কাব্যগ্রন্থ কণিকা’ / বিবেকানন্দ দাস

আলোচক ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

১২৬টি কবিতা নিয়ে বিবেকানন্দ দাসের প্রথম কাব্যসংকলন কণিকাপড়ার সুযোগ হল । অনেকগুলিই বেশ বড় কবিতা । ২০৮ পৃষ্ঠার বইয়ে ১২৬টি কবিতা বেশ বড় সংকলনই বলতে হবে । বিবেকানন্দ দাসের কবিতাগুলি আমি যেভাবে বুঝতে চেয়েছি,সেই পাঠ প্রতিক্রিয়ার প্রথমেই বলি কবিতাগুলি চলমান নষ্ট সময়ের কবিতা । যে সামাজিক অবক্ষয়,মূল্যহীনতা, অবিশ্বাস ও শূন্যতাবোধ এই সময়কে নষ্ট করছে, করে চলেছে, বিবেকানন্দ কবিতা লিখেছেন সেই অবক্ষয়,মূল্যহীনতা শূন্যতাবোধের বাতাবরনে,কবিতার শরীরে ধরে রেখেছেন নষ্ট সময়ের নানান ছবি আর কবির বিষন্ন জিজ্ঞাসা । একটি কবিতার শিরোনাম রেখেছেন একলা হাঁটিএকলাই হেঁটেছেন কবি । কবি লেখেন

একলা নদীর বুকে দাঁড়াই যার বুকেতে জল কোন নাই
বালি মাটি

প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা, আপন একাকীত্ব, নির্জনতা আর বিষন্নতায় জারিত বিবেকানন্দর কবিতাগুলি । সংকলিত কবিতাগুলিতে পাঠক পাবেন কবির জীবনের বোধ এবং এই নষ্ট সময়ে মানুষের যন্ত্রণার প্রতি প্রগাঢ় মমত্ববোধ ও ফেলে আসা সময়ের জন্য কবির নিজস্ব হাহাকার । কবি লেখেন

যে গান লিখেছিলে একদিন, যে প্রবন্ধ, মহাকাব্য, কবিতা
পাদপূরাণে তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা,পাদটীকা
কাল থেকে কালান্তরে-যুগ যুগে
অর্থ বদলেছে তার, সঘন কুয়াশা তখন কুজ্ঝটিকা
হয়ে মানুষের দৃষ্টিকে ধূসর মলিন করেছে
মানুষের ভাব বিনিময়, শব্দবন্ধ, অভিব্যক্তি, ধ্বনি আজ যেন
শব্দকে ছুঁয়ে সহসা দুর্জ্ঞেয় জটিল হয়ে গেছে ......”(‘সরল বৃষ্টির মত শব্দরা ঝরে’)
এই কবিতাটতে একটি পংক্তির ব্যঞ্জনা আমাকে মুগ্ধ করে, যখন কবি লেখেন সভ্যতা যেন কেড়ে নেয় শব্দের লাবণ্য সকল

প্রসঙ্গত একটা কথা বলে নিই । কয়েকটি কবিতার বিন্যাসে,আমার মনে হয়েছে কবি জীবনানন্দ পড়েছেন খুব । তার কাব্যভাবনায় জীবনানন্দ তাই কবিকে ছুঁয়েছেন বারবার । অবশ্য একাকীত্ব ও বিষন্নতা রচনায় জীবনানন্দ ছাড়া আর কার কাছেই বা যাওয়া ?
মানুষের পীড়া কবিকে যন্ত্রণা দেয় । নষ্ট সময়ের চারপাশ কবিকে জানান দিয়েছে

অমৃতস্য পুত্রা আমাদের স্পর্শ করে চলে গেছে ভোরে
অনাবিল হাওয়ার মতো, সূর্যের লালিমা মাখা ভোরে” 

 সংকলনের একটি দীর্ঘ কবিতার কথা (তুই আমি ও তৃতীয় পুরুষ’) পৃথকভাবে উল্লেখ করবো । ১৬৪ পংক্তির দীর্ঘ কবিতাটিতে কবি নারী নিপীড়ন, তার অসহায়তা নিয়ে রাজনীতি, টেলিভিশনে মুখরোচক অনুষ্ঠান ইত্যাদির বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ ও ঘৃণা প্রকাশ করে কবির আত্মধিক্কার

আর হিসাব কষি কত ঘৃণা পেলে
একটি তাজমহল হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে
আমার দু জানুর মাঝে প্রলম্বিত বিদ্বেষ...
পুরুষ নাম নিয়ে দুর্বল জঠরের ঘৃণা নিয়ে বাঁচে

কবি একলা হেঁটে চলেছেন,আর একলা হাঁটার পথে খুঁজতে চেয়েছেন  সৎ প্রশান্ত মানুষ’, সমস্ত নাগরিক কোলাহল ছাপিয়ে আর একবার যার কন্ঠে শুনবেন ফুটপাতে,ময়দানে জীবনের জয়ধ্বনি । কেন কবির একলা হাঁটা ? মধ্য চল্লিশের কবি তার জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন অনেক । দেখেছেন তাদের “যারা একদিন এই সব শহরের বুকে / স্বপ্ন দেখেছিল – নরম ধানের মত সবুজ ঘাসের”আজ কবি “আকড়ে ধরে থাকার এক পরম বিশ্বাস” টুকু নিয়ে থাকতে চান যার নাম ভালোবাসা । 
আমি বিবেকানন্দর কবিতাগুলিকে এভাবেই বুঝতে চেয়েছি। 

পরিশেষে একটা কথা বলি,একটি সংকলনে এতো বেশি সংখ্যক কবিতা না রাখলেই পারতেন । আমরা তার আর একটি সংকলন পেতে পারতাম । সুমন্ত মল্লিক কৃত শোভন প্রচ্ছদে প্রকাশক বীভা পাবলিকেশনের বেশ যত্নশীল প্রকাশনা কণিকাদুশো আট পৃষ্ঠার গ্রন্থটি দাম একশ পঞ্চাশ টাকা । বিশ্বাস করি, বিবেকানন্দ দাসের কাব্যগ্রন্থটি পাঠক সমাদর পাবে ।


0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

About