লেখকসূচি - ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর দেবনাথ, শর্মিষ্ঠা ঘোষ, সৌমিত্র চক্রবর্তী, দময়ন্তী দাশগুপ্ত, সপ্তাশ্ব ভৌমিক, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, শুভ জোয়ারদার, হরপ্রসাদ রায়, অনুপম দাশশর্মা, মোহম্মদ আনওয়ারুল কবীর, প্রবীর বিকাশ সরকার, অরুণিমা চৌধুরী, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, রুখসানা কাজল্ম শাশ্বতী সরকার, এম হাসানুজ্জামান আনসারী, আফরোজা অদিতি, রূপক সান্যাল, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী পাল, হিল্লোল রায়, দেবলীনা সেনগুপ্ত, পিনাকী দত্তগুপ্ত, কাজী এনামুল হক, পলাশ কুমার পাল, শীলা পাল, মলয় সরকার, তন্ময় বসু, গোপেশ দে, অঞ্জন সরকার ।

        সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করে পড়ুন
   



        
        শিশু-সাহিত্যের পিতৃপুরুষ যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জন্ম সার্ধ-শতবর্ষে ‘অন্যনিষাদ’এর বিনম্র প্রণাম । আজ তাঁর ১৫১তম জন্মদিন ।

আধুনিক কবিকুলের অনেকেই ‘ছড়া’ চর্চার কথা শুনলেই নাসিকা কুঞ্চন করেন । সাহিত্যে ছড়াকে স্থান দিতে তাদের প্রবল অনীহা । বড়জোর তারা বলেন 'ছড়া শিশুদের খেলামেলার কাব্য' এর বেশি মর্যাদা তারা ‘ছড়া’কে দিতে চান না । অথচ তারা কেউই বুক ঠুকে বলতে পারবেন না যে তারা কবিতা লেখার হাত মকশো করেননি ছড়া কিংবা ছন্দবদ্ধ পদ্য চর্চার মধ্য দিয়েই । ছড়া সাহিত্যের মূল ধারারই এক শক্তিশালী শাখা । ছড়ার রয়েছে দেড়হাজার বছরের ইতিহাস । সাহিত্যের প্রথম শাখা বা সৃষ্টিই ছড়া । ছড়া প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সুদূর কাল থেকে আজ পর্যন্ত এই কাব্য (ছড়া) যারা আউড়িয়েছে এবং যারা শুনেছে তারা অর্থেও অতীত রস পেয়েছে। ছন্দতে ছবিতে মিলে একটা মোহ এনেছে  তাদের মধ্যর । সেই জন্য অনেক নামজাদা কবিতার চেয়ে এর আয়ু বেড়ে চলেছে’ ।

হলই বা ছড়া শিশু-সাহিত্যের বিশিষ্ট উপাদান । কিন্তু যুগ যুগ ধরে অজস্র লৌকিক ছড়া, যেগুলির রচনাকারের নাম জানা য্য না, সেইসব লোকায়ত সৃষ্টিগুলি যে আমাদের সাহিত্যভাবনার বীজ তা অস্বীকার করবে কে ? এমন কে আছেন, যিনি তার নিতান্ত শৈশবে মাতৃক্রোড়ে ছড়া, গান শনতে শউনতে ঘুমননি ! এমন কি কেউ আছেন যিনি আস্ফুট বোলে যোগীন্দ্রনাথের ‘অএ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাবো পেড়ে’ পড়ে বাংলা অক্ষর পরিচয় করেননি কিংবা প্রবাদ হয়ে যাওয়া ‘হারাধনের দশটি ছেলে’ ছড়াটি আপন শৈশবে পড়েননি ! এইসব ছড়া তবুও ছাপাখানা আসার পরের সৃষ্টি, যে সৃষ্টির ভুবনকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছেন যোগীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশঙ্কর রায় থেকে একালের ভবাণী প্রসাদ মজুমদারের মত কত কবি, ছড়াকার ।

বাংলা সাহিত্যেরই তখন নির্মাণের কাল । মার্চ ১৮৬৫তে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হয়েছিল । রবীন্দ্রনাথ তখন চারবছরের বালক, উপেন্দ্রকিশোর ১৫মাসের শিশু আর যোগীন্দ্রনাথ জন্মাবেন আরো আঠেরো মাস পরে । যোগীন্দ্রনাথ সরকার ও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর হাতেই বাংলা শিশু-সাহিত্যের একটা স্পষ্ট অবয়ব তৈরি হয়েছিল । আর ক’বছর পরে এলেন দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার । ছড়ার যোগীন্দ্রনা্থ, গল্পের উপেন্দ্রকিশোর  আর রূপকথা গল্পের দক্ষিণারঞ্জন আর উদ্ভট কল্পলোকের ছড়া ও গল্পের সুকুমার রায় । শিশুসাহিত্য বলতে আজও বাঙালি এঁদের কাছেই ফিরে যান ।

অগ্রজ নীলরতন সরকার সেকালের প্রখ্যাত চিকিৎসক । কিন্তু যোগীন্দ্রনাথ প্রথাগত শিক্ষায় বেশিদূর না গিয়ে শিশুসাহিত্য রচনা ও প্রচারকেই জীবনের ব্রত মনে করেছিলেন । শুধু নিজে লেখা নয়, শিশুসাহিত্যের প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৮৯৬তে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সিটি বুক সোসাইটি’ । তাঁর প্রকাশনা সংস্থা থেকেই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর প্রথম গ্রন্থ ‘ছেলেদের রামায়ণ’ প্রকাশিত হয় । তাঁর এক অনন্য কীর্তি বাংলার লোককথা ও মৌখিক সাহিত্যে ছড়িয়ে থাকা ছড়া-ভান্ডারের উজ্বল উদ্ধার । বাংলার লৌকিক ছড়া সংগ্রহ করে ১৮৯৯ সালে প্রকাশ করেন ‘খুকুমণির ছড়া’, যার ভূমিকা লিখেছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদি । যোগীন্দ্রনাথের ছড়ার মধ্যে আছে সহজিয়া ভাব, নেই তত্ব বা উপদেশ । তিনি বিশ্বাস করতেন, ছড়ার ধর্ম হল শিশুর অস্ফুট ভাষ্য, বিজ্ঞের ভাষ্য নয় । শব্দই ছড়ার প্রাণ , অর্থ বা তত্ব সেখানে গৌণ ।

যোগীন্দ্রনাথ আজ হয়তো এক ভুলেযাওয়া নাম । কিন্তু সংশয় নেই ‘টিয়াপাখির ঠোঁটটি লাল ঠাকুরদাদার শুকনো গাল’- এমন অপরূপ ছন্দ তালে শিশুকে অক্ষর পরিচয় শেখানো একশো কুড়ি বছর আগে প্রকাশিত ‘হাসি-খুশি’ চিরদিন উজ্বল হয়ে থাকবে, চিরদিন তারা তাদের মনের মত খেলনার সঙ্গে আমরা ‘হাসিখুশি’ও তাদের হাতে । বাংলায় সার্থক কল্প-বিজ্ঞান লেখক, ঘণাদার স্রষ্টা প্রেমেন্দ্র মিত্র যোগীন্দ্রনাথকে নিবেদিত একটি ছড়ায় লিখেছেন যে চাবিতে এই দুনিয়ার সকল মহল খোলে /  তোমার কাছেই তা পেয়েছি বসে মায়ের কোলে। এই দুটো পংক্তিই বোধ করি যোগীন্দ্রনাথের প্রকৃত মূল্যায়ন ।

অর্ধশতাধিক ছড়া, একটি প্রবন্ধ দিয়ে সাজিয়েছি এই সুবৃহৎ সংকলন । পাঠকের ভালোলাগাই এই প্রয়াসকে অর্থবহ করবে । সকলকে আসন্ন শারদীয়া উৎসবের আগাম শুভেচ্ছা জানাই । পরের সংখ্যা প্রকাশিত হবে ৬ই অক্টোবর । সেটিই ৫ম বর্ষের শেষ সংখ্যা । তারপর এক সপ্তাহ অন্যনিষাদের শারদ-অবকাশ । ৬ষ্ঠ বর্ষের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হবে ২০শে অক্টোবর ।




যোগীন্দ্রনাথ সরকার
বাহারে,কি ছড়াকার!         


যোগীন সরকারের নাম প্রথম শুনি আমার দিদিমার কাছে। নামটি অবশ্যই যোগীন  সরকার নয়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার কিন্তু ওই নামেই তিনি অধিক পরিচিত।
আমার দিদিমা বেঁচে থাকলে আজকের দিনে তাঁর বয়স হত প্রায় একশ আট বছর। সেকালের মহিলা, প্রথাগত বিদ্যাশিক্ষা ছিলনা, কিন্তু গৃহশিক্ষার ফলে লেখাপড়া জানতেন। বাড়ির  দলিল দস্তাবেজে নিজে নাম সই করতেন, চিঠি-চাপাটি লিখতেও দেখেছি। আর ছিল অদ্ভুত এক ক্ষমতা, মুখে মুখে ছড়া তৈরি  করতে পারতেন। ঘুরছেন, ফিরছেন, কাজকর্ম করছেন কিন্তু বিশেষ কেউ এলে বা বিশেষ কিছু নজরে পড়লে তৎক্ষণাৎ সেই বিষয়ে ছড়া তৈরি করে ফেলতেন। যেমন, সারাদিনের পর বাড়ি ফিরেছি, হয়ত সেদিন ঠিকমত খেয়ে যাইনি, অমনি বলে উঠলেন---

মজবুত শরীর হলে
তবে মাথায় বুদ্ধি গজায়
জানো না কি
রাজত্ব করে রাজায়...
কিংবা বাড়িতে ভিখারি এসে পয়সা চাইছে, সে টাকা নেবে, পয়সায় মন উঠছে না। দিদিমা অমনি বলে উঠলেন—
পয়সা নয়, টাকা
যতই দাও ফাঁকা।
এ হেন দিদিমার কাছে শিশুকালে যে যোগীন সরকারের নাম শুনব তাতে আর আশ্চর্য্য কি! দিদিমায়ের দৌলতেই বুঝি আমিও ছড়া-প্রেমিক।

ছড়া নিয়ে এত কথা বলার একটাই কারণ, এই বৎসরটি ছড়াকার যোগীন সরকারের জন্মের সার্ধ শতবৎসর।যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জন্ম ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে কিন্তু জন্ম তারিখটি  জানা যায় বাংলায়, ১২ই কার্তিক। যোগীন সরকারের আদি নিবাস যশোর জেলায়। ২৪ পরগনা জেলার নেত্রা বা নেত্‌রা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  বিখ্যাত নীলরতন সরকার মশাই ছিলেন যোগীন সরকারের দাদা। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করে কলকাতায় এসে সিটি কলেজে ভর্তি হলেও প্রথাগত শিক্ষা সমাপ্ত করেননি, যদিও সিটি স্কুলেই তাঁর প্রথম চাকরি জীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে।

যোগীন সরকারের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল শিশুদের ছবি এঁকে অক্ষর চেনানোর চেষ্টা  ছোটদের জন্য লিখতেন। তাঁর ‘হাসিরাশি’, ‘হাসিখুশি’ আর ‘খুকুমনির ছড়া’ হল বিখ্যাত ছোটদের বই, যে বই আমাদের বাবা-মায়েরাও পড়েছেন এমন কি তাঁদের  বাবা-মায়েরাও। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় বই ছিল ‘হাসিখুশি’, ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘খুকুমনির ছড়া’।  
১৮৯৬ সালেই নিজস্ব একটি প্রকাশনা ছিল, যার নাম ছিল সিটি বুক সোসাইটী। এই প্রকাশনা থেকে প্রথম প্রকাশিত বই হল, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোটদের রামায়ণ। যোগীন্দ্রনাথ সরকারের সাহিত্যজীবন ছিল শিশুদের জন্য উৎসর্গীকৃত।  

ছোটদের জন্য নানা মজার ছড়া, হাসির ছড়া লিখতেন। আর লিখতেন  আজগুবী সব ছড়া যা আমরা পরবর্তী কালে পাই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পুত্র সুকুমার রায়ের রচনায়। বস্তুতঃ, তাঁর রচনার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যের শিশু সাহিত্যটি এগিয়ে চলেছে। রবীন্দ্রনাথের কথায় যোগীন্দ্রনাথ সরকার হলেন শিশু সাহিত্যের ভগীরথ।  একটী উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে তাঁর রচনার ধরণ.....
মজার দেশ
এক যে আছে মজার দেশ, সব রকমে ভালো,
রাত্তিরেতে বেজায় রোদ দিনে চাঁদের আলো!
আকাশ সেথা সবুজবরণ গাছের পাতা নীল
ডাঙ্গায় চরে রুই কাতলা জলের মাঝে চিল।
সেই দেশেতে বেড়াল পালায়,নেংটি ইঁদুর দেখে,
ছেলেরা খায় ক্যাস্টর-অয়েল,রসগোল্লা মেখে!
মন্ডা মেঠাই তেতো সেথা ওষুধ লাগে ভালো ......

(ছড়াটির সবটুকু দিলাম না, কারণ যোগীন্দ্রনাথের আরো দুটি কবিতার সঙ্গে এটিও এই পত্রিকাতেই অন্যত্র দেওয়া হয়েছে ।)  পরবর্তী কালে এই ভাবনা থেকেই  আমরা পাই সুকুমার রায়ের আবোল-তাবোল, হযবরল এবং সেই বিখ্যাত পংক্তি— ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল’ এবং যা পাওয়া যায় চক্ষু মুদলে, খোলা চোখে নয়!    
যোগীনের ছড়ার মধ্যে আছে সূক্ষ বিদ্রূপও। ‘ ছেলেরা সব খেলা ফেলে বই নে বসে পড়ে’- ছড়ার এই পংক্তিটি পড়লে তার অর্থ ধরা যায়। বস্তুতঃ, শিশুদের জগত খেলার জগত। তা না  করে অতি শিশুকাল থেকেই তার  হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বইয়ের বোঝা, যার ফলে শিশু তার নিজস্ব জগতকে  হারিয়ে ফেলছে যেমন, বড়দের জগতে পা রাখতেও অক্ষম এই শিশু বয়সে। পিতা-মাতার চিন্তার কথা বৈকি!  

বয়সকালে এই ছড়া ও ছবির মানুষটি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন, কিন্তু সেই  অবস্থাতেও তিনি রচনা করে গেছেন শিশুদের জন্য। ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার ১২ই আষাঢ তাঁ জীবনাবসান ঘটে।
তাঁর জন্মের সার্ধশত বর্ষে তাঁকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।

খুকু-খোকার ছড়া
ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

খুকুমনি পড়ে যা
খোকাবাবু পড়ে তায়
যোগীনের ছড়াগুলি
মুখে মুখে বলে যায়

‘হাসিরাশি’ ‘হাসিখুশি’
নয় শুধু ছোটরা
আমরাও পড়েছি তা
পড়ে বাবা-মায়েরা।

ছবি দেখে অ-আ  ক-খ
আগে কি কেউ শিখত
যোগীন তাই অক্ষর
ছবি এঁকে চেনাত(চেনাতেন)।

যোগীনের ছড়াগুলো 
পড়লেই মজা পাবে
কখনো হাসতে হবে
কখনো ভিরমি খাবে।

দোকানে জিনিস কিনো
লিস্টিটা মিলিয়ে
ভোলা-ভুতোর দেখলে খেলা
সব যাবে গুলিয়ে।

হারাধনের দশটি ছেলের
পড়েছ তো ছড়াখানা
  
মেলায় হারিয়ে গেলে
জুড়ো না যেন কান্না!
   

ছড়ার দেশেতে আছে
শুধু হাসি শুধু মজা
খোকা-খুকু কেবল হাসে
পায় না তো কোন সাজা।

জানো কি ছড়ার দেশে
 
রাতে রোদ, দিনে চাঁদ
  
এখানে পাতে না কেউ
কথায় কথার ফাঁদ।
 

তাই তো বলি খোকাখুকু
থাকো হাসিখুশিতে
যোগীনের বই পড়ো
ছড়া ও ছবিতে...







 




কাজের ছেলে

দাদখানি চাল,মুসুরির ডাল,চিনি-পাতা দৈ,
দুটা পাকা বেল,সরিষার তেল,ডিম-ভরা কৈ।
পথে হেঁটে চলি,মনে মনে বলি,পাছে হয় ভুল;
ভুল যদি হয়,মা তবে নিশ্চয়,ছিঁড়ে দেবে চুল।
দাদখানি চাল,মুসুরির ডাল,চিনি-পাতা দৈ,
দুটা পাকা বেল,সরিষার তেল,ডিম-ভরা কৈ।
বাহবা বাহবা- ভোলা ভূতো হাবা খেলিছে তো বেশ।
দেখিব খেলাতে,কে হারে কে জেতে,কেনা হলে শেষ।
দাদ্খানি চাল, মুসুরির ডাল,চিনি-পাতা দৈ,
ডিম ভরা বেল,দুটা পাকা তেল,সরিষার কৈ।
ওই তো ওখানে ঘুড়ি ধরে টানে,ঘোষেদের ননী:
আমি যদি পাই,তা হলে উড়াই আকাশে এখনি।
দাদখানি তেল,ডিম-ভরা বেল,দুটা পাকা দৈ,
সরিষার চাল,চিনি-পাতা ডাল,মুসুরির কৈ!
এসেছি দোকানে-কিনি এই খানে,যদি কিছু পাই;
মা যাহা বলেছে,ঠিক মনে আছে,তাতে ভুল নাই!
দাদখানি বেল,মুসুরির তেল,সরিষার কৈ,
চিনি-পাতা চাল,দুটা পাকা ডাল,ডিম-ভরা দৈ।

মজার দেশ

এক যে আছে মজার দেশ,
সব রকমে ভালো,
রাত্তিরেতে বেজায় রোদ,
দিনে চাঁদের আলো ।
আকাশ সেথা সবুজ বরন
গাছের পাতা নীল ,
ডাঙায় চরে রুই কাতলা
জলের মাঝে চিল !
সেই দেশেতে বেড়াল পালায় ,
নেংটি-ইঁদুর দেখে ;
ছেলেরা খায় ক্যাস্টর-অয়েল-
রসগোল্লা রেখে !
মন্ডা-মিঠাই তেতো সেথা ,
ওষুধ লাগে ভালো ;
অন্ধকারটা সাদা দেখায় ,
সাদা জিনিষ কালো !
ছেলেরা সব খেলা ফেলে
বই নিয়ে বসে পড়ে ;
মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়া
লোকের পিঠে চড়ে ;
ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই ,
উড়তে থাকে ছেলে ;
বরশি দিয়ে মানুষ গাঁথে ,
মাছেরা ছিপ ফেলে ;
জিলিপি সে তেরে আসে ,
কামড়ে দিতে চায় !
কচুরি আর রসগোল্লা
ছেলে ধরে খায় !
পায়ে ছাতা দিয়ে লোকে
হাতে হেঁটে চলে !
ডাঙায় ভাসে নৌকা জাহাজ ,
গাড়ি ছোটে জলে !
মজার দেশের মজার কথা
বলবো কত আর ;
চোখ খুললে যায় না দেখা
মুদলে পরিষ্কার ।


কাকাতুয়া

কাকাতুয়া,কাকাতুয়া,আমার যাদুমণি,

সোনার ঘড়ি কি বলিছে,বল দেখি শুনি ?

বলিছে সোনার ঘড়ি,"টিক্ টিক্ টিক্,

যা কিছু করিতে আছে,করে ফেল ঠিক।







[বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত ‘বাংলার ছড়া’ গ্রন্থের ভূমিকায়  ভাষাচার্য সুকুমার সেন তাঁর সংগ্রহ থেকে এই লৌকিক ছড়াটি উদ্ধার করেছেন । ভাষাচার্য জানিয়েছেন, ছড়াটি ২০০ বছর আগের । সংগ্রহ করেছিলেন উইলিয়াম কেরি ।

ছড়াটি একটি গল্পও বটে । গল্পটা এই - কর্তা জেলের থেকে মাছ কিনেছেন ২৪টা । কর্তা-গিন্নির সংসার । অতয়েব কর্তার অনেকগুলি মাছ পাতে পড়ার কথা । কিন্তু খেতে বসে দেখলেন, বড় বাটি ভর্তি ঝোল আর তাতে মাছ মাত্র একটা । কর্তা রেগে জানতে চাইলেন মাত্র একটা, বাকি মাছ কোথায় ? গিন্নি মাছের হিসাব দিলেন এইরকম – ]

মাছ আনিলা ছয় গন্ডা
চিলে নিল দুই গন্ডা ।
বাকি রইল ষোলো
তাহা ধুতে আটটা জলে পালাইল ।
তবে থাকিল আট
দুইটায় কিনিলাম দুই আটি কাট ।
তবে থাকিল ছয়
প্রতিবেশীকে চারিটা দিতে হয়
তবে থাকিল দুই
তার মধ্যে একটা চাখিয়া দেখিলাম মুই
তবে থাকিল এক
ঐ পাত পানে চাহিয়া দেখ ।
এখন হইস যদি মানুষের পো
তবে কাঁটাখান খাইয়া মাছখান থো ।
আমি যেই মেয়ে
তেই হিসাব দিলাম কয়ে ।



যোগীন্দ্র বন্দনা

অ আ - ক খর সাথে
নন্দে - খেলায় মাতে
ছন্দে - ছড়ায় ছড়ায়
শিশুদের - প্রথম পড়ায়
এনেছেন - মিষ্টি প্রভাত
তিনি তো - যোগীন্দ্রনাথ ।

হারাধন - দশটি ছেলে
সেভাবে – হারিয়ে ফেলে
সেভাবেই – ছন্দ মেখে
শিশুরা - সংখ্যা শেখে
ধরে যার – সস্নেহ হাত
তিনি তো – যোগীন্দ্রনাথ

মজার এক মুলুক এঁকে
তাত্র দেন – জীবন মেখে
শিশুরা - কল্প চোখে
ডুবে যায় – স্বপ্নলোকে
সে হাসি – খুশির প্রপাত
ঝরালেন – যোগীন্দনাথ ।

বর্ণের – ছন্দমালা
গেঁথেছেনগন্ধ মেলা
শিশুদের - জীবন গড়ার
শিল্পী – অমর ছড়ার
হে সুজন – যোগীন্দ্রনাথ
আমাদের - নাও প্রণিপাত
অঙ্ক

এই মেয়ে তুই শিউলি চিনিস ?
চিকন গালে রুজ মেখেছিস
নরম বোঁটার ? লুচি পাতায়
রান্না খেলিস ? নাম শুনেছিস
পিপারোমিয়ার ? খেয়ে দেখেছিস
পদ্মবাদাম ? জানা আছে তোর
কেমন মধু মাধবীলতায় ?
ডাহুক শুনিস জলার ধারে
গুব গুব গুব ? কিংবা মেঘে
দুগ্গা আঁকিস ? গাবলু গণেশ ?
কাশবনে ছুট ? শাপলা শালুক
চলতি পথে ? সবুজ মাখিস
মাইল মাইল ভোর পালিয়ে ?
সময় কোথায় ? ঠিক বলেছিস
আমরা সময় দিচ্ছি কখন ?
ঝাঁ চকচক ইঁদুর দৌড়ে সামিল করি ।
শপিং মলে আউটিং এ যাই ।
স্বপ্ন দেখি বিদেশ যাবি
মাল কামাবি । আমার যা যা
হয়নি করা তোর জিম্মায় চাপিয়ে
দেওয়া । আজ এবেলা বিদ্রোহ কর ।
তুই চাইলে আমিও আছি
এই নে আমার চোখ দুটো নে
এই নে মনটা ছন্নছাড়া পাগল পাগল ।
এই নে আমার ইজের পকেট কাঁচ মার্বেল ডান্ডা গুলি
আকাশ জোড়া ঘুড়ির লড়াই
হাতের চেটোয় লাট্টুর পাক
বাসন্তী দিন শিমুল পলাশ
কোকিলের ডাক ভরদুপুরে
এই নে দিলাম কেশব নাগের
অঙ্কখাতাও । সব গড়বড় হিসেব
আমার । তুই মেলাবি ? এই মেয়েটা ?
মেলাবি তুই ? এই

ভালোবাসা

রাবড়ি নাহয় বাসিই ভালো
আইসক্রিম খেতে কিসের মানা ?
তুমি যে দিব্যি গাছ ভালোবাসো
তাই বলে তুমি সাগরে যাবেনা ?

মাকে ভালোবাসি , সব্বাই বাসে
কমে ভালোবাসা তাতে কি বাবার ?
দুটি হাতই চাই ভিড়ে ও আড়ালে
আশীর্বাদে ও সাপোর্ট রাখায়

তোমাকে আমার বড় ভালোলাগে
ঘুরঘুর করি কড়া না নেড়েই
তাই বলে আমি স্টেডি ফ্রেন্ড ছেড়ে
সেমসাইড গোল কখনো খাবোনা

এটা ভালোলাগে কাজে লাগে সেটা
কিছু ভালোবাসি কেউ বাসে ভালো
মিলিয়ে মিশিয়ে এই বেশ হল
সাথে থাকাথাকি ইজি পথ চলা
টাক ডুমা ডুম ডুম

সকালেও বেশ ছিলো
দুপুরেও ঠিকঠাক,
সন্ধ্যে হতেই দেখি
মাথা জুড়ে গোল টাক।
টাক টাক ডুম ডুম
পড়ে গেল শোরগোল,
কেউ বলে তেল আনো
কেউ বলে ঢালো ঘোল।
ছুটে আসে প্রতিবেশী
জুড়ে দেয় গল্প,
কত টাক পড়ে গেছে
বেশি না কি অল্প?
সিরিয়াস মুখে কেউ
বকে চলে নাগাড়ে,
টাক পড়ে মরে গেলে
পড়ে থাকে ভাগাড়ে।
কেউ বলে থাক থাক
টাক বড় সুন্দর,
কাদাখোঁচা দাড়ি হলে
লাগে কালো বান্দর।
টাকে নাকি জ্যামিতিক
জ্যোতিষীর গণনা,
আঁকিবুকি দাগ কেটে
ভালো খোলে ভাবনা।
টাক শুনে টকটক
ছুটে আসে দে খুড়ো,
লাঠি ঠুকে ঠকঠক
বলে হে হে এ বুড়ো।
যাক যা হবার হবে
বলে যাই ভার্বাল,
বাকি চুল বাঁচাতে
লাগা তুই হার্বাল।
এতদিন ছিলি তুই
পাড়াতে সুপার হিরো,
এইবারে হলি হে হে
থুত্থুরে গোল জিরো।
কতজন কতকিছু
করে প্রেসক্রিপশন,
মাথার হয়েছে দোষ
কর টাকোপারেশন।
সন্ধেটা পার হয়ে
যেই রাত নেমেছে,
অযাচিত উপদেশে
দেখি মাথা ঘেমেছে।
রাতজাগা চিন্তায়
সকাল করেছে বাও,
আয়নায় দেখি একি
বাকি চুল সব উধাও!
রঙ মেলানোর ছড়া

তুলি নিয়ে বসে আছি
নিয়ে আয় আলতা -
লালে লাল করে দিই
কান-মাথা-গালটা।
হলুদটা হাতে করে
এনেছিস সাথে কি?
তাড়াতাড়ি দেখি নে
গুলে নিয়ে গায়ে দি।
আকাশের কাছ থেকে
নীল রঙ আনলি?
পাড়তে গিয়েই শেষে
হাত-পাটা ভাঙলি!
হাতে আর পায়েতেই
দেব ওটা মাখিয়ে,
দেখ দেকি আর কিছু
রয়ে গেল বাকী এ?
সবুজটা নিয়ে আয়
গাছেদের থেকে চেয়ে -
নীলেদের মাঝে মাঝে
দেব সেটা ছড়িয়ে।
মাটিতে বাদামী ছিল
ঘাসেরই ফাঁকেতে -
যেথা খুশি লাগাবোই
মনেরই আশেতে।

আরে আরে বৃষ্টিটা
নেমে গেল একী রে!
সব রঙ একাকার
হবে যেতো দেখিরে!
রঙ মাখা কিম্ভুতে
তুলে নিই মাথাতেই
রঙ কিছু গলে নিতো
আছে সব ছাতাতেই।

প্রলাপ

বল দেখি বাঁচা কাকে বলে?
বল দেখি মরে যাওয়া কি?
বল দেখি রোদ্দুর মানে?
বল দেখি হরিণ কি জানে?
বল দেখি কাকে বলে চেনা?
কাকে আজ আলো বলে ডাকে?
ভালোবাসা বাসা যায় নাকি?
হৃদয় কোথায় পড়ে থাকে?
বল দেখি সোজা কাকে বলে?
কাকে ডাকে বাঁশি বলে আজও?
কে জানে প্রলাপ আছে নাকি?
কথাহীনতার মাঝখানে?
ভুলে যাওয়া শব্দকে চিনিস?
ডানা নিয়ে চলে গেল কবে?
একমুঠো গন্ধরা যাবে?
ওদের খুঁজতে এখনো?
জল থেকে রঙ নিয়ে এলি?
আমাকে লিখলি আকাশে?
গল্পদের বলে এসেছিস?
তারাদের ভাসাও ক্যানভাসে?
রামধনু কেঁদেছিল কবে?
চিঠি কেউ লেখেনিতো তাকে?

চিঠি কেউ লেখেনিতো তাকে।
কেউ তাকে মনে রাখেনি তো।
নাম ধরে কেউ ডাকেনি তো।
রাতভোর বৃষ্টির ফাঁকে।
সেই শুধু ভেসেছে প্রলাপে।
সেই শুধু ভেঙেছে প্রলাপে।


About