রবীন্দ্রনাথ ও স্প্যানিশ কবি দম্পতি খুয়ান রামোস থিমেনেস - জেনবিয়া
এস্পেরেঞ্জা ওরতেগা
মূল স্প্যানিশ ভাষা থেকে অনুবাদ : জয়া চৌধুরী

১৯১৬ সালে অতলান্তিক পার হয়ে স্প্যানিশ কবি খুয়ান রামোন খিমেনেস আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। সেই যাত্রা তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা হবে। তাঁর সৃষ্টিগুলিতে তাঁর জীবনের ঘটনাক্রমগুলোর প্রভাব কম এমন ধারণা একদম বাজে কথা। এমনকী তাঁর কিছু কম জানা পাঠকও লক্ষ্য করে থাকবেন যে খুয়ান রামোন খিমেনেসের কবিতা তাঁর সেই ভ্রমণের পর থেকে, সেই মুহূর্ত থেকেই তার দিশা পাল্টে ফেলে।  তিনি তখন তাঁর কাব্যগ্রন্থ “ এক সদ্য বিবাহিত কবির দিনপঞ্জি” প্রকাশ করেন। জেনোবিয়া কাম্প্রূবি-র প্রেমে পড়া পৃথিবীর প্রতি খিমেনেসের দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটায় নিঃসন্দেহে। যার জ্ঞান আগে দিবাস্বপ্নের ওপর ঝুঁকে পড়ার কারণে খারিজ করা হত, সেগুলি তখন থেকেই কম স্বয়ং-সম্পৃক্ত থাকে এবং বেশি করে এক বাস্তবের উৎকর্ষতার প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠে । সেই সময় অ্যাংলো স্যাক্সন কবিদের যে পাঠ জেনোবিয়া দিচ্ছিলেন যাদের তিনি বহু আগে থেকেই চিনতেন তাঁদের কেউই তাঁর প্রেমের সম্পর্কের মতই তাঁর কবিকৃতির বিবর্তনের জন্য জরুরী অন্য আদি বিষয়ের ওপর জোর দেন নি। তিনি নিজেও ইঙ্গিত করেছিলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকের দিকে। এ ব্যাপারে আমি বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলতে চাই, আমরা সকলেই জানি প্রেমপর্ব চলাকালীন, বিয়ের পর প্রথম দিককার বছরগুলোয় খুয়ান রামোন ও তাঁর স্ত্রী জেনোবিয়া এই খিমেনেস দম্পতিটি এক গভীর গহন প্রেমময় কর্মের মত রবীন্দ্রনাথ অনুবাদে উৎসর্গ করেছিলেন। দান্তে-র “ডিভাইন কমেডির”-র প্রথম পর্ব নরকের ফ্রান্সেসা ও পাওলো-র মতই তাঁরা একটি বই পড়তে পড়তে পরস্পরের প্রেমে পড়েন। এবং এক্ষেত্রে বইটি রবীন্দ্রনাথের একটি বই। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটি চিঠিতে লেখেন- “ পাঁচ বছর আগে যে মুহূর্ত থেকে আপনাকে চিনতে শুরু করেছি ক্রমাগত আপনি আমাদের দুজনের আধ্যাত্মিক সঙ্গী হয়ে আছেন। আপনি এক অনন্য সাথী হয়ে আছেন আর মনে হয় যেন আমাদের সমস্ত কাজে আপনি ভেদ করে আছেন। আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই জেনোবিয়ার বলা ওই প্রথম পুরুষ বহুবচনের কথাটি-  “আমাদের সঙ্গী” “আমাদের কাজগুলো”, আর “ভেদ করা” কথাটির অর্থ হল “কারো সঙ্গে একীভূত হয়ে প্রবেশ করা বা  সময়ন”। ঠিক এটাই ঘটেছিল জেনোবিয়া ও খুয়ান রামোন যখন টেগোর অনুবাদ করছিলেন। যখন এঁরা দুজন একসঙ্গে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ডুব দিচ্ছিলেন আর একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ইংরিজিতে যে শব্দ গুলি ব্যবহার করেছেন তার কাস্তেইয়ানো (স্প্যানিশ) ভাষার প্রতিশব্দ খুঁজতে ডুব দিচ্ছিলেন টেগোর এঁদের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে স্প্যানিশ লিরিকাল জগতে ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছিলেন, কোন বিদেশীর মত নয় বরং কোন প্রবীন আন্দালুসিয়ার কবির মতন।  তাঁরা বোধহয় ইংরিজী থেকে অনুবাদ করতেন? অনেক আক্ষরিক অনুবাদের সমর্থকের খুয়ান রামোন ও  জেনোবিয়ার টেগোর সংস্করণকে প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে বলে মনে হয়েছিল। দেখুন জেনোবিয়া রবীন্দ্রনাথের সেইসব সৃষ্টিকেই অনুবাদ করেছিলেন যাদের স্বয়ং তিনি বাংলা থেকে অনূদিত করে এনে দিয়েছিলেন।, এবং সে অনুবাদও কোনভাবেই আক্ষরিক অনুবাদ ছিল না। তাঁর ওপর খুয়ান রামোন ছন্দ ও প্রকাশের কাব্যিক ধরণ তার মধ্যে প্রয়োগ করেছিলেন। যে টেগোরকে আমরা স্প্যানিশ পাঠকেরা চিনি তা হল খুয়ান রামোনের কবিতার সুগন্ধে তখনো সংরক্ষিত বোতলে ঢালা টেগোর। এবং এর বিপরীতটিও ঘটে যায়। আমরা লক্ষ্য করে দেখি প্রাচ্যের খুয়ান রামোনের এক সত্ত্বা যেটি মানুষ ও প্রকৃতির ভেতরে সংস্থাপিত এক সম্প্রদায় সেটি গভীর ভাবে হিন্দু আধ্যাত্মিকতায় জারিত। খিমেনেসের “এল আলা কম্পাসিবা” বা “ দরদী ডানা” বইটির ভূমিকায় এলিসা মারতিন ওরতেগা দৃঢ় ভাবে লিখেছেন যে বইটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “লুনা নুয়েবা” বা “পূর্ণিমা” বইটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ যুক্ত। দুটি বইতেই শৈশবের একরকম অত্যুৎকৃষ্ট দর্শন বর্ণিত হয়েছে। সেই সঙ্গে গদ্যের ছন্দটিও যা কিনা মোগের বাসী কবি খিমেনেস অনুবাদক হিসাবে পরিশ্রম করতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন। এটা বলে এমন বোঝাতে চাই না যে খুয়ান রামোন সামান্য নকলনবিশ, বরং তিনি এ সূত্রে তাঁর নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে ধারাটি খুঁজে পেয়েছিলেন, যার সুতো দিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্প্যানিশে ঢেলে দিতে পেরেছিলেন। তোমায় আমরা দেখি না বরং তুমি আমাদের দেখো, স্বপ্নে বিভোল, অথবা একটা কালো মেঘের সাদা সীমানা বরাবর,  এক গ্রীষ্মের রাতে... একথা কি খুয়ান রামোন টেগোরকে প্রশ্ন করেন “পূর্ণিমা” র ক্লাইম্যাক্সে? 

দার্শনিক ওরতেগা ই গাসেত সম্ভবত এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতেন। যখন তিনি জেনোবিয়াকে একটি চিঠিতে ব্যাখ্যা করেন কিভাবে কোন বিখ্যাত কবির পাঠ তাঁর সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছিল নিজেরই এক রূপ যাকে তিনি আগে অবজ্ঞাই করেছেন। এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে সেটা।  মনে হয়েছে তাঁর ভেতরে আরো কিছু জীবিত এখনো। এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে চিঠিটা খুয়ান রামোন ও জেনোবিয়ার করা আন্থোলজির শুরুতেই ভূমিকায় রাখা হবে। যদিও খুয়ান রামোনের শেষ দিককার বইগুলিতে রবীন্দ্রনাথ যাকে তিনি জ্ঞানী ও অন্তর্বাসী বলে বলতেন, তাঁর প্রভাব প্রায় পেটেন্ট নিয়ে ফেলেছিল । যখন কবি নিজেকে পরম ও অনন্তের সঙ্গে নিজেকে মেলাতেন, আরও নিশ্চিত করে কবিতা স্বয়ং, তখন খুয়ান রামোন খিমেনেসের কাছে কবিতা ঈহুদী- খৃষ্টীয় ঈশ্বরের চেয়ে বহুদূরের এক পরমা ‘আকাঙ্ক্ষা’ ও ‘আকাঙ্ক্ষিত’ ঈশ্বরের মত এসে উপস্থিত হত। এই ঈশ্বরের কথা বলতে গিয়ে জার্মান দার্শনিক ক্রাউসের দর্শনের প্রভাবের কথা অনেক বলা হয় যিনি অস্তিত্বের জন্য কবির ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু কবির সঙ্গে কবিতার এমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বোঝাতে গিয়ে প্রাচ্যের ঐতিহ্যের কথা যথেষ্ট ভাবে বলা হয় না, বিশেষ করে টেগোরের কবিতার কথা। “লা ত্রান্সপারেন্সিয়া, দিওস, লা ত্রান্সপারেন্সিয়া” বা “স্বচ্ছতা, ঈশ্বর, স্বচ্ছতা” কবিতায় উল্লিখিত ঈশ্বরের কথা বলব আমি যেখানে খুয়ান রামোন সংজ্ঞায়িত করেছেন “অতীন্দ্রিয় আলোক” বলে যাকে তিনি”ভালবাসার সমর”এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন । তাকে “অর্জিত সুন্দর, সৌন্দর্যের চেতনা”-র ঈশ্বর বলেছেন। সেটি রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর ভাবনার সঙ্গে এত মিলে যায় । রবীন্দ্রনাথ বলছেন-“ নীরবতার প্রভু, সংগীতের প্রভু” এবং এইসব বাক্য দিয়ে বলছেন- “আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে?” রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর হলেন তৃষ্ণার ঈশ্বর, আকাঙ্ক্ষার ঈশ্বর, এক ঈশ্বর যিনি খুয়ান রামোনের ঈশ্বরের মতই দর্শনীয় হতে চান, শ্রোতব্য হত চান যাতে স্রষ্টা তাঁর প্রকাশ ঘটান। আকাশ যখন পুষ্প বৃষ্টি করে তখন কি দুই কবিই ধ্বনিসময়নে জেগে ওঠেন?

 এভাবেই কি দুই কবির চিন্তা পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছায়? এর উত্তর দার্শনিক ওরতেগা ই গাসেত-এর পূর্বে বর্ণিত চিঠিতে বলে গেছিলেন। তাঁর অন্তর্দৃষ্টি নিয়েও ঈষৎ ঠাট্টার সুরে জেনোবিয়াকে লিখেছিলেন তিনি-“সব মহান কবিই, মহাশয়া, আমাদের নকল করেন।”

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About