বিলম্বে প্রাপ্তি ও সম্পাদকের অনবধানতার কারণে কেয়া মুখোপাধ্যায় ও প্রণব বসু রায়ের লেখা দুটি 'কবিপ্রণাম'
সংখ্যায় দেওয়া যায়নি । লেখাদুটি এখন দিলাম ।



আপনঘর থেকে বিশ্বদরবারে

‘কখনো সমুদ্রে তাঁকে করেছি সন্ধান
কখনো পাথরে
কখনো হেমন্তে শান্ত মানসিক ঝড়ে
বৃষ্টিতে খরায় ফুলে শিকড়ে কখনো
কে যেন বলেছে; দেখো শোনো-
কিছুই বলো না তুমি এক পা বড়িয়ে
যে যেখানে আছে থাক, শিকড় নাড়িয়ে
তোলার সরল কাজ তোমার তো নয়!
তুমি শুধু করে যাবে প্রবৃত্তি সঞ্চয়
আর বাকি
তোমাকে যা ছোঁবে না, তা ফাঁকি।
কখনো সমুদ্রে তাঁকে করেছি সন্ধান
কখনো পাথরেশান্ত মানসিক ঝড়ে।’
(‘তাঁকে’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

সেবার কাজের সূত্রেই বন্ধু তথা সহকর্মীরা মিলে প্যারিসে। এক বিকেলে আইফেল টাওয়ার-এর সুউচ্চ চূড়া থেকে কমলা আলো-ধোয়া সুন্দরী পারীকে দেখে নেমে আসার পর মনে হল, তাঁকে দেখে আসি। পারীর বুকে আমার রবীন্দ্রনাথকে।
দেশেই হোক কি বিদেশে,কবির স্মৃতি-বিজড়িত জায়গাগুলোর প্রতি আমাদের টান অন্তরের। সকলেই রাজি। ঠিক হল,র‌্যু টেগোর দেখতে যাওয়া হবে।

বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে কী এক অমোঘ টানে বার বার রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন প্যারিসে। আসলে ফরাসি দেশের প্রতি তাঁর এক অন্যরকম ভালবাসা ছিল।
‘ইটালি থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত সমস্ত রাস্তা – নির্ঝর নদী পর্বত গ্রাম হ্রদ দেখতে দেখতে আমরা পথের কষ্ট ভুলে গিয়েছিলেম। এই রাস্তাটুকু আমরা যেন একটি কাব্য পড়তে পড়তে গিয়েছিলেম।’
১৮৭৮ সালে ১৭ বছর বয়সে ইংল্যান্ড যাবার পথে একদিনের জন্য প্যারিসে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই প্রথম তাঁর প্যারিস দেখা। তখনই লিখেছিলেন ফরাসি দেশে আসার এই বর্ণনা। শহর দেখে মুগ্ধ কিশোরটি আরও লিখেছিলেন -
‘সেই অভ্রভেদী প্রাসাদের অরণ্যের মধ্যে গিয়ে পড়লে অভিভূত হয়ে যেতে হয়। একটা হোটেলে গেলেম,তার সমস্ত এমন প্রকান্ড যে ঢিলে কাপড় পরে যেমন সোয়াস্তি হয় না সে হোটেলে থাকতে গেলেও আমার বোধ হয় তেমন অসোয়াস্তি হয়। স্মরণস্তম্ভ,উৎস,বাগান,প্রাসাদ,পাথরে বাঁধানো রাস্তা,গাড়ী,ঘোড়া,জনকোলাহল প্রভৃতি দেখে অবাক হয়ে যেতে হয়।... কী জমকালো শহর।’

এরপর বারো বছর পেরিয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার প্যারিস এলেন ১৮৯০-র ৮ই সেপ্টেম্বর। তখন তিনি ২৯ বছরের যুবক। সে-যাত্রায় ইতালির ব্রিন্দিস বন্দরে জাহাজে করে পৌঁছে ইউরোপের মাটিতে তিনি পা রাখলেন। তারপর রাত সাড়ে এগারোটার ট্রেনে যাত্রা শুরু করে,ট্রেন বদল করে প্যারিস এসে পৌঁছলেন ভোর তিনটায়। পরের দিন পায়ে হেঁটে পারীর সৌন্দর্য দেখতে বেরিয়েছিলেন তিনি। ১৮৮৯-এর বসন্তে ফরাসি বিপ্লবের শততম বার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বমেলা হয়েছিল প্যারিসে। তখনই বিশ্বমেলার প্রধান তোরণ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল আইফেল টাওয়ার। সেবার প্রথম আইফেল টাওয়ার দেখলেন কবি।

১৯১৩-তে কবির নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি। নোবেল বিজয়ী হবার পর আরও কয়েকবার তিনি প্যারিস ভ্রমণে এসেছিলেন। বিশিষ্ট শিল্পী আর শিল্পানুরাগীদের উপস্থিতিতে প্যারিসে তাঁর ছবির প্রদর্শনীও হয়েছে। আসলে ফরাসি শিল্প আর সংস্কৃতির প্রতি কবির ছিল গভীর অনুরাগ। এই অনুরাগ বোধহয় তাঁর পারিবারিক উত্তরাধিকার। ঠাকুর পরিবারের ইউরোপীয় সঙ্গীত, বিশেষত ইতালীয় আর ফরাসি সঙ্গীতচর্চার ঐতিহ্যের সূচনা তাঁর পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় থেকে।
কবির প্রথম প্যারিস ভ্রমণের একশ’ বিশ বছর পর একটি রাস্তার নাম “র‌্যু টেগোর” দিয়ে তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল ফরাসি দেশ। সেই র‌্যু টেগোর-এর উদ্দেশেই রওনা হলাম।

এলাকাটির নাম প্যারিস ১৩। ১৯৯৮ সালের ৪ঠা অক্টোবর সেখানকার ‘প্যাসাজ র‌্যামন্ড’ রাস্তাটির নাম বদলে নামকরণ হল ‘র‌্যু টেগোর’ হয়। এই রাস্তার সংলগ্ন উদ্যানটির নাম বিখ্যাত স্পেনীয় চিত্রশিল্পী জোয়ান মিরোর নামে। সেই উদ্যানেই স্থাপিত কবির আবক্ষ মূর্তি।
মাথাটা ঈষৎ নিচু, মোটা খাতার ওপরে কলম ধরে অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে তোলাতে নিমগ্ন তিনি। বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে উজ্জ্বল মুখটিতে। আমার আবাল্যের বন্ধু। চিকচিকে বালি পেরিয়ে, পা-ডুবে-যাওয়া হাঁটুজল ছোট নদীর অচেনা বাঁকে, কিচিমিচি করা উড়ন্ত শালিকের ঝাঁকে, সহজ পাঠের পাতায় পাতায় তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ। দিনে দিনে বেড়েছে সখ্য। যত বেড়েছে, বুঝতে পেরেছি আমার চেনা-অচেনা-আধোচেনা সব অনুভূতি,কী আশ্চর্য, আগেই বুঝে, তিনি লিখে রেখেছেন পাতায় পাতায়। গোপন রহি গভীর প্রাণে, আমার সকল দুঃখ-সুখের গানে সুর দিয়েছেন। তিনি আমার ‘পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে’ আসা ‘আচমকা আলো’, যে আলো হাত ধরে আমাকে নিয়ে চলে জীবনের নানা চড়াই উৎরাই বেয়ে।
না, লালমাটি কি শালবন ছিল না সেখানে। তবু অজানা এই ছবির দেশের নরম কচি ঘাসে ঢাকা জোয়ান মিরো পার্কে মর্মর মূর্তিটির কাছে গিয়ে যেন অনুভব করলাম তাঁর উপস্থিতির সৌরভ। বিদেশের মাটিতে আমার চিরচেনা দেশের ছোঁয়া পেলাম।সেখানে দাঁড়াতেই বড় আপন হয়ে ধরা দিল রূপসী পারী।মনে পড়ে গেল পারীর সঙ্গে জড়্যে থাকা কবির নানা স্মৃতি।

১৯২০-র অগাস্ট মাস। ২ তারিখে ইংল্যান্ড থেকে নরওয়ে যাবার কথা ছিল কবির। কিন্তু সে যাত্রা স্থগিত রেখে কবি প্যারিসে পৌঁছলেন ৬ই অগাস্ট। দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের অধ্যক্ষ সুশীলকুমার রুদ্রের ছেলে সুধীরকুমার কবির জন্যে প্যারিসের মেট্রোপলিটন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। হোটেলটি কবির খুব একটা পছন্দ হয়নি। প্যারিসের উপকণ্ঠে প্রখ্যাত ফরাসি ব্যাঙ্কার ও শিল্পরসিক আলব্যর কান (Albert Kahn)-এর অতিথিশালা ওত্যুর-দ্যু-মঁদ। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের মনে পড়ল,তাঁরা যখন লন্ডনে ছিলেন,তখন ওত্যুর-দ্য-মঁদ-এর সেক্রেটারি কবিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিছুদিন আতিথ্য গ্রহণের জন্যে। সুধীরকুমার তাঁকে জানালেন, কবি প্যারিসে এসেছেন। পরদিনই আলব্যর কান-এর আগ্রহে সেখানে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করলেন কবি।  
ভারি সুন্দর সুবিশাল এক বাগানে ঘেরা বাড়িটিতে গিয়ে পরবাসেও ঘরে থাকার আনন্দ ও স্বস্তি পেলেন কবি। পরবর্তীকালে যখনই ফরাসি দেশে গেছেন,আলব্যর কান-এর আতিথ্য গ্রহণ করেছেন কবি। রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য সেই বাগান আর সংলগ্ন বাড়িটি এখন একটি জাতীয় মিউজিয়াম, Musée Albert-Kahn
১৯২০ সালে কবি যখন ইউরোপ ভ্রমণে, তখন La Nacion-এ প্রকাশিত হচ্ছিল ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-র লেখা। এরপর ১৯২১ সালের ১৬ এপ্রিল। আবার প্যারিসে এলেন কবি। সঙ্গী পুত্র রথীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীসহ মোট বারোজন। প্যারিসে তাঁকে স্বাগত জানালেন আলব্যর কান।
১৯২৪ সালে La Nacion পত্রিকায় প্রকাশিত হল ভিক্টোরিয়ার প্রবন্ধ- ‘রবীন্দ্রনাথ পড়বার আনন্দ।’ এর কিছুদিন পরেই কবির সঙ্গে সাক্ষাত হয় ভিক্টোরিয়ার। আর্জেন্তিনার সান ইসিদ্রো-তে।

১৯৩০ সাল। কবি আবারও গেলেন প্যারিসে। কিন্তু আগেরবারের প্যারিস যাত্রা আর এবারের যাত্রার মধ্যবর্তী সময়ে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে কবির। সাতষট্টি বছর বয়সে কবি ভালবেসে হাতে তুলে নিয়েছেন রঙ-তুলির সম্ভার। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন তাঁর সংগীত হবে কালজয়ী। ছবির জগতে, শিল্পের জগতে কতটা কাজ করতে পারবেন তিনি জানেন না। কিন্তু আপন খেয়ালে রঙে রঙে ভরিয়ে তুলতে লাগলেন একটার পর একটা ছবি। অসামান্য দক্ষতায় ১৯২৮-১৯৪১, এই চোদ্দো বছরে রবীন্দ্রনাথ আঁকলেন দু’হাজারেরও বেশি ছবি। তাঁর মাধ্যম ছিল কাগজ, রঙিন কালি আর জল রঙ। ক্যানভাস কিংবা তেলরঙ নয়।

জোড়াসাঁকোর দক্ষিণের বারান্দায় শিল্পচর্চায় নিমগ্ন গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ। অবন ঠাকুরের  বিখ্যাত ‘বেঙ্গল স্কুল’ শিল্প ধারা ততদিনে দেশে-বিদেশে সমাদৃত। ওকাকুরা,রদেনস্টাইনের মতো বিখ্যাত শিল্পীরা দেখা কততে আসতেন তাঁদের সঙ্গে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজেও শিক্ষা ব্যবস্থায় শিল্পকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন কলাভবন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব স্টাইল তাঁর ভাইপো অবনের বেঙ্গল স্কুল কিংবা শান্তিনিকেতনের যে ভিন্নধর্মী শিল্পধারা- দুয়ের থেকেই অনেক তফাতে। একেবারে স্বতন্ত্র।

রবীন্দ্রনাথের ছবি আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান জগতের বাস্তবানুগ অনুকরণ নয়। চেনা কোনও শৈল্পিক ফর্মেরও অনুসরণ নয়। প্রকৃতি বা নারী-পুরুষ কিংবা জীবজন্তু- কেউই কোনভাবে বাস্তবের  দাসত্ব করেনি। ফর্ম ভাঙার পদ্ধতিতেও নয়,  অত্যাশ্চর্য রঙের আশ্চর্য ব্যবহারেও নয়। প্রচলিত অর্থে নয়নমনোহর নয় তাঁর ছবি। তাই প্রথম দর্শনে দর্শকের মনে সহজ তৃপ্তির অনুভব এনে দিতে পারে না তারা। ‘গ্রটেস্ক’ বা কিম্ভূত’ গড়নের প্রতিই তাঁর আকর্ষণ। কোথা থেকে এল এই অদ্ভুত অবয়ব? বা জ্যামিতিক আকারের নারী-পুরুষেরা, নৃত্য বিভঙ্গে শূন্যে ভাসমান অথবা অপার্থিব এক চরাচরে স্থাণু? এরা কি কবির সমকালীন ইয়োরোপীয় আধুনিক অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট-এর প্রভাবে স্থান করে নিয়েছিল কবির কল্পনায়? ১৯১৩ থেকে ১৯২৪- এই সময়কালে কবি দেখেছিলেন ইউরোপের সাড়া জাগানো ইম্প্রেশনিস্ট, এক্সপ্রেশনিস্ট আর মর্ডানিস্ট শিল্পীদের কাজ। ইয়োরোপের, উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার আর প্রাচ্যের চিন, জাপানের প্রিমিটিভ আর্ট মুগ্ধ করেছিল তাঁকে। তাই জীবন সায়াহ্নে ছবি আঁকাতে শুরু করে কবি সৃষ্টি করছিলেন এক নতুনতর শিল্প-ভাষা, যে ভাষা সমকালীন বাঙালি দর্শকের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত।

১৯৩০ সালে যখন কবি আবার প্যারিসে গেলেন, সঙ্গে নিয়ে গেলেন তাঁর আঁকা চারশো ছবি। ‘পিতৃস্মৃতি’-তে রথীন্দ্রনাথ লিখছেন:
‘১৯৩০ সালে বাবা আবার যখন প্যারিস যান, সঙ্গে ছিল তাঁর আঁকা কিছু ছবি। ছবি দেখে কয়েকজন ফরাসি শিল্পী বাবাকে একটা চিত্রপ্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করলেন। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল, চট করে প্যারিস শহরে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা অসম্ভব বললেই হয়। মোটামুটি একটা পছন্দসই হল পেতে হলে বছর খানেক আগে থেকে চেষ্টাচরিত্র করতে হয়। বাবা সেনিওরা ওকাম্পোকে তারযোগে অনুরোধ জানালেন তিনি এসে যেন বাবার সহায় হন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চলে এলেন এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হল বিনা আয়াসেই প্রদর্শনীর সব রকম ব্যবস্থা তাঁর সাহায্যে হয়ে গেল’।
ভিক্টোরিয়ার ব্যক্তিগত জীবনে বেশ ঝড় বয়ে গেছে তার আগে। সেসব ভুলে জীবনকে আবারও নিজস্ব ছন্দে ফিরিয়ে আনতে তিনি তখন প্যারিসেই। সময় কাটাচ্ছেন বন্ধুদের সঙ্গে। কবির আহ্বান পেয়ে, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় আর অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলেন ভিক্টোরিয়া। কবি স্বয়ং চিঠিতে প্রতিমাদেবীকে জানালেন -

‘ভিক্টোরিয়া যদি না থাকত, তাহলে ছবি ভালই হোক আর মন্দই হোক, কারো চোখে পড়ত না। একদিন রথী ভেবেছিল ঘর পেলেই ছবির প্রদর্শনী আপনিই ঘটে – অত্যন্ত ভুল। এর এত কাঠখড় আছে যে সে আমাদের অসাধ্য- আঁন্দ্রের পক্ষেও। খরচ কম হয়নি – তিন চারশো পাউন্ড হবে। ভিক্টোরিয়া অবাধে টাকা ছড়াচ্চে। এখানকার সমস্ত বড় বড় গুণীজনদের ও জানে – ডাক দিলেই তারা আসে। কঁতেস দ্য নোয়াইও উৎসাহের সঙ্গে লেগেচে – এমনি করে দেখতে দেখতে চারিদিক সরগরম করে তুলেচে। আজ বিকেলে দ্বারোদঘাটন হবে – তারপরে কি হয় সেটাই দ্রষ্টব্য

১৯৩০-এর ২রা মে প্যারিসের বিখ্যাত গ্যালারি পিগাল-এ কবির আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনীর  উদ্বোধন হল। একশ ছাবিবশটি ছবি ছিল সেখানে।
ভিক্টোরিয়ার অনুরোধে প্রদর্শনীর ব্রোশিয়র লিখলেন আনা কঁতেস ম্যাতিউ দ্য নোয়াই- ফ্রান্সের প্রথম নারী কমান্ডার অব লেজিয়ঁ দ্যনর প্রাপক। আকাদেমি ফ্রাঁসেজ-এর গ্রাঁ প্রি-ও পেয়েছিলেন। সৌন্দর্য, প্রতিভা আর প্রতিপত্তির মিশেলে অসামান্যা এক নারী আনা নোয়াই। তখনকার শ্রেষ্ঠ ফরাসি সাহিত্যিকরা তাঁর প্রেমিক কি মুগ্ধ অনুরাগী। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ ১৯২০-র ১৬ সেপ্টেম্বর। ওত্যুর-দ্যু-মঁদ-এ রবীন্দ্রনাথের কাছে আনা কঁতেস দ্য নোয়াই-কে নিয়ে এসেছিলেন আলব্যর কান।‘রবীন্দ্রজীবনী’তে প্রভাতকুমার জানিয়েছেন:‘এই বিদুষীর কথাবার্তা, মনস্বিতা কবিকে খুবই আশ্চর্য ও মুগ্ধ করে।’
রবীন্দ্রনাথের ছবির এক অসামান্য আলোচনায় আনা জানালেন:

‘বিস্ময়কর এই সৃষ্টিগুলি, যা একাধারে চোখ জুড়োয় আর আমাদের টেনে নিয়ে চলে বহু দূরের সেই সব দেশে, যেখানে কাল্পনিক বস্তুই বাস্তবের চেয়ে বেশি করে বাস্তব। ভেবে চমৎকৃত হতে হয় কী করে যুক্তিবাদী স্বপ্নপ্রেমিক রবীন্দ্রনাথ এই সৃষ্টির দ্বার খুলে দিলেন!’
তারপর লিখলেন:
I love you and have more admiration for you, Tagore, since when you made to us such rich and sometimes such cruel confidences; but would I ever find again the great ingenuous angel that you were, when your silent feet, on the garden gravel, made me think of my sins, imaginary perhaps, and of your sublime innocence?’
আঁদ্রে জিদ আর পল ভ্যালেরিকেও আনা নোয়াই নিয়ে এলেন কবির সেই প্রদর্শনীতে।

কবির ভাবনা ছিল, তাঁর ছবিগুলিকে প্যারিসের শিল্পরসিকরা না জানি কীভাবে গ্রহণ করবেন! যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, তা মোটেই সামান্য নয়। চিত্রশিল্পী আঁদ্রে কার্পেলেস, পল ভ্যালেরি কিংবা আঁদ্রে জিদ-এর মত বিশেষজ্ঞরা ছবিগুলোকে চিহ্নিত করলেন ‘আগামীদিনের শিল্প’ হিসেবে। প্যারিসের সফল প্রদর্শনীর পর প্রদর্শনীর প্রস্তাব এল লন্ডনে আর বার্লিন থেকেও। সে সময়টায় আনন্দে একেবারে শিশুদের মত উৎফুল্ল ছিলেন কবি। নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লিখলেন:

‘আজ আমার জার্মানীর পালা সাঙ্গ হল, কাল যাব জেনিভায়। এ পত্র পাবার অনেক আগেই জানতে পেরেছ যে, জার্মানিতে আমার ছবির আদর যথেষ্ট হয়েছে। বার্লিন ন্যাশনাল গ্যালারি থেকে আমার পাঁচখানা ছবি নিয়েছে। এই খবরটার দৌড় কতকটা আশা করি তোমরা বোঝো। ইন্দ্রদেব যদি হঠাৎ তাঁর উচ্চৈঃশ্রবাঃ ঘোড়া পাঠিয়ে দিতেন আমাকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য তা হলে আমার নিজের ছবির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারতুম’।

কবির সার্ধ শতবর্ষ উপলক্ষে প্যারিস, বার্লিন, রোম, লন্ডন আর শিকাগো আর দিল্লি-তে তাঁর নির্বাচিত ছবি নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিলে ভারত সরকারের উদ্যোগে-  “The Last Harvest” প্যারিসের প্রদর্শনীটি হয়েছিল Patit Palais-এ।

পারীর বুকে যত সম্মানই পাক তাঁর ছবি, কবির মনে কোথাও আক্ষেপ ছিল স্বদেশবাসীর কাছে সম্যক স্বীকৃতি না পাওয়ার। ১৯৪১-এ শিল্পী যামিনী রায়কে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তাঁর দেশবাসীর ছবি দেখার চোখ তৈরি হয়নি, তারা শিল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে সক্ষম নয়। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন হয়তো ভবিষ্যতের ভারতবাসী তাঁর সর্ব অর্থে ব্যতিক্রমী চিত্রশিল্প বুঝতে পারবে। বাস্তবিকই তাই হয়েছে। জীবনের হৈমন্তিক পর্বের রাঙা গোধূলিতেএক আশ্চর্য প্যাশনে আঁকা রবীন্দ্রনাথের ছবির মূল্য এবং মূল্যায়নের ধারা আজ ঊর্ধ্বগামী।

সেদিন দেশের মাটি থেকে অনেক দূরে, বিদেশে, কবির মূর্তি মনে করিয়ে দিয়েছিল, তিনি তো পাশেই আছেন। হাতটি ধরে আলোর দিশা দেখানোর জন্য। নিশিন্ত খোয়াই কিংবা শান্ত জোড়াসাঁকোর মতো জোয়ান মিরো পার্কের স্মৃতিটুকুও মনে থেকে যাবে আজীবন। সেখানেই আমার আপনঘরের সঙ্গে বিশ্বদরবারকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি বড় অনিবার্যভাবে। আমার রবীন্দ্রনাথ।



0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About