বাঙ্গালিত্বের রবীন্দ্রনাথ

কী আশ্চর্য! 
প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালী বাঁধা থাকল
রবীন্দ্রনাথ নামে একটা রেশমী কোকুনের মধ্যে ।
১৮ শতক গেল
উনিশ শতক গেল
কুড়ি শতকও তিন পেরলেই বুড়ি হবার পথে,
যে কে সেই ;
বাঙালীর পাঁজরের হাড়ে  মজ্জায় সেঁদিয়ে বসে আছে
রবীন্দ্রনাথ নামের একটা রেশমী পোকা।
পোকাটা যুগের পর যুগ ধরে
গোটা কল্লোল-হ্যাংরি-আধুনিক-উত্তরাধুনিক-উত্তরতর আধুনিক, সবটা
অক্টোপাসি আষ্টেপিষ্টে ধরে নিংড়ে গিলে খেয়ে
এক পায়ে দাঁড়িয়ে-সব গাছ ছাড়িয়ে ----
আকাশে উঁকি দেওয়া গাছটা নাম বদলিয়ে
রবীন্দ্রনাথ।

বাঙালীর বুকের মধ্যে প্রেম মানে শুঁয়োপোকা।
সকাল সন্ধ্যে রবিঠাকুরের গান শুনতে শুনতে
পোকাটা  কখন যেন প্রজাপতি হয়ে যায়,
উড়ে গিয়ে বসে  সবচে নাকউঁচু যে মেয়েটা তার বুকে
যার নাম লাবণ্য; 
অথবা শেকড় গেড়ে বসে মৈত্রেয়ীতে
গড়্গড় করে শুনিয়ে দেয়  হয় ‘ ন হন্যতে’ ,  নয়ত ‘শেষের কবিতা’  
কিছু না হলে  রঞ্জনার রাত দিন জপমালা কিম্বা
সেই শ্যামা শাপমোচন থেকে শেষ সপ্তক ।

একা একা যখন একান্ত বাঙালী হয়ে যাই তখন
ছোটবেলাটা এখনও হাজির হয় হা রে রে রে করে।
 সেও মন্দের ভালো, 
 নিজের মধ্যে নিজেকে বীর পুরুষ ভাবার অভ্যেসটা বজায় থেকে যায়
বেশ জম্পেশ করেই ।
দুপুর পেরিয়ে কখন যেন বিকেল হয়ে যায়
চোখের সামনে বিনে পয়সার বায়স্কোপ চালিয়ে রাখে  রবিঠাকুর
কুমোর পাড়ায় গরুর গাড়ী...
চলতে থাকে রকেট আর মঙ্গলগ্রহ ছাপিয়ে।  

কবিতার চোখ আবেগ নিয়ে বলে ওঠে-
‘নয়নে আমার মুগ্ধ প্রেমের নীল অঞ্জন লেগেছে’---
সে তো শেষহীন এখনও অন্ধ বন্ধ করনা পাখার আবেদনে;
আমি নই  
নিন্দুকে  বলবে
তাই সে কথা উড়িয়ে দিলাম কোন উদাস হাওয়ার দিগন্তে -- 
তবে
ঋণের ভারে ভাঙ্গাচুরো আজকের পবন মণ্ডলের
আত্মহত্যার সব বন্দোবস্ত হয়েও
শেষমেশ যখন তার চোখে ভেসে ওঠে 
আগামী বছরের সোনার তরীর  স্বপ্ন,
জোড়া তালির কাপড়ে ঐশ্বর্যের পশরা সাজায়
রাঙামাটির সোঁদা গন্ধের পৌষমেলা,   
কালু মাজি কালকের খালি হাড়িকে ভুলে
হাঁড়িয়ায় মহুল আর  মাদল কাঠি তুলে নেয়,
শুনেছি,
ওদের মধ্যে  ভুবনডাঙ্গার  
ঠাকুরবুড়ো ভর করে ।
তখন 
ইচ্ছে করে আরও কিছু জন্ম নেবো শুধু রবিঠাকুরের জন্যে  ।
অচেনা জল হাওয়ায়
আমার প্রত্যন্ত ভেতরে যেটুকু বাঙ্গালিপনা বেঁচে আছে 
তাকে কষ্টিপাথরে ঘসে নিতে ।

সত্যি বলতে
বার মাসের তের পার্বণ আর ৩৬৫ রোজের সকাল সন্ধ্যেয়
ভাঙতে আর গড়তে থাকি ভেতরের চাঁছাপোঁছা বাঙালী অহংকার ।
ভেঙে গড়তে, আর আবার ভাঙতে গড়তে
আড়চোখে যতবার ধরে উঁকি মারি, 
হাড় পাঁজরার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে  একটা চেনা  মুখ
এক মুখ সাদা দাড়িতে, রবীন্দ্রনাথ
আমার রবীন্দ্রনাথ
সব হিসেবের খের খাতা চুকিয়ে
একক দশক শতক পেরিয়ে
নিরেট বাঙ্গালিত্বের রবীন্দ্রনাথ। 


0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About