হেদিয়ে মরছো কতো
ভেবেছো কখনও,
ছাইঢাকা ফুলকিরা সচকিত, কদাচিৎ
দাবানল হতে পারে???


আলোককে দ্যাখো,
দেয়াল তো ঘেরা থাকবেই
ধোঁয়াশা সরিয়ে নজর ছড়াও
আকাশের দ্যাখা পাবে।


পৃথিবীকে দ্যাখো,
কতো বিপত্তি পারিয়ে
আজও সেই গোল,
মজবুত দেহে সংহত!!


সমুদ্রকে দেখে থমকেগেলেতো
চলবেনা...
বাহু মজবুত করো যদি ভাই
টলবেনা।।


হাজেরো পোস্টার আর ব্যানারের
আবর্জনা হটিয়ে দেখছো
আকাশের ইন্দ্রধনুচ্ছটা???


শ্রাবণ -পথিক


শ্রাবণ শেষে খুঁজি শ্রাবণেরই মেঘ
এতটা পিয়াস আর কখনো পাইনি!
চাতক ডেকে যায় অবিরত এই রাতে
হলো না অভিসার এই শ্রাবণেও!

যে গিয়েছে চলে কোন্ অজানায়
তারে কেন ডাকি বারেবারে!
উদাস করে উদাস বাউলা বাতাস
আজ পথিক ভুলেছে পথিকতা!

আবার ভোর হবে পথিক চেয়েই থাকবে
অনন্ত শ্রাবণের বরষার আদ্রহৃদয়ে!
উদাস হৃদয় পথিক হতেই চায়
ফিরবে পথিক অন্তত সন্ধ্যায়!



দাদা থেকে ভগবান

আমি বিশ্ববিদ্যালয়
আমার বটবৃক্ষের নীচে প্রতি বছর কত শত ছেলেমেয়ে
আসে আর যায়।
এসেছিল ওরাও
আজ যারা নেই পৃথিবীর কোন কোনায়
মিশিয়ে দিয়েছে নিজেদের
ঐ দাদা থেকে ভগবানের পায়ে।
বাবা মায়ের ঘর আলো করবে বলে এসেছিল যারা
তারা আজ নেই, নেই কোনখানে নেই
শুধু আছে  স্মৃতি আর দাদা থেকে ভগবন
এ হল সমাজের ভয়ংকর এক ব্যাধি – “র‍্যাগিং
মায়েদের যত উজ্জ্বল ছেলেমেয়ে
আসে আমার এই বটবৃক্ষের নীচে শিখতে জীবনের জয়গান
ভুলে যায় মনুষ্যত্বের  রেওয়াজ আর নীতি।
হাসে অন্যরা আর হাসে ওরাও
এ হোল কেমন মজা বসে ভাবি আকলশিকর
শান্তি দেব নতুনদের, ভুলিয়ে দেব মা আর বাবাকে
হল কোথায়? ভুলে গেল সকল চাওয়া পাওয়া
আর ভুলে গেল আকাশ আর হাওয়া।
পড়ে রইল শুধু ইতিহাস আর অশ্রুধারা।



ছন্দহীন নিঃসর্গ...(খণ্ডখণ্ড মেঘ)

বুঝিয়ে দিয়েছি তারে বিন্দু থেকে ব্যাস কতটা দূরের
আকাশে মেঘ                বৃষ্টি সমান, এবং
                            ঝড় ও হাওয়া ।
গেরস্থলি, মাসিকের শ্রুশ্রূষার পুরাণ তেনা
পোয়াতি উষ্ণতা, জরায়ুর নামতা, সীমাহীনে পৌঁছানো
বিনয় দা'র ধূসর চোখের ছানিতে সীমাহীনতার 'সীমা'
                  'ঠাকুর নগর'
সে-কি অন্ধ আত্মার বসতি; হেলেনের পাঁচটি আঙুল
মিছিলের সমান বয়সী চেতনা, সম্ভ্রান্ত শাড়ীর ভাঁজে
তোমার রঙিন সংসার । ভিঞ্চির দিগবিজয়ী টানের-
                                        পট !
জীবন বাবুর মনসা মঙ্গল,ইতিহাস-পুরাণের ভূগোল
                            বর্ণিল অন্ধকার,ঘাস;
কবিতা, ব্যাকরণ শূষে নিয়ে জন্ম দেয় সুত্রহীন নিঃসর্গ
                      ট্রামের তলে রক্তাক্ত লাশ !



আশ্রয়  

কড়া নাড়ছে শীত, সঙ্গে উঁকি দিচ্ছে
স্মৃতি মোছার, ভুলে যাবার বয়স,
বইছে উন্মাদ বাতাস, ঘিরে ধরছে মেঘ |
ফিরে গেছে সবাই যে যার সংসারে,
আজ আমি হাতে নিয়ে শেষ চাবি
চিরচেনা দরজার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে |
ব্যাগ, বাক্স, বিছানা, টবের ফুলগাছ,
ঘরকুনো খাতা, বইগুলির পাশে  দমবন্ধ করে
অপেক্ষা করছে বিশাল ট্রাকের ভেতরে |

চলে যাবার আগের মুহূর্তে আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখছি,
তিরিশ বছর ধরে যে প্রিয় বাড়িটি  সুখে দুঃখে বুকে করে
আগলে রেখেছে আমাদের  সঙ্গেসাথে   তারও গায়ে
লেগেছে আঁচড়, কিছু বয়েসের, কিছু  ঋতুর,
কিছু বা টালমাটাল সম্পর্কের ঝড়  |

নিখুঁত লনের ঘাসে চাপা দুঃখ শিশি্রের ফোঁটার পাশে,
বার্চের ফাটা বাকলের গায়ে আজীবন লড়ে যাবার দা্‌গ,
একর্ণের ফল, পাইনের পাতাগুলি খসে পড়ে  মাথায়,
যেন শেষ আশীর্বাদ, ঘুরেফিরে আসে বুনো হরিনেরা,
আর্মাডিলো, কাঠবেড়ালি ও খরগোশের কেঁপে ওঠা রোম,
রঙিন পালক বুকে পাখী, গিরগিটি, ফড়িং ও লেডীবাগ,
অজান্তেই ওরাও কখন বুকের ছবিতে নিজস্ব হয়ে গেছে । 

আর মাটির ভেতরে শুয়ে থাকা আইরিসের শেকড়েরা
কিছু বলতে গিয়েও কি এক দ্বিধায়  আজ চুপ করে যায় |
বুকের মধ্যে  এমুহূর্তে কেন যে বারবার জেগে ওঠে
আবছা হয়ে আসা স্নেহ, নামসম্পর্কহীন  ভালবাসা,
জীবন জুড়ে থাকা সেই চেনা অথচ  গোত্রহীন বিষন্নতা |

কিছু কাঠ, রড,  সিমেন্ট, আর রঙে বানানো বাড়িটা
চিরটাকাল এক পৃথিবী স্বস্তি, শান্তি, নিরাপত্তা হয়ে
রয়ে গেছে জীবনে আমার, চায়নি কিছুই পরিবর্তে, 
আর আজ আমার কেবল ভেঙ্গে যাচ্ছে বুক,
এই এতোটা ভালবাসা সরিয়ে, বেহায়ার মতো
তাকে বিদায় জানাতে গিয়ে; কেন যে বার বার
স্মৃতির বারান্দায় জেগে উঠছে রেলিঙের ফ্রেমে
অপেক্ষায আনত মায়ের ঝাপসা হয়ে আসা মুখচ্ছবি।


কেউ কি ধরেছিল হাত?

কেউ কি ধরেছিল হাত?

বসন্ত বাতাসে,

        ভয় ছিল  খুব

পুনশ্চঃ ফিরতে হবে ঘরে।


মঙ্গল দ্বীপ জ্বেলেছিল ঘরে


সে যেন থাকে সুস্থ
         
          বিপদে, আপদে।



আশা-ভালোবাসা

জীবন তো কোন স্বপ্ন নয় ।
নয় তো কোন শূন্যে ওড়া ফানুস !
আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে ভরা
সুখ-দুঃখের দোলাচলে
বয়ে চলে এক জলছবি ।

শুধু প্রেক্ষাপট বদলে যায় -
চেনা মানুষও বদলে যায়,
স্বার্থপর এই পৃথিবীতে ।

জীবন তবুও চায় ভালোবাসা
একটু উষ্ণ পরশ,
আর সাথে চলার অঙ্গীকার ।


আগুনের মশাল


জটিলতার সংবাহক সমস্ত তন্ত্রীগুলিতে
এখন জলীয় সংবাদ
মাটির গভীরতায় সুপ্ত বীজগুলিতে
কাঙ্ক্ষিত অঙ্কুরোদ্গমের  খোলা আকাশ;
এক পশলা ঝমঝম বৃষ্টি-

উড়ন্ত সব দুরন্ত স্পৃহা 
শাল-পিয়ালের দৃপ্ত ঋজুতাকে অতিক্রম করে
সামাজিক অনুশাসনে বাঁধা পরে।

সম্ভাবনাময় মুহূর্তগুলির জন্য
আগুনের মশাল
জ্বালিয়ে রাখি সচেতনভাবে
প্রতিবন্ধিত মুহূর্তগুলিকে ভস্ম করে।

চোখের তারায়

 সেদিন ঝোড়ো হাওয়ায় ঐ চোখে পৃথিবী দেখেছিলাম
 আমি তখন হাজার আলোকবর্ষ দূরে ...

 স্বপ্নের ভিতরেও যে একটা গল্প থাকে-

 কয়েকটা উপত্যকা , দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে
 আমি বারবার হিমালয় জয় করেছি

 চুলের গন্ধে বাতাস পেরিয়ে গিয়েছিল কয়েকটা পাহাড় ।
 তারপর কাহিনী থেমে গিয়েছিল ,

 অবশেষে এল সে ত্রস্ত হরিণের মতো ,
 দৃঢ় সংকল্প তার -
 ভোরের আবছা আলোয় আবিষ্কার করলাম
 বহু যুগের প্রতীক্ষিত সেই প্রিয়তমার মুখ ।

 হাত কেঁপে উঠল , এ কি !
 ভালোবাসা উধাও এক মুহুর্তে ?

 ক্যানভাসে তাকিয়ে দেখি বিরাট আগ্নেয়াস্ত্র হাতে  অসুস্থ ঈশ্বর ।


দুখী মনের সূজন

দুখী মনের সূজন তুমি,
        নির্জ‍‍‍‍‌‌নতা-
তোমায় খুজেছি খুব ভোরে,
সহসা জেগে উঠে ঘুম জড়ানো চোখে ।
কি‌ন্তু দেখি তুমি নেই, চলে গেছ-
অনেক অনেক আলোক বর্ষ দূরে ।
নির্জনতা তুমি কোথায় ?
বেলা বাড়ে রাস্তায় যানজট ।
তোমায় ডাকি, তুমি কী আছো
           নির্জ‍‍‍‍‌‌নতা ?

চৈতী দুপুরে একা চলা ফুটপাতে
মনে মনে তোমার কামনা ,
রোদ ঝাঁ ঝাঁ, তবু স্তব্দ নয়
চারিপাশ ।
বিকেলের আকাশ দেখে
ছুটে যাই ছাদের কার্নিশে,
হাতড়ে ফিরি তোমায়
নেই, তুমি নেই; ভেসে আসে
পড়ন্ত বিকেলের ঘরে ফেরার
কোলাহল ।

ঝুপঝাপ নেমে আসে সন্ধ্যা ।
মনের কোনে জ্বেলে আকাশ প্রদীপ-
এসে দাঁড়াই ঝুল বারান্দায়
যদি তুমি দাও দেখা !
অবশেষে রাত বাড়ে অন্ধকারের হাত ধরে ।
ঘুমহীন চোখে, নিঃঝুম, নিরালায়,
সন্তর্পনে চেয়ে থাকি তোমার অপেক্ষায় ।
সঙ্গীহীন জীবনে তোমাকে যে আমার দরকার ।
তোমার সম্মুখে ফেলে দুফোঁটা অশ্রু
ভুলতে চাই, ক্ষণেকের তরে আমার জমানো কষ্ট ।
যা কেউ জানবে না-

শুধু তুমি শুনবে, দেখে পীড়িত হবে
‘‘কী ভাবে পৃথিবীর কদর্যতায় নিঃস্ব করেছে আমায়’’
আর,আর ভরিয়ে দেবে তোমার মাধুর্যতায় ।
আসলে তুমি মনেরই তো একখণ্ড সত্ত্বা ।
তুমি বন্ধু হয়ে প্রেয়ো হয়ে এসে ভাসিয়ে দেবে তোমার স্রোতে
এই আশায় করি তোমারে আহ্বান
নির্জনতা তুমি কোথায় ?




পরাধীনতা

প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ আস্বাদন করে
বেঁচে থাকে জীবজগৎ
বেঁচে থাকে জাগতিক সুখ-স্বপ্ন, আশা-ভালোবাসা।
গাঢ় সবুজের ভেতরই বেঁচে থাকার পূর্ণাঙ্গ তৃপ্তি,
অবারিত অনুভব; দোল খায় ভোরের শিশিরের ডগায় ।
বৃথা আস্ফালন আর না পাওয়ার যন্ত্রণা
প্রতিশোধের তীরকে আরো তীব্রতর বিষাক্ত করে তোলে
তবু প্রকৃতির সাথে প্রতিশোধের
অক্লান্ত আক্রোশ খাটে না।
নিয়তি যেখানে উন্মুখ
সেখানে সময়ের বাঁধ ভেঙে ডেকে নিয়ে যায় প্রকৃতি।
মৃত জীবন আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকে
পড়ে থাকে ডাস্টবিনের খালি ঘরে
যেখানে বসে শেয়াল শকুনে চেটে চেটে খায়
মৃত জীবের রক্ত-মাংসের দেহ।
জীবনের ঘূর্ণিআবর্তে ঘুরে ঘুরে
শেষে নিয়তির দোহাই দিয়ে
ফিরে যাই নিজেরি আপন ঠিকানায়
আর মনে মনে ভাবতে থাকি
আমি কখনো স্বতন্ত্র ছিলাম না;
এখনো নেই, আর ভবিষ্যতেও থাকবো না।


ক্ষুধার্ত থাকার অধিকার

হামাগুড়ি দিয়ে রাত প্রশারিত হয়
 নিশাচরের ডানায়
 সংশয়ী মানুষ ফিরে আসে রিক্ত হাতে
 অরক্ষিত কুঁড়েঘরে ।
 ন্যুজ দেহ বিছিয়ে অবসাদ ডাক দেয়
 পেটের ভিতর বুড়িছোঁয়া খেলা ।
 ঝাউবন থেকে ক্ষুধা জেগে ওঠে,
 নাড়ির ভিতর গুমগুম;
 উনুনে শূন্য হাঁড়িটার শূন্য আকাশে অনির্দেশ্য বোঝাপড়া ।
 তারপর ঢেউ আসে ক্ষুধার্ত থাকার অধিকার নিয়ে 
 তরঙ্গের ইশারায় সান্তনার ভাষা আওরাতে থাকে
 ছেলে খেলা করে হাঁ-মুখ অনীহা ঘোর ।
 তাই, 
 খোসা-খসানো পাকস্থলী সান্তনার ভাষা বোঝে না ।

About