‘বাবা গল্প বলো’
সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

কবির বড় আদরের বেলা, বেলি থেকে বেলুবুড়ি। আদর করে নিজের আর মৃ্ণালিনী দেবীর নামের সাথে নাম মিলিয়ে ভালো নাম রেখেছিলেন মাধুরীলতা।যেন একটি ফুলের কুঁড়ি। ফরসা রং, অপরূপ সুন্দর মুখ। ছাব্বিশ বছরের পিতা  রবীন্দ্রনাথের মনের আয়নায় সেই একমাত্র এক কলি। সেই বেলুবুড়ির কথা না লিখলে অনেক কিছু যে আবছা থেকে যায়।

ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হয়েও মাধুরীলতা মানুষ হয়েছেন স্বতন্ত্র ধরণে।  অন্যান্য কাকা জ্যাঠাদের মেয়েদের মত ধরাবাঁধা বিলিতি স্কুল লরেটোতে পড়েননি তিনি। পড়েছেন বাড়িতে। তিনজন ইংরেজ শিক্ষয়িত্রী, লরেন্স সাহেব ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে শিখেছেন লেখাপড়া। এছাড়া পড়তেন বাবার কাছে।  স্কুলে না পড়লেও দেশি-বিলিতি গান, সাহিত্য , এমন কি নার্সিং পর্যন্ত শিখিয়েছিলেন বাবা। বাবার উৎসাহে লিখেছিলেনঃ  “'সুয়ো”, 'মাতাশত্রু', সৎপাত্র, অনাদৃতা, 'চোর'। ছাপা হয়েছিল 'ভারতী, অরণ্যবাসী ও সবুজপত্র পত্রিকায়।

মাত্র একত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন মাধুরীলতা। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের ইতিবৃত্ত সকলেরই জানা কারণ তিনি রবীন্দ্র দুহিতা। পিতা রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপলদ্ধি বড় মেয়ে বেলাকে কোলে নিয়েই। তাই তাকে নিয়ে তাঁর কত আশা কত আশংকা। কত স্বপ্ন কত সাধ। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বেলা কবির সবচেয়ে প্রিয়। বাবার মন বলে বড় হয়ে বেলি খুব লক্ষী মেয়ে হবে। হয়েছিলেনও তাই। একটু বড় হতেই মাধুরী বুঝেছিলেন, “ আমি যা করব আমার ভাইবোনেরা তাই দেখে আমার দৃষ্টান্ত অবলম্বন করবে। আমি যদি ভাল না হই, তবে ওদের পক্ষে, আমার পক্ষেও মন্দ। মাধুরী জানতেন তিনি দিদিদের মতন বিশেষ করে ইন্দিরার মতো গুণবতী নন। কিন্তু তাঁর চেষ্টা “যদ্দুর পারি ভালো হব।”
শিলাইদহের একঘেয়েমিতে মৃ্ণালিনীর মতই হাঁপিয়ে উঠতেন মাধুরী। অভিযোগ ঝরে পরত বাবার বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথকে সরাসরিভাবে আক্রমণ করার সৎ সাহস একমাত্র মাধুরীলতার ছিল। বাবাকে চিঠি লেখেন এইভাবেঃ

“তোমার একলা মনে হয় না, কেননা তুমি ঢের বড় বড় জিনিস ভাবতে, আলোচনা করতে, সেগুলোকে নিয়ে একরকম বেশ কাটাও। আমরা সামান্য মানুষ, আমাদের একটু গল্পগুজব মানুষজন নিয়ে থাকতে এক এক সময় একটু আধটু ইচ্ছে করে। আর যদি তুমি এখানে এসে আর নড়তে না চাও তবে তুমি যে যে মহৎ বিষয় নিয়ে থাকো... তাই সমস্ত আমাদের একটু একটু দাও।”
ভাবতে অবাক লাগে, বয়স চোদ্দও পুরো হয় নি যখন মাধুরী এ চিঠি লিখেছেন। তখন থেকেই তিনি পিতার দার্শনিক চিন্তার শরিক হতে চেয়েছেন।

মাধুরীর চোদ্দ বছর পার হতেই তার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। মনের মতো ছেলে পাওয়া কি এতো সোজা? তার ওপর মোটা বরপণ আছে। বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের ওপর পড়ল পাত্র খোঁজার ভার। যখন কথাবার্তা ফলপ্রসূ হয় না তখন বন্ধুকে সান্ত্বনা দিয়ে লেখেন, “বৃথা চেষ্টায় নিজেকে ক্ষুব্ধ কোরো না।” আবার লিখলেন “নদী যেমন চলতে চলতে একসময় সাগরে গিয়ে পড়েই, সেইরকম 'বেলা' যথাসময় তার স্বামীকুলে গিয়ে উপনীত হবে।” কিন্তু এ তো সান্ত্বনা । এভাবে বসে থাকলে ত মেয়ের বিয়ে হয় না।  অবশেষে সুপাত্রের সন্ধান মিলল। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর পুত্র শরৎ-কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃ্তী ছাত্র। দর্শনে অনার্স নিয়ে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হয়ে পেয়েছেন 'কেশব সেন স্বর্ণপদক'। তারপর মেন্টাল এ্যান্ড মর‍্যাল সায়েন্সে এম.এ, তাতেও প্রথম। এখন ওকালতী পাশ করে মজঃফরপুরে প্র্যাকটিস করছেন। সব দিক থেকেই মনোমত পাত্র। কবি বিহারীলালের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ প্রথম জীবন থেকেই-সেই তিন তলার ছাদ, ফুলের বাগান, জ্যোতিদাদার  সাহিত্য  মজলিশ, বৌঠানের প্রিয় কবি বিহারীলালের উদার হাসি, সাধের আসন-সব যেন মনে পড়ে। এখন বিহারীলাল নেই, তাঁর ছেলে কি তাঁর মতই স্বভাব পাবে না।

শরতের মা মোটা বরপণ দাবি করলেন। বিয়ে হবে ব্রাহ্ম মতে। কবি তখনও সংস্কারক হন নি। মেয়ের সুখের জন্য ক্ষুব্ধ অভিযানে বরপণের দাবিও মেনে নিলেন। সম্মত হলেন দশ হাজার  টাকা দিতে। গুরুজনদের প্রতি কোনরকম বিরুদ্ধাচরণ না করে শরৎ  ও বিষয়ে মত দিতে চান নি, কবিও না। তাই পণের টাকা নিয়ে কোন পক্ষই কিছু ভাবেন নি।

মহর্ষি মেয়েদের বিয়েতে যৌতুক দিতেন তিন হাজার টাকা। এবারে দিলেন পাঁচ হাজার । বাকিটা দিলেন কবি। পণের টাকা দেওয়া নিয়েও বিস্তর লেখালিখি হল। বিয়ের কথা পাকা হবার পরেও বাধা এসেছিল কারণ, শরৎরা যে শ্রেণীর ব্রাহ্মণ, তার সঙ্গে মাধুরীর বিয়ে কুটুম্বদের মনঃপুত হয় নি। অবশ্য এসব আপত্তি কবি গায়ে মাখলেন না।

বিয়ের পর মাধুরী স্বামীর ঘর করতে গেলেন মজঃফরপুরে। সেখানে ওরকম যৌতুক নিয়ে ঘর করতে আগে কেউ আসেনি। অপর্য্যাপ্ত শাড়ি, গয়না, অসামান্য রূপ। তার ওপর মাধুরীর মধুর ব্যবহারে সমস্ত মজঃফরপুরবাসী বাঙালী বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন । এর ওপর অতিথিরূপে এসেছেন মাধুরীর ঋষি পিতা। লোক সমাগমের যেন শেষ নেই ।  এত ঝঙ্ঝাটের মধ্যেও ঋষি খুশী হয়েছিলেন জামাই হিসেবে শরৎকে পেয়ে। স্ত্রীকে লিখলেন, “এমন সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য জামাই তুমি হাজার খুঁজলেও পেতে না।” অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন মেয়েকে। মাধুরী তাতে বলেছিলেনঃ, “ ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বলে উনি আমাতে অনেক সদগুণ আশা করেন। তিনি যাতে না নিরাশ হন আমি সেই চেষ্টা করব।”

মাধুরীর চেষ্টা সফল হয়েছিল। সতেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়েছিলেন শরৎ ও মাধুরী। মজঃফরপুরের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল মাধুরীর। লেখিকা অনুরূপা দেবীর সঙ্গে এ সময় আলাপ হয়। দুজনের স্বামীরা ছিলেন দুই বন্ধু। সেই সূত্রে বন্ধুত্ব। বিয়ের সময় অনুরূপা মজঃফরপুরে ছিলেন না। ফিরে এসে মাধুরীকে দেখলেন এক স্নিগ্ধোজ্জ্বল চৈত্র অপরাহ্নে।
দেবকন্যার মতোই অপরূপা। সকলেই তাঁর গুণে মুগ্ধ। মাধুরীর গৃহিণীপনার গল্প  কবির চিঠিতে উল্লেখ আছে। সব বাঙালী মেয়েরাই গৃহিণীপনায় খুব পটু হয়।

বিহারে প্রচন্ড পর্দার যুগ চলছে তখন। সেই পর্দা ভেদ করে মেয়েদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছায় না। এইরকম যায়গায় এসে মাধুরী কি শুধু আপন সংসারটিকে নিয়ে সাজিয়ে গুজিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকতে পারেন? না পারা সম্ভব? সেই পর্দা ভেদ করে মাধুরী ঢাকা পালকিতে চড়ে শহরের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের পড়াশুনার জন্য ডাক দিয়েছিলেন। বিহারীরা তখন বেশি পর্দানবিস ছিল, কিন্তু মাধুরীর ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। সাথে ছিলেন সব সময়ের সই  অনুরূপা। সখী অনুরূপাকে নিয়ে গড়ে তুললেন “লেডিজ কমিটি”, যুগ্ম সম্পাদিকা হলেন দুজনেই। তারপর প্রতিষ্ঠা করলেন একটা গার্লস স্কুল, “চ্যাপম্যান বালিকা বিদ্যালয়”। কিন্তু তাও নিতান্ত অকালে-হারানো মাধুরীলতার জীবন যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে শেষ হল না।

১৯০৯ থেকে ১৯১৩ পর্যন্ত জোড়াসাঁকোতে কাটলেও তারপর শুরু হয়েছিল ঘোর অশান্তি। কারণটা ঠিক জানা যায় নি।  নানা মুনির নানা মত। মৃত্যুসংবাদ ছাড়া তাঁর সম্বন্ধে আর কি কিছুই জানা যাবে না? দেবতূল্য বিশ্ববন্দিত পিতার সাথে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটল কিসের জন্য, সে সময় কে রইল পাশে?  কে দিল সান্ত্বনা? এ সমস্ত প্রশ্নই অজানা থেকে গেছে। সেই সময় থেকেই রোগশয্যা নিলেন। বছরখানেক পরে একটু সুস্থ হয়ে সখী অনুরূপাকে লিখেছিলেন, “ বন্ধুহারা আমি বন্ধ ঘরে, বাকি বলে বিষণ্ণ মনে।” রোগশয্যায় শুয়ে মাধুরী অনুভব করেছেনঃ “ একটা আবরণ সরে গেছে, মানুষকে নতুন করে দেখতে শিখেছি। এরকম কঠিন ভাবে মনটা নাড়া না পেলে  হয়ত কখনও জাগত না।”

অনুরূপা ছাড়াও আর এক বান্ধবীর সঙ্গে এসময় পত্রালাপ করেছিলেন মাধুরী, তাঁর নাম ইন্দুপ্রভা। ইন্দুপ্রভাকে লেখা চিঠিতে অবশ্য “ মেয়েমানুষকে যখন বি এ ছাড়া অন্য পাশ দিতে হয় না তখন অত লম্বা স্মরণশক্তি রেখে কি ফল?” এন্ড্রুজের মুখে বাবার বিজয়বার্তা শোনেন মাধুরী। প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে মেয়ের পান্ডুর মুখ। তারপর শোনা গেল ডাক এসেছে মাধুরীর। সময় যখন সত্যি ঘনিয়ে এল, তখন কবিকে এসে বসতেই হল মেয়ের পাশে।  মিছানায় মিশে থাকা, তিল তিল করে ক্ষয়ে যাওয়া রুগ্ণ শরীর, দুখানি শীর্ণ সাদা হাত বাড়িয়ে মাধুরী ছেলেবেলার মতো আবদার করেন, “বাবা গল্প বলো।”
বেলা বুঝি শোনেন 'পলাতকার; বিনুর গল্প, , 'মুক্তি', হারিয়ে যাওয়া বামির কথা' এই গল্প শোনাও একদিন ফুরালো... রবির বেলুবুড়ি হারিয়ে গেলেন তারার মাঝে।



1 মন্তব্য(গুলি):

mahbubur rahman polash বলেছেন...

অনেক সুন্দর একটা লেখাা তসলিমা নাসরিন কে খুব মনে পরছে ............

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About