'অন্যনিষাদ' ভাষাপ্রণাম  
     একুশে ২০১৬








'একটি দুটি মানুষ আজও 
আঁধারে গান গায় । এত আলোর মধ্যে আকাশ বাংলা ভাষায় ভরা
বুকের মধ্যে চলছে ছুটে সোনালি হরকরা' (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)


এই সংখ্যায় ৪০টি কবিতা । লিখেছেন - রত্নদীপা দে ঘোষ, অলক বিশ্বাস, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত্র চক্রবর্তী, রুদ্র গোস্বামী, অমিতাভ দাশ, চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য, শৌনক দত্ত, অনুপম দাশশর্মা, চয়ন ভৌমিক, কাজরী তিথি জামান, অরুণ সেনগুপ্ত, পার্থ বসু, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, তপন মন্ডল, শঙ্কর দেবনাথ, ব্রতী মুখোপাধ্যায়, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, মৌ দাশগুপ্তা, সতীশ বিশ্বাস, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, অসিত চট্টোপাধ্যায়, কৌশিকা চক্রবর্তী, নীলদীপ চক্রবর্তী, ওয়াহিদ জালাল, প্রবীর বিকাশ সরকার, কোয়েলি ঘোষ, জয়দেব বিশ্বাস, জয় ভাদুড়ী, লিপিকা বিশ্বাস সাহা, অভিলাষা দাশগুপ্ত আদক, চিরদীপ সরকার, সুদীপ বিশ্বাস ও পলাশ কুমার পাল ।

 সব কবিতা পড়ুন । সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন 


                                                

         ভাষার প্রতি মমত্ব অনুভব করতে হবে, হতে হবে শ্রদ্ধাশীল, রাখতে হবে অহংকার । এই ভালোবাসা ও ভালোবাসার আবেগটুকু না থাকলে ভাষা নিজের হয়ে ওঠে না । এপার বাংলার বাঙালির বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশের কাছেই বাংলা ভাষা তার নিজের হয়ে ওঠেনি আজও এটা বাস্তব সত্য । তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে নিজ মাতৃভাষার অনাত্মীয়তা বেড়েই চলেছে । ১৯৯৯সালের ১৭ই নভেম্বর  এই দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের আহ্বান জানানোর পর বিভিন্ন ভাষা ও সামাজিক সংগঠন এমনকি রাজনৈতিক সগঠনও ভাষা দিবস পালনে তৎপর হয়েছে - হওয়া উচিতও । কিন্তু সংশয় থাকে যাদের কাছে এই আহ্বান পৌছানো বেশি দরকার সেই তরুণ প্রজন্মকে মাতৃভাষা দিবসের আহবান কতটা ছুঁতে পারছে ? আজকের তরুণ প্রজন্মকে কি তাদের দৈনন্দিন জীবন চর্যায় মাতৃভাষা উচ্চারণের আবেগ কি ছুঁয়ে যাচ্ছে । না যাচ্ছে না তেমন, ভাবে বরং মাতৃভাষার সঙ্গে তাদের বিচ্ছিন্নতা বেড়েই চলেছে, এটাই বাস্তব । আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, প্রাত্যহিক জীবনের কথা-বার্তায়  মাতৃভাষার প্রয়োগ আরো বেশি করে করবো, আমাদের সন্তানদের মাতৃভাষার চর্চা ও অনুশীলনে উৎসাহিত করবো এটাই ভাষা দিবস পালনের তাৎপর্য, অন্য কিছুই নয় ।

         একুশে এলেই আর একটা দিনের কথা মনে পড়ে । ১৯৬১র ১৯শে মে । যে দিন মাতৃভাষার মর্যাদার দাবিতে বরাক উপত্যকার শিলচর ১১জন ভাষা শহিদের রক্তে স্নাত হয়েছিল । আমরা কজনই বা মনে রেখেছি ১৯শে মে দিনটিকে ? বরাক উপত্যকার সেই রক্তক্ষয়ী ভাষা সংগ্রাম জয়ী হয়েছিল, এগারো শহিদের রক্তের বিনিময়ে উপত্যকার কয়েক লক্ষ মানুষ মাতৃভাষাকে আঁকড়ে থাকতে পেরেছে । আসুন, একুশের ভাষাশহিদের সঙ্গে সমান শ্রদ্ধায় একষট্টির এগারো শহিদের স্মৃতিতর্পণ করি ।

         মাতৃভাষার সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশের ক্রম বিচ্ছিন্নতা আমাদের পীড়িত করে সত্য, আবার নবীন যারা সাহিত্যকর্মে যুক্ত তারা যে ভাষা আবেগেই বলীয়ান হচ্ছেন এটাও সত্য । এই 'ভাষাপ্রণাম' সংখ্যার চল্লিশটি কবিতায় সেই আবেগেরই ছায়াপাত ঘটেছে । ভাষা দিবসে অন্যনিষাদের আহবান - আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার প্রয়োগ বেশি করে করি আর উচ্চারণ করি

“বাংলা ভাষা আমি তোর নুন খাই নুন ...
গলাছেড়ে গান গাই প্রতি ভোরে-ভোরে
ভেতরে ভেতরে আমিও আগুন” (কবি বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতার পংক্তি)
ভাষা

ভাষা আসলে ঈশ্বরের লোক
মাথার ওপরের ছাদ
মাটির তৈরি গয়নাগাটি


ভাষার সিঁড়ি বেয়ে
আমরা একে একে দুই
দুই দু' গুণে চার পা
ওপরে উঠি
বন্ধুজন একসাথে
মেঘের থালায় চড়ুইভাতি


ঝাঁপ দিই আনন্দহরফে
না-পাওয়ার বরফগুলি
অন্ধকার পিঠগুলি
ঝরে যায় একে একে


ভাষা আসলে ঈশ্বরের লোক
ফুলে ফুলে ফুলে ওঠা
আমন শিষের গর্ব
বহুতল উদ্ভিদের বুকদুধ



একুশ বাংলা

আজ বাঙালির শাসন জারি
সকাল তুমি মুক্ত
দোর খুলে দাও
রক্তে লিখি একুশ ফেব্রুয়ারি।
বাতাস ভাঙে প্রভাতফেরি
বাতাসে গান গান
রক্তভেজা রাস্তা লেখে
মাতৃভাষা বাংলা আ-মরি।
শিমূল ফোটাই আকাশনীলে
পলাশ বাংলাময়
ফাগুন প্রেমে জয়
লিখে দেই ভাটিয়ালির জলে।
মিছিলের আমি

মাধ্বনির মায়া চিনতে খরচ করেছি প্রায় তেরো বসন্ত । খুব জেদী
ছিলাম । যা চাইতাম,তাই লাগবে আমার । চাইতাম অবশ্য অনেক
বুঝদার অঙ্কে,সাধ আর সাধ্যের ফারাক বুজিয়ে যেটুকু উচ্চারণ করা
যায় । বোধ বুদ্ধি জাগার পর থেকেই এই হিসেবটা খুন টনটনে ছিল ।
ভেবেই নিয়েছিলাম,এটুকু চাওয়া পূরণ করা কারো অসাধ্য নয় ।
সেটা বস্তুবিশ্বের কথা । প্রথম ঠোক্কর খেলাম ব্যক্তিবিশ্বের দরজায় ।
তারা আমার পেডিগ্রি দেখতে চাইলো । আমার জাত গোত্র বংশপরিচয়
 বাবার আয় গান জানি কিনা আঁকা কিম্বা নাচ, আমার মুখশ্রী চামড়ার রঙ
 গায়ের গন্ধ পোষাকের রুচি হাসির শব্দ হাঁটার ছন্দ পরীক্ষার নম্বর খাওয়ার
 পদ্ধতি চটুলতা বাকপটুত্ব আর যদি কোনো বিশেষ গুণ থাকে সেইথেকে
 আমি ক্রমাগত ফেল করে যাচ্ছিলাম । সেই থেকে আমি ঘুমের মধ্যে
সমুদ্র চিনে নিচ্ছিলাম আর অসীম শূণ্যতা । কাছের হয়ে উঠছিলো
অরণ্যের শ্যাওলা গায়ে স্যাঁতস্যাঁতে মাথা খুঁজে না পাওয়া গাছেরা,
মাদক গন্ধের ভেষজ,দূর পাহাড়ের নীল বাদামী কুয়াশা আর লম্বা
রাস্তার হারিয়ে যাওয়া । আমার বিশ্রামঘর থাকছিলো না । উষ্ণ কোণাকাঞ্চি
রংচটা পড়ার ঘরের দেওয়াল ভরা তারাদের ছবি, গল্পের বইগুলো,
রবিঠাকুরের গানগুলো,প্রেমের কবিতাগুলো আর আমার থাকছিলো না ।
দিনলিপির নুনেপোড়া পাতাগুলো,সস্তার চাইনিজ কলমগুলো,
অঙ্কের ফর্মূলা রসায়ণের কার্বন শৃঙ্খল জীববিজ্ঞানের ছবিগুলো ভিজে
যাচ্ছিলো যখনতখন । আমায় কেউ টেনে ধরছিলো না ভিতর দিকে ।
আমার অভিমানে বাড়ানো হাত কেটে শনশন বয়ে যাচ্ছিলো ফাল্গুনের
লাল গেরুয়া ধুলো মরা নদীর খাত ফিরিয়ে দিচ্ছিলো ব্যাকুলতা ।
সস্তার নিকোটিনের আদরে ডুবে যাচ্ছিলাম । হারা উদ্দেশ্যের সতেরোতম বাঁকে
তখন আরেকটা জানালা খুলে দিলো মা । সেটা কোনো জাদু নয় ।
কোনো দেখনদারীও ছিল না । মৃদু বকুনি অনেক প্রশ্রয় আর ঘরে ফেরার জন্য
নিঃশব্দ ডাক ছিল চোখের ভাষায় । একটা আলোর দরজা । সাদা সাদা পাতা
অক্ষরের ইকেবানায় সাজানোর খেলা । সেই থেকে খেলাটা চলছে ।
খেলাটা আর সখ নেই,নেশা হয়ে গেছে । বাইরের আর কোনো প্রলোভন নেই,
আন্তরিক যাপন হয়ে গেছে । খেলাটা খেলতে খেলতে আমি কখন যেন
একুশের ভোরের দিকে হাঁটতে শুরু করেছি । মুখ গুঁজেছি মায়ের আঁচলে ।
আহা, পরম আনন্দের সেই কান্না । প্রাণ ভরিয়ে তৃষ্ণা হরণ করে
শান্তি হয়ে আদর হয়ে উষ্ণতা হয়ে মাটির গন্ধ আর পরম মহাকর্ষ হয়ে
আমায় সেই থেকে জনতার মিছিলে সামিল করেছে আহ্লাদিত বর্ণমালা ।
একুশ আমার একুশ তোমার

একুশ আমার  একুশ তোমার  একুশের চোখে পানি
রক্ত রঙীন  শপথের দিন একুশ মুছেছে  গ্লানি ।
ভাষা শুধু নয় ভাব বিনিময়, এক উজ্জ্বল দীপ
মায়ের কপালে ভোরের সকালে সূর্যের  লাল টিপ ।
একুশ আমার একুশ তোমার একুশের চোখে  জয়
রফিক সালাম বরকত নাম শাশ্বত অক্ষয় ।
ভাষা মানে এক ভালোবাসা প্রেম  আকাশের সাথে নদী
বুকের ভেতর  শত জল ঝড় ঝর্ণার নিরবধি।
একুশ আমারএকুশ তোমার একুশের মনে গান
ঐক্যের পথে যত অবরোধ আজ যেন  খান খান ।
মাটির আঙিনা আজ আলোকিত উজ্জল সারি সারি
শিকড়ে স্বপ্ন প্রতি মানুষের  একুশে ফেব্রুয়ারি ।
চির-স্বপ্নময়

রাজপথ আজো ভুলতে পারেনি
রক্তের আলপনা
কোটি কণ্ঠের মিলিত জোয়ার
হৃদয়ে মেলেছে ডানা
বুলেটে বুলেটে বিক্ষত দেহ
পশুরা দিয়েছে হানা
ঢাকা রাজপথ এখনো ভোলেনি
রক্তের আলপনা

কে তুমি শহিদ
জব্বর নাকি
নাকি আব্দুল ভাই
রফিক সেলাম হাজারো সেলাম
তোমাদের ভুলি নাই

একুশে ফেব্রুয়ারি
ঘাতকের চোখ হল ভয়ানক
খাপ খোলা তরবারি

একুশে ফেব্রুয়ারি
স্বপ্ন শহিদ শুয়ে আছে পথে
লাশ হয়ে সারি সারি
একুশে ফেব্রুয়ারি
পাঁচটি প্রদীপ নিভে গেল ঝড়ে
ফিরল না কেউ বাড়ি

হায়রে কচি কাঁচা অমল প্রাণের মুকুল
ঘুমিয়ে পড়লি ঘুমিয়ে পড়লি
ঘুমিয়ে পড়লি 
রাজপথে
অসময়ে হারিয়ে গেল
মেঘনা পদ্মার জল
গান কবিতা ক্যাম্পাস
নিখাদ আড্ডার প্রাঙ্গণ
হায়রে কচি কাঁচা অমল প্রাণের মুকুল
ঘুমিয়ে পড়লি ঘুমিয়ে পড়লি
ঘুমিয়ে পড়লি 
রাজপথে

ঘাতক এমন নির্মম হতে পারো
অদের অস্ত্র কবিতা কিংবা গান
সব স্বপ্নকে করে দিলে খান খান
ঘাতক তুমি কি রক্ত চাইছো আরো
চিনতে পারোনি কিশোরের কচি মুখ
মায়াবী আলোয় ভরপুর ঐ বুক
কি করে তবুও অস্ত্র হানতে পারো
ঘাতক তুমি কি রক্ত চাইছো আরো

চাইলেই পাবে প্রস্তুত কোটি প্রাণ
মুখের ভাষাকে বুকের রক্তে
করাতে পুণ্য স্নান
ঘরে ঘরে আজ প্রস্তুত কোটি প্রাণ
অন্ধ ঘাতক কত চাও বলিদান
কত চাও বলিদান

যশোর ঢাকার কোর্ট চত্বরে
কারা শুয়ে আছে চির-নিদ্রায়
রক্ত ঝরানো মুঠিতে ওদের
কোন ভাষা বল চির-প্রাণময়
সবুজ অবুঝ রক্ত দিয়েছে
রক্তের রঙে শুদ্ধ এ ভাষা
শপথের ভাষা অশ্রুর ভাষা
এ ভাষার প্রাণ শুধু ভালোবাসা

হৃদয়ের দরজায়
করাঘাত করে কিছু অমলিন মুখ
ঘাতকের অস্ত্রাঘাতে
ছিন্নভিন্ন শহিদের রক্তাক্ত বুক
সেই স্মৃতি ক্ষয়হীন
বহমান জীবন্ত সময়
মৃত্যুকে মুগ্ধ করে
থাকে স্মৃতি চির-স্বপ্নময়!
চির-স্বপ্নময়!
চির-স্বপ্নময়!
বাংলা,আমার বাংলা

বাংলার ঋতু মেখে বেঁচে আছি অনেক বছর
বেঁচে আছি মাথা তুলে, বনস্পতি যেমনটি থাকে
বর্ণমালা সাজিয়েছে এ শরীরে প্রেমের আখর
বাংলার পথে পথে খুঁজে পাই আমার আমাকে ।

বাংলার ধানক্ষেত, বাংলার খাল, বিল, নদী
দেখেছি, ছুঁয়েছি আমি দুহাতের পেলব আভাসে
নিজেকে হারিয়ে ফেলে খুঁজেছি আবার আমি যদি
জীবন পেয়েছি ফিরে বাংলার সবুজ বাতাসে ।

বাংলার বুক বিঁধে কাঁটাতার সাজিয়েছে যারা
বর্ণমালাকে যারা বিনা দোষে দেয় নির্বাসন
আসলে প্রজন্ম জুড়ে মানুষই যে হয় মাতৃহারা
সে কথা জানে কি তারা, বোঝে এও আর এক মরণ ?!

দুচোখ মুছেছি আমি বাংলার মাটির আঁচলে
বাংলার  ধুলো ঘেঁটে খুঁজেছি নতুন অভিজ্ঞান
বাংলাকে ভালবেসে ডুবে আছি সাগর অতলে

বাংলা আমার মা, বাংলা আমার সম্মান ।
মা বুলি

বিহান বেলায় প্যাটের ভিতর টুঁ টুঁ  কর্ য়্যা কাইনতে থাকে
খিদা...খিদা...জগতটকে সাপুটে খায়্যেঁ ফেলার লেগ্যে
মনট তখন হাটুর পাটুর...
ছুটুবেলার ইস্কুলঘরের ছামুটে যুন লাল ধুলার রাস্তাট সিদ্যা
জঙ্গলের কালা আন্ধারে সিঁধাইনছে
উয়ার অগল বগলে মাঠ গুডু (লেহ্ বাবুরা যাকে ইন্দুর বলে)
খাম আলু দুচার পেইলেই দিন পুরা রাত পুরা লিসচিন্দি।
ইস্কুলঘরে ছুটুবেলাট বডই হিচিকিচানো,
সর্দি নাকে সিলেট পিনসিল আর আঁখ লাল
ম্যাস্টরগুলান খালি মারে দিকুদিগের বুলি না বইললেই...
গাঁওবুড়া বইলথ এমন দিন আইসবেক রে আইসবেক
আপন আপন অলচিকিতেই লিখা পড়া
বেটা বিটি গুলাও বাঁইচবেক দিকু দিগের বুলি থিক্যে!
আজও সেই ইস্কুলঘর, আজও সেই সর্দি নাকের ছুটু ছুটু মানুষগুলা
আজও সেই বাবুদের ঘরের লাল চোখ ম্যাস্টর,
দু টাকা কিলো চালও উরাই ল্যায়
দিকু বুলিও উরাই সিখাই জবরদস্তি
আজও সেই লেংটি পইরে ইস্কুলঘরের পাস হয়্যাঁ
গুডু খুঁজা, খাম আলু খুঁজা...
মরন ইস্তক আমার ছামুতে মা বুলি অলচিকি
সিলেটে লিখ্যা হয়্যেঁ এখনো এলো নাই গ মহাজন!
রূপান্তরের বর্ণমালা

প্রথম আলো দেখবো বলে আজ ভোরে উঠেছি জানো!
আলোর আখরে আর প্রেমের গভীরতায় গড়ে নেবো আমার অ-আ-ক-খ --
আমার রূপান্তরের বর্ণমালা! ওই যে গানটি ওই? '
'আমার প্রাণের গানের ভাষা
শিখবে তারা ছিলো আশা!''
আমার দিনগুলোতো মুক্ত করেই এনেছি সোনার খাঁচা থেকে আর তাই শুধু
ওড়া ওড়া আর ওড়া...স্বাধীন নীলে আমি খুঁজি –
খুঁজে যাই আমার প্রাণের গানের ভাষা...
কাল সারারাত স্বপ্নজুড়ে -- অনেক রোদ! 
অনেক রোদ আর আলোর স্রোতে পালতোলা একরাশ প্রজাপতি !
গায়ে প্রজাপতি বসলে তোমার সাথে মিলন অবশ্যম্ভাবী জানি—
স্বপ্নে এতো প্রজাপতি দেখলে
কী হয় গো? রূপান্তর?
প্রজাপতিরা আমার বন্ধু। বাগানে বসে আমি মাটি ঝুরঝুর করি, সার মেশাই,
শুকনো পাতাদের সরাই আর  দেখি ওরা আসে, ওড়ে অনেক সময় একলাটি।
উড়ে উড়ে বিভোর কেউ বসছে এ ফুলে সে ফুলে, অনেকসময় দুটি ছটফটে জোড়া
উড়ছে -- এ ওকে যেন প্রদক্ষিণ করছে অথবা উত্তেজনায় এ ওকে দেখাচ্ছে
''দেখ্ দেখ্ কী সুন্দর!''  অথবা আড়াল খুঁজছে আমাদেরই মতো এই শহরের ভীড়ে --
শুধু একটু চুমু খাবে বলে...
প্রজাপতিরা কী রেখে যায় গো? এই যে আমি রেখে যাই উড়ানের আবেশ কবিতায়
আর  নানান ডানাচোঁওয়া রঙ।  প্রজাপতিরা কী রেখে যায়? উড়ান এর উপলব্ধি ও
বর্ণিল অনুভবর উজ্জ্বলতা? রেখে যায় রেণু রেণু কবিতা ও একদিন তার আস্ত দুটি ডানা?
জানো একদিন একটি পাতয় একজোড়া ফেলে যাওয়া প্রজাপতি-ডানা দেখে কী বিহ্বল হয়ে গেছিলাম!
তখন সবে কবিতা লিখতে শুরু করেছি এই বছর তিন আগে -- মনে হয়েছিল এ যেন আমার
উত্তরসূরী  জীবনানন্দ নামের কোন প্রজাপতি স্বয়ং রেখে গেছে -- এই রঙ ও স্বপ্ন ছড়িয়ে ওড়বার
দুটি ডানা! কী দারুণ!কী দারুণ!কী দারুণ!
আলোর ডিম ফুটবে ফুটবে করছে এই ব্রাহ্ম মুহূর্তেএই রাত ও সকালের মোহনায় ।কেমন জানি
মনে হচ্ছে প্রজাপতিরা ফুলে পরাগসংযোগ ও নূতনকে সৃজনএ পরোক্ষ সহায়তা এবং সৌন্দর্যবাহী অনেক
আপাত মিনিংলেস ওড়াউড়ির পরও রেখে যায় অনন্ত সম্ভাবনা -- অজস্র ঘুমন্ত ডিম এ
রূপান্তরের বর্ণমালা!
শুধোলে -- ''কীসের রূপান্তর? রূপান্তর কেন? রূপান্তর কোথায়?''
ওই যে বর্ণমালা -- অ-আ-ক-খ'র ডিম? তার থেকে আমরা
শুঁয়োপোকা -- রক্তধারার ছন্দে আসলেই রূপান্তর ডাকছে –
আলোয় প্রজাপতি হয়ে পালতুলে ওড়ার সম্ভাবনা!
কেউ কেউ আমরা টের পাই -- ''আছে! আছে! আছে!''
কিছু একটা আছে!'' চেতনাতে ফিসফিস ফিসফিস ফিসফিস –
ট্রা--ন--স--ফ--র--মে--শ--ন মে--টা--ম--র--ফো--ও--সি--স
আবার দেখ? কেউ কেউ কিছুই টের পেতে চায় না –
আঁধারে ডুবে শুঁয়োপোকাই হয়ে থাকে –
হুমায়ুন আজাদ, রাজীব, অভিজিৎ, নিলয় কে কোপায় –
আহ্!!! নির্ভয়াকে রেপ করে ..আহ্!!
এই এরাই -- এরা নিল না ...এরা পেল না এই রূপান্তরের বর্ণমালার উত্তরাধিকার
জলভরা চোখে তুমি বললে .. 'তাইতো! চলো উড়িয়ে দি দুজনে মিলে –
এই অআকখ দের ...উড়ুক এরা দিকে দিকে -- ছড়াক অনন্ত সম্ভাবনা –

অজস্র ঘুমন্ত ডিম -- ছড়াক রূপান্তরের বর্ণমালা!
একুশ...

অজস্র বর্ণমালা থেকে বাহান্ন
ডাক পাঠায়।
তোমার অধীনে জমা রাখা
এক একটি ভাষা
কুড়িয়ে নেয়-স্বগোত্রীয় পরিক্রমা।
ব্যক্তিগত সমগ্র ফেলে
যারা হারিয়ে যাচ্ছে রোজ
সেইসব ভাষা আকাশ সমান লম্বা
দীর্ঘশ্বাস পকেটে নিয়ে হারিয়ে যায়
তুমি কি তাদের কথা ভাবো?
প্রভু কাকে বলি,কারে বলি ত্রাণ
বেদনার সুখে
বুকের নিকটে একা
বিশ্বাস করো-পালক ঝরা দিনে
আমি আজো
সেইসব ভাষাহীন নিখোঁজ যাত্রা
চুপচাপ দেখি
মনে পড়ছে?
তখন আমার কোন ভাষা নেই
দাঁড়িয়ে থাকি ভাষাহীন
তোমার নামের ছায়ায়
জলের ভাঙনে
সময় শিস দিয়ে যায়
মায়ের চিতায় জেগে ওঠে
ভাষার গহীন জানালা
আগুন,শূন্যতা জ্বলে কই
বোধের গভীরে  
কোমল হৃদয়ে আমার...
একুশে ফেব্রুয়ারি

ভোরের জানালা খুলতেই যে মেয়েটির দিকে চোখ পড়লো
তার পরনে শিমুল শাড়ি।
চোখে চোখ পড়তেই লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে ডাকলাম,
এই মেয়ে নাম কি ?
আমার চোখে চোখ রেখে সে বললো, একুশে ফেব্রুয়ারি।
বললাম ধুস ! সত্যি করে বল?
মেয়েটি তখন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক।
আমি অবাক হয়ে মেয়েটির চোখের মধ্যে দেখলাম একটা প্রকাণ্ড সমুদ্র!
তার বড়ো বড়ো ঢেউয়ের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে একটা জাহাজ!
আমি তার মাস্তুল দেখতে পাচ্ছি, আমি তার মুখ দেখতে পাচ্ছি,
আমি দেখতে পাচ্ছি তার গায়ে লেখা আগুন রঙের নাম,
- “আমার বাংলা ভাষা”
বললাম, সবাই তোমায় চেনে।
অম্লান হেসে সে তখন ঢাকার রাজপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে
শহীদ সৌধের দিকে।
উন্মাদের মতো তার পেছন পেছন এগিয়ে যাচ্ছি আমি,
এগিয়ে যাচ্ছে একশো,দুশো,হাজার,লক্ষ লক্ষ রফিক জব্বর বরকত।
আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,
আমার ও তাঁদের প্রত্যেকের হাতে গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তমুখি গোলাপ ...।


 একটা

একটা শব্দ    কেঁপে ওঠে রাজপাট
একটা বর্ণ    রঙীন বনপলাশ
একটা গন্ধ    তোলপাড় মহাসাগর
একটা স্পর্শ   গলে জল মহাদেশ

একটা মানুষ   বহু মানুষের স্বর
এক আহ্বান    হৃদয় গলে জল
একটা সঙ্ঘ    বহু করতলে তালি
একটা মূর্তি    না জানি কতই বলে

একটা শত্রু    সব মহাদেশ বিশ্বের
একটা নিয়মে সব-ই বাঁধতে চায়
একটা স্বপ্ন    বহু স্বপ্নের ডানা
একটাই সেতু   দুই মেরুকেও বাঁধে

একটা শহিদ   বহু শহিদের নাম
একটাই ভাষা মায়ের মুখের বুলি
একটা শপথ   বাঁচুক মায়ের ভাষা
একটাই দিন   একুশের নামে পাওয়া

কি ভাষা তোমার? স্প্যানিশ? হিব্রু? রুশ?
একটাই নাম সারা দুনিয়ায় - একুশ।





একুশের হৃদপঞ্জরে......

বাতাস যখন গন্ধ শোঁকে আকুল ফাগের
পলাশ শিমুল ভালবাসার উড়ন্ত পাল
সবুজঘেরা ছোট্ট দেশে তখন যেন
রুখতে ভাষার সর্বনাশের
জ্বললো মশাল।

নয় জহরত, নয় রাজত্ব কীসের বা সুখ,
প্রাণ বিলিয়ে রাখতে চাওয়া
বাংলা ভাষা !
লজ্জা পাওয়া পদ্মা পানির আরক্ত মুখ
প্রশাসনের বুলেট ছিল মৃত্যুনেশা।

লুটিয়ে পড়া রফিক, মুনির, বরকত ভাই
বাংলা ভাষার হৃদয়
তোমায় জানায় সেলাম
আজ দুনিয়া ভাষার কদর মানছে যখন
শহীদ বেদীর চারকোণাতে
নত হলাম !
হারানো আন্দোলনের স্মৃতি

আশ্চর্য পাঁচমিশালি চিৎকার সব,
কানে আসে বাজারের ঘামে, আজকাল।
লাগাতার দুর্বোধ্যতায় ভরে উঠছে,
নবীনের রঙিন জামা, প্রজাপতির মতো,
উড়তে থাকা কালোয়াতি রেশম রুমাল।
সমস্ত পংক্তি আর শব্দগুচ্ছ নিয়ে
ভরে যাচ্ছে কয়েক কোটির,
ঘর, সংকর সংসার, আত্মীয়দের গোঙানি।

চারপাশে দুনিয়ার যাত্রীবাহী পরিবহনে উঠে পড়লেই,
চোখে পড়ে শব্দহীন, ধ্বনিহীন হাড়গোড়ের স্তূপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে যে রক্তের ফোঁটা,
বান ডেকেছিল একদিন,
তার ছেড়ে যাওয়া পলিতে ফসিল হয়ে,
আঁটকে আছে ভাষা-শ্রমিকের কুঠার।

তবুও শিকড়ের টানে উঠে আসে মাটি আজো,
স্বাধীনতা শোনিতের ভাসমান শ্বাসে।
পৃথিবীর দিন, রাত্রি, মায়ের কোল,
উৎস নিয়ে যারা লড়াই করে অবিরাম,
তাদের পরিচয় গোপন করা যায় না
পরিবর্তনের কুয়াশা দিয়ে।

কানে আসে জন্মভূমির জয়ের শঙ্খনাদ,
গুলি লাগা বুক উল্লাস করে ওঠে।।
একুশ  

ভাষা এক মা টি 
কোল
 ; শান্ত ভরালো কুটির ছাঁচ
পা পড়ে , কলম লেখে , বলি , পড়ি , ভাবায় 
জড়াই একতারা ছুঁয়ে আটচালা ।
মরি উচ্চারণে , দীর্ঘশ্বাসে মা , মা গো __ 
জ্বরের কপালে
 রোগা হাত ।
নির্বাসন , বৃদ্ধাশ্রম মতো 
গালভরা অপত্য আহ্লাদ
 
একুশ একটি
 সংখ্যা ; ঐতিহাসিক ।



বনপলাশির মন

রজনীগন্ধার রাত
           বারুদ-বাতাসে বিষময়---

তোমার পালঙ্ক-পাঁকে
       আশরীর ডুবিয়ে রেখেছি
তবু বনপলাশির মনে
              রঙ লাগে আর
শিমুলের মত প্রেম উড়ে যায়
 ভালবাসাহীন ভাষার বাতাসে


প্রেম প্রেম বলে
            কাঁদবার সময় এ নয়-
কানাই - লালন--
ভালবাসা ফোটায় এখন
          মারণ মানব বোমা বুকে


অশনির আলোকিত রূঢ় অন্ধকারে
রজস্বলা রমণীর রক্তালু শয্যায়
              আমাকে ঘুমোতে হবে
বিব্রত বাউল-
        তুমি কেঁদো না লজ্জায়


About