এই সংখ্যার লেখকসূচি - নন্দিনী সেনগুপ্ত,সৌমিত্র চক্রবর্তী, শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর কর, চয়ন ভৌমিক, ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়, পিয়ালী বসু, সাঈদা মিমি, অনুপ দত্ত, সতীশ বিশ্বাস, পার্থ রায়, রিয়া চক্রবর্তী, দীপঙ্কর বেরা, বনানী ভট্টাচার্য, স্বাতী বিশ্বাস, অনু সঞ্জনা সোম ঘোষ, শৈলেন দাশ, চৈতালী গোস্বামী, সুজনা চক্রবর্তী, পলাশ পাল, তন্ময় বসু, গোপেশ দে ।
আঁধারছায়া

বব ডিলান রচিত নট ডার্ক ইয়েটসঙ্গীত অবলম্বনে রচিত

ছায়া হল প্রলম্বিতজেগেছি সারা দিন।   
উষ্ণ দিন, আসেনি ঘুম- সময় রাখে ঋণ।    
আত্মা হয়ে গিয়েছে আজ ইস্পাতের মত।
সূর্য এসে দেয়নি মুছে আমার যত ক্ষত। 

কোথাও নেই ঠাঁই এখানে- সে আসবে বলে।
আঁধার নেই তবুও জানি-দিন যাবেই ঢলে। 
মানবতার বোধ যা ছিল- হয়েছে ধুয়ে নষ্ট।     
সব ফুলের পেছনে লেখা কোন না কোন কষ্ট।

লিখেছে চিঠি আমায় সে- কত না প্রেমভাষে
লিখেছে প্রাণ ঢেলে সে যে আমাকে ভালবাসে।
তবুও ঠাঁই নেই কোথাও- সে আসবে বলে।
আঁধার এলে চুপিচুপি- দিন যাবেই ঢলে।

ভ্রমেছি কত সভ্যতায়, কল্লোলিনী শহরে।
নদীর পিছে মরেছি ঘুরে, দিয়েছি ডুব সাগরে।
আমাকে কাঁধে চেপেছে হায় মিথ্যে যত বোঝা!
দিন ফুরাল, তথাপি আজও শেষ হলনা খোঁজা।

বাঁচা-মরা কোনওকিছু আমার হাতে নয়।       
দাঁড়িয়ে আছি স্থাণু- তবু ভেবেছ গতিময়!    
এই পৃথিবী! আর টেনোনা আমায় কোনও দলে।
আঁধার আসে ধীরে ধীরে- সূর্য পড়ে ঢলে।

অবশ হয় শরীর আজ, স্নায়ুও হল বিকল  ।
জানিনা কেন পড়েছি বাঁধা- কিভাবে খুলি শিকল?
প্রার্থনার মৃদুধ্বনি কেন আসেনা কানে?
দিন যায় রে ঢলে ধীরে- ছায়া ঘনালো প্রাণে।


নিজকিয়া

একদিন সব ভূমি ভরে যাবে
ছোট ছোট পায়রার খোপে
ছোট ছোট মানুষের পরমানু বাসা
ছোট ছোঁয়া, ছোট সুখ,
ছোট ভালোবাসা।

একদিন মানুষের হাত থেকে নদী
হারাবেই অনবধানে,
পরিজন পরিষেবা আকাল গ্রস্ত
ছোটবেলা নির্ভার হাসিমুখ, অভিমানে
দুর্লভ, গতির দাপটে।

সুখে থেকো, ভালো থেকো আশীষ বেরঙ
ভোগবাদী ঝড়ে
একদিন গৃহকোণ সরাইখানা -
কালো রঙ আলো হবে
আইনী নিগড়ে।

অন্ধকার টানেলের মদ্যপ যাত্রায়

আঙুল দেখা যায় না, বাইরে পরবের উচ্ছ্বাস যান্ত্রিক।
হিংস্র বুনো কুকুরগুলো ওত পেতে অপেক্ষায় 
লাল চোখ দপদপ জ্বলছে।
নিশ্ছিদ্র কালো খাবলে ছিঁড়ে নেয় পিঠের নরম মাংস 
কুকুরগুলোর পুরুষাঙ্গ ঘুরছে যত্রতত্র।
রূপকথার লোভ বলেছিল টানেল পেরোলে সূর্যোদয়ের দেশ টানটান
ঝমঝম ভালোবাসা।
ইতিহাস খলখলিয়ে হাসছে সুরং মিউজিক বক্সে তারস্বরে কুকুরের ঘেউঘেউ 
তাড়ায় হাঁটে ভয়ার্ত মাংস।
পা ঘষার শব্দ সুরংমেঝেতে মাঝেমাঝে মেটালিকা ঠুংঠাং টুংটাং।
টানেলের দুপাশেই এখনো মধ্যযুগ টানেলের দুপারেই 
বার্বেরিয়ান তলোয়ারের ঝলকানি।
বুনো কুকুরেরা হন্যে হয় যোনিলোভে
রক্তমাখা গরম মাংসলোভে লালচোখ দাউদাউ।



 যুযুধান

সূর্য গেছেন পাটে খানিক আগে
মিঠে আলোয় এখন গোধূলি বেলা
সফল-অসফলের গল্পগাথা
সঙ্গী করে নিজের সঙ্গে খেলা ।

খেলা ক্রমেই উঠছে জমে ভায়া
বাকপটুতায় চায়ের কাপে ঝড়
আমি এবং ফেলে আসা দিন
দুই খেলুড়ে লড়ছে পরস্পর ।

একটা সময় ছিল ফাগুন মাস
এখন তারা সাদা-কালোয় ফিকে
উড়িয়ে কেশর ছুটত ঘোড়া খুব
হাইতোলা দিন এখন আছে টিকে ।

হেমন্ত

চুপিসাড়ে কখন যেন কলকাতাতে
ঘোমটা খুলে হেমন্তের আত্মপ্রকাশ
ঝিলমিলে রোদ ভোর আকাশে উতল বাউল
হিমেল বাতাস সন্ধ্যেবেলা আঁচল খোঁজে ।
        
         তোমায় দিলাম হেমন্তিকা সবকিছু
         এই শহরে ঋতু বদল তোমার জন্যে ।
অনেক কিছুই বদলে গেছে এই নগরে
মানুষ, গাড়ি, কথার আখর অন্য রকম
আকাশ আজও তারায় সাজে শরৎ শেষে
শিশির আজও নূপুর বাজায় গহন রাতে ।
        
         তোমায় দিলাম হেমন্তিকা সবকিছু
         এই শহরে ঋতু বদল তোমার জন্যে ।





ক্লান্তি

প্রস্তাব ডুবে যায় গভীর বিষাদে
ইচ্ছেরা ন্যাস করে মন্দ্র নিষাদে

বিকেলের পাড়ে এসে দেখি-জল স্থির
দুচোখেতে বাঁধ ভাঙে জলের শরীর

বলি আমি-আর নয় এই ভার নাও
নিশ্চুপ ভেসে যায় নির্ভার নাও



ভাগ

একই কোল,দুটি শিশু,
শিশু না ঠিক,সহোদর।
দাগ দিল মাটিতে। একটাই।
সোজা, সরল মাইলের পর মাইল। দাগ রেখা হলে -
অন্তিমে ঠেকে,বেড়ে চলে।
সাথে হাত ধরে প্রান্তিক,পান্থপ্রদীপ। দড়ি টানাটানি খেলা দাগের বাড়িতে। 
দুদলে দুজন, সুতো ছিঁড়ে যায়।
দুজন কোথায়?
সাথে আছে আরো কেউ কেউ।
কারা ওরা? পরিজন আধা আধা?
অর্ধেক চাঁদে,অর্ধ সূর্যতে নির্বিবাদ,
নির্ঝঞ্ঝাট বৃত্ত জীবন।
যে জীবনে দাগের উপরে উঠেছে পাঁচিল।
এক মহাটানে যেখানে রশি ছিঁড়ে,
ঝরেছে শোণিত। সেখানে ধুলো মাখা -
মুখ সব। অচেনা মানুষ।
সেতু নেই,সাঁকো নেই্‌,
পড়ে থাকে জনরবহীন ভাঙা উঠোন।
দেখা হল...

এক বিকেলে দেখা পেলাম তাঁর
সবাই তখন মাতোয়ারা
ব্যস্ত পুজোর সাজে
আমার তখন হুঁশ ছিল না
পড়ি-মরি ছুটছি, কখন
দাঁড়াব তাঁর কাছে

কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াই
তাকাই তাঁর দিকে
দৃষ্টি কেমন ব্যথাভরা
বলছে কথা চোখে

বুকের তলায় দুঃখচাপা
ধিকিধিকি আগুন
আহা, কেন মিছে এই জ্বালাতন
-মন বলছে তখন

কি যে কথা তাহার পরে
কিচ্ছুটি নেই মনে
আবোল-তাবোল কত কথাই
তাঁর সাথে সেই ক্ষণে

অবাক চোখে তাকিয়ে ভাবি
সত্যি দেখা হল!
বাইরে তখন লজ্জ্বামাখা
শেষ বিকেলের আলো

ফিরছি যখন সন্ধ্যাকালে
চোখে হীরককুচি
পড়ছে ঝরে মুক্তোগুলো
বৃথাই ওদের খুঁজি

মন বললে, সেই তো আলো
সেই তো প্রাণের জোনাকি
বেদনাতে দেখা হল
ভালবাসাও নয় কি...! 

সঙ্গী

কতবার বলেছি,শুধু নদী হতে চাই
বয়ে যাব উঁচু নিচু মেঠো পথ ধরে
কভু গিরি-কন্দরে

তুমি যদি বৃক্ষ হও
হে সুমহান,
ভাসাও নিজেকে নদীবক্ষে
ভেসে চল দূর হতে দুরান্তরে

বেহুলার ভেলা যদি পায় কোন বাধা
হে গম্ভীর,
নিজবক্ষে কুড়ায়ে ভাসাও তাহারে
ছলা নয়,কলা নয়, আপন অধিকারে
জিতুক আপন ভাগ্য সে

তবু, যদি কোনদিন দাঁড়ায় দু-দন্ড এসে নদীটির পাশে
কোন মনঃক্লেশে
দিও তারে সুশীতল ছায়া
শুরু হোক আরবার নিজ পথচলা 

বৃক্ষ আছে,নদী আছে
তুমি তো একলা নও, সতী বেহুলা...!


About