এই সংখ্যার লেখকসূচি - তাপস দাস, সৌমিত্র চক্রবর্তী, অনুপম দাশশর্মা, মৈনাক সেনগুপ্ত, আফরোজা অদিতি, শাঁওলি দে, তৈমুর খান, শর্মিলা ঘোষ, নাজনীন খলিল, জয়াশিস ঘোষ, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, কৌশিক চক্রবর্তী, তুষ্টি ভট্টাচার্য, শ্রী শুভ্র, অনুপ দত্ত, শ্রী সেনগুপ্ত, পিয়াল রায়, সঙ্ঘমিত্রা সেন, জয়দেব বিশ্বাস, তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য, অনিরুদ্ধ দাস, মণিকাঞ্চন ঘোষ ।

আজ ১লা মে বিশ্ব শ্রমিক দিবস । অন্যনিষাদ বিনম্র শ্রদ্ধায় এই দিনটিকে স্মরণ করছে । অন্যনিষাদবিশ্বাস করে, সকালীন ঘটনাপ্রবাহ কিংবা মানব মনের মুক্তির দিশারি কোন ঐতিহাসিক ঘটনাকে কবি বা সাহিত্যকার এড়িয়ে যেতে পারেন না । আধুনিক শ্রমনির্ভর মানুষের সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল ১৮৮৬র এই দিনটিতে । এই দিনটিতেই লক্ষ কন্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল আট ঘন্টা শ্রম, আট ঘন্টা বিশ্রাম ও আট ঘন্টা বিনোদনএই চাওয়া । একজন কবির চাওয়া এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় । কেননা আদতে তার যাপনও তো শ্রমনির্ভর ।

পাবলো নেরুদার একটি উক্তি স্মরণ করি । বলেছিলেন কবিতা তৈরি হয় অন্ধকার আর রক্ত দিয়ে এবং তাই হওয়া উচিত। আমরা জানি সে রক্ত কখনো শিকাগোর হে মার্কেটে পুলিশের গুলিতে হত আট ঘন্টা শ্রমের সংগত দাবি করা শ্রমিকের রক্ত, কখনোবা পুলিশ লকআপে পিটিয়ে মারা তরতাজা কোন তরুণের রক্ত, কিংবা সন্ত্রাশবাদী হামলায় নিহত জওয়ানের রক্ত । আর কে না জানি হৃদয়ের রক্তক্ষণেই জন্ম নেয় কবিতা । আমরা বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি ঐতিহাসিক মে দিবসকে ।


আগামীকাল ২রা মে – বাংলার সারস্বতভূমির কৃতি সন্তান সত্যজিৎ রায়ের ৯৭তম জন্মদিন । বিশ্ববরেন্য এই মানুষটির জন্মদিনে নিবেদন করি আমাদের বিনম্র প্রণতি ।
পিঞ্জরের গান

মধ্যরাতে বস্তির ঘিঞ্জি ঘর
লক আউট আবার লক আউট;
আবার কেউ ঝুলে পড়বে ফাঁসে
কেউ স্বল্প প্রসাধনের বিজ্ঞাপন।
আজ তার ঘুম আসে না
পিঞ্জরে বকেয়া রেশন।

কোন একদিন;কোন একদিন
তারা মহার্ঘ্য জীবন।
শোষিত মানুষের ক্ষোভে
পৃথিবীর তমসা ছিঁড়েছিল।
আরাধ্য স্লোগানে উত্তাল শিকাগো।
মধ্যরাতে সে উঠে দাঁড়ায়;
খাদান শ্রমিক।
কুলি লাইনের কামিন
চটকল; সব খেটে খাওয়া ঠিকা শ্রমিক,
দুহাতে জাপটে ধরে হাতিয়ার।

খালি পেটে ফরিয়াদ
গলায় টেনে আনে গান।
মুক্তির গান
পিঞ্জরে মে দিবসের গান।
মে দিবসের পরে

অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে আসার পরে নীচের ধোঁয়া ভরা খাদ ভয় দেখায়
রেকলেস যাপনছবিতে ভাঙাচোরা খুঁতগুলো ড়ে থাকে তোবড়ানো
দৈনিক ডাস্টবিনেরাত্রি ঘন হয়ে এলে একে একে হেডলাইট নিভে আসে
চলন্ত যান স্থিত হয়
পাহাড়ী উপত্যকার নিবিড় গ্রামের কুমারী চলচ্ছবি চোখের পাতা বন্ধ করে
লুকানো গুহাচিত্র থেকে জ্যান্ত হয়ে নেমে আসে শিকারি শ্বাপদ ক্ষিপ্রগামী
শেষ লড়াইয়ের ময়দানে যারা হেরে পিছু হঠেছিল কিম্বা রেখে এসেছিল সটান মাথা
আজ তাদের আত্মা হাহুতাশী হয়ে ক্রমাগত বুক চাপড়ায় ইয়েতির বেশে
পাহাড়ের মেঘ ফুঁড়ে উঠে যাওয়া মাথা থেকে মাথায় ধাক্কা খেয়ে
ফিরে আসে গুমগুম হুতাশ
আট ঘন্টার রক্তমাখা শার্ট ক্রমশঃ ফ্যাকাশে হয়ে গ্রীন সিগন্যাল দেয়
বারো ষোলো আঠারো ঘন্টাকে
শিকাগোতে এখন জমজমাট নরককুণ্ডে আহুতি দেয়
গ্লোবালাইজেশনের ভয়ঙ্কর পিশাচ
ইতিহাস পেছনে ফিরতেই ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ বুঝিয়ে দেয়
বর্গী এসেছে ফের সোনালি ধানের দেশে
আশ্চর্য সকাল

আশ্চর্য সকাল ছুঁয়ে থাকে মধ্যরাতের পা দুটি
ম্যাজিকের সম্ভাবনা খুঁটে খায় সোনালি রোদ
লড়াকু চটি জোড়া জানে দিনান্তে আলগা হয়
বন্দীত্বের খুঁটি,
তখন হিসেবী ওস্তাদি খেলোয়াড়দের ক্লান্ত শরীর
ডোবে রঙিন সায়রে আর..
অভাবি মায়ের চোখের কোলে তখন বেকার সন্তানের
উদ্বেগ ছায়া ফেলে সুগভীর।

খোলা আকাশে নক্ষত্র প্রশ্নহীন চোখে জ্বলে যায় রাতভর
বাঁচবার সুস্থ দাবী আনুগত্যের সাক্ষাৎ চায় না
অর্জিত সম্পদ ঈশ্বরের পাশে সুরক্ষিত।
জন্মান্তর তফাতে থাক।
ধমনী শিরায় জেগে থাক পরিশ্রমী রোদ্দুরেরা,
সমস্ত শূন্যতা ছিঁড়ে নতুন সকাল
এনে দিক ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা
শ্রমিকদের !
লাল কাপড়ে যাপন

তুই তো যাপন আমার,
একলা রক্তক্ষরণ।
মজা নদী ক্লান্ত বুকে
 তুইই তো ঘোর তমসা-
হরণে আলোকমিনার।
সাগরের ঢেউয়ের ঝুঁটি,
যুদ্ধের ঘোড়ার হ্রেস্বা,
আবছা দেওয়াল-লিখন,
অদূরে মুক্তির ডাক ...
ফেলে আসা যৌবন দিন,
পিপাসা-জল পথিকের।
আজও তোর স্বপ্ন দেখি
জ্বর-তপ্ত দেহে,
তুইই দিন পাল্টে দেওয়া
টুকরো লাল কাপড়ের..
মে দিবস

ব্যাগ ঝুলিয়ে বাটি হাতে অফিস যায় খুব ভোরে
মুখ বুঁজে কাজ যে করে দরজা জানলা বন্ধ ঘরে
শ্রমে ঘামে মুনাফা বাড়ে
জীবন জুড়ে দুঃখ থাকে
মে দিবস ছুটি পেলেও পায় না খেতে পেট ভরে

 শ্রমিক ওরা কাজ করে যায় সকাল থেকে সন্ধ্যে
পায় না ছুটি কাজ করে তাই সাপ্তাহিকের বন্ধে
কাজ বেশি মুজুরি কম
নাই ওষুধ ফেলছে দম
জীবন তাদের যাচ্ছে কেটে বেতন মুনাফার দ্বন্দ্বে




ইতিহাস
     
বেড়াজাল ভেঙে ঢুকে পড়ছে
               কিছুটা বিষাদ
রক্তাক্ত ইতিহাস সাক্ষী দেবে তার
ছায়া ছায়া মেঘ আর জীবাশ্ম যত
চিহ্ন রেখে যাওয়া ধূলিপথ
             সবই কি হারায়?

কিছু ইতিহাস বই'এর পাতায়
কিছু বা হৃদয় খুঁড়ে বের হয়
                     অকস্মাৎ 
খবর

খবর আসছে,সব মৃত্যুর খবর
কসাইখানা হয়ে যাওয়া পৃথিবী এখন
মৃত্যুর দোকান

আমরা বিক্রি হয়ে যাচ্ছি
বাস ট্রেন রিকশায় ঘরে বাইরে —
যে কোনও মুহূর্তে মৃত্যুযন্ত্র গর্জে উঠবে
আর আমরা কতল হব
উট ও গোরুর মতো , ছাগল ও মুরগির মতো

প্রতিদিন মৃত্যুর জন্মদিন
অশ্রুফুল বেদনামন্ত্র আর উদাসীন ঘুম
আমরা সমর্পণ করে দিই

হে মনীষীলোকের বাতাস
হে প্রেমসুরভি পাখি
হে স্বপ্নমুকুলের মহীরুহ
তোমরা বসন্ত ঘোষণা করো
আর আলোছায়ায় মনভুলানিয়া গাও
আমরা ভালোবাসা খুঁজতে খুঁজতে রক্তে ভিজে যাই
সারারাত হিমের মতন রক্ত ঝরে....

সভ্যতা

ব্যবচ্ছেদ হওয়া সভ্যতার জাল ছিঁড়ে ক্রমশ এগিয়ে চলেছি
কোনো এক অজ্ঞাত আধুনিকতার সন্ধানে, যার জন্য
বিক্রি হয়ে গেছে অনন্ত অবসর ....
কালের প্রেক্ষাপটে এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে টুকরো গুলো
আঠা দিয়ে জুড়ছি কিংবা পুড়ছি, কিন্তু তবুও নেশা কাটে না নতুনের,
আদৌ কি সভ্যতা বুনন! !
এক অতি ইঙ্গিতবহ মার্জিত হবার আশায় হয়তো বা
আটপৌরে শব্দটা অভিধান কেন্দ্রিক ফরমালিন দেওয়া সভ্যতার বুকে
হাত রাখা আমি আমরা এভাবেই রাস্তা সাফ করতে করতে
সমাজতন্ত্রের নতুন ইতিহাস রচনা করি ।
সেই আমিইতো আছি

যেন অর্ফিউসের হাতে ঝড়ের বীণাটি বাজছিল


প্রবল ঘুর্ণাবর্তে
সবুজ পাতারা উড়ছিল
উড়ছিল ঘাস
উড়ছিল খড়কুটো
সুদূর অতীত থেকে------------
সবুজ ঘাসগুলো ধুসর খড়কুটোগুলো
জড়ো হচ্ছিল চারপাশে স্তুপ থেকে স্তুপাকারে

পৃথিবীটা ঠিক তেমনি তো আছে আজো
রোগাক্রান্ত মানুষের বিষাক্ত নিঃশ্বাস
আজো বুকে টেনে নেয় সবুজ পাতারা
সেই আনন্দে উল্লসিত হওয়া আছে
প্রতীক্ষার ব্যাকুলতা আছে
ক্ষণে ক্ষণে যন্ত্রনাক্ত হওয়া আছে


সব ঠিক তেমনিতো আছে

সময় কি মুছে দেয় সবকিছু?
প্রখর স্তিত্ব কি মুছে ফেলা যায়?
কিছুই কাড়েনা কাল
কিছু মাত্রা যোগ করে যায় শুধু

এই আমিইতো ছিলাম এখানে
এখানেই থাকি
এখানেই থাকব--আমূল অস্তিত্বে

About