লেখকসূচি - সংগৃহীত কবিতা দীনেশ দাস ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় । অন্যান্য কবিতা -শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃন্ময় চক্রবর্তী, জ্যোৎস্না রহমান, সোনালি ভট্টাচার্য মুখার্জী, চন্দ্রিমা দাস, মিলি মুখার্জী, পার্থ রায়, টিঙ্কু মুখার্জী, মৌ মধুবন্তী, কৌশিক গাঙ্গুলী, পিনাকী দত্তগুপ্ত, দিশারী মুখোপাধ্যায়, মহুয়া সেন, নিবেদিতা পুণ্যি, শ্রী সেনগুপ্ত, আদিল পারভেজ, পাপিয়া মজুমদার, পুষ্পিতা চট্টোপাধ্যায়, দেবব্রত তাঁতি, মনোজ আচার্য, জয়তী দাস, পল্লব সেনগুপ্ত, অনিন্দিতা সেন, ও সুচেতা বিশ্বাস ।
আজ ১৫ই অগস্ট ভারতের ৭১তম স্বাধীনতা দিবস । দেশ বিভাগেরও সত্তর বছর পেরিয়ে এলাম । লাখো মানুষের সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কেমন আছে এখন ? স্বাধীনতা মানে তো মুক্তি - মুক্তির আনন্দ । ক্ষুধা, দারিদ্র, ভয় থকে মুক্তি । এবং মনের মুক্তির আনন্দ । মুক্তির কাঙ্খিত স্বাদ পেয়েছি কি ? কিংবা যা পেয়েছি সেই রকমই কি পাওয়ার কথা ছিলো ! স্বাধীনতার লবঙ্গ-এলাচ কারা বাটোয়ারা করে নিল ? আছে বৈকি এই সব বিষণ্ণ জিজ্ঞাসা ! এই পাওয়া-না পাওয়ার বিষন্ন জিজ্ঞাসা রেখেই বিনম্র প্রনাম জানাই স্বাধীনতা সংগ্রামী শত শহিদের বেদিমূলে ।

আজ কবি সুকান্ত ভটাচার্যের ৮৯তম জন্মদিনও । স্বাধীনতার দিনটা দেখে যেতে পারেননি সুকান্ত, স্বাধীনতা প্রাপ্তির তিনমাস দুদিন আগেই চলে গিয়েছিলেন, কুড়ি বছর নয় মাস বয়সে । মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতার পংক্তি লিখেছিলেন বসন্তের কোকিল কেশে কেশে রক্ত তুলবে, সে কিসের বসন্ত ?” সুকান্ত বিস্মরণের কবি নন । প্রবল মানবিকতা বোধ, ইতিহাস জ্ঞান ও দেশপ্রেম তাঁকে দিয়ে রচনা করিয়ে নিয়েছে বিপ্লবী অনুভবের শিল্পিত কবিতাগুচ্ছ ।  মানুষের চিরকালীন গণচেতনাকে শিল্পের আধারে ধারণ করতে চেয়েছিলেন সুকান্ত । তাঁর কবিতায়  চিত্রিত হয়েছে যুগের আশা-নিরাশা, প্রতিবিম্বিত হয়েছে অস্থিরতা-যন্ত্রণা । নবজাতকের কাছে সুকান্তর অঙ্গীকার ছিল আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ-বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি”...সে অঙ্গীকার পূর্ণ হয়নি । সংগ্রাম জারি আছে, থাকবে । লিখেছিলেন - 

রক্তে আনো লাল
রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে
ছিঁড়ে আনো
ফুটন্ত সকাল

আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য ৬৭তম স্বাধীনতা দিবস এবং কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতি । এই উপলক্ষ্যে বাংলা কাব্য-সাহিত্যের দুটি দ্রুপদি সৃষ্টি দীনেশ দাসের ‘স্বাধীনতা ১৯৪৭’ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সুকান্ত’ কবিতাদুটি পেশ করলাম ।


পনেরোই আগস্টঃ ১৯৪৭

আমার দুচোখে আজ করে ছলোছল
পদ্মার অজস্র জল
মেঘনার ডাক,
মেঘের স্রোতের মট স্তম্ভিত অবাক ।

ডাক আসে ধূসর শহরে
রুক্ষ দ্বি-প্রহরে
বাতাস ছড়ায় অবসাদ,
ছিন্নমস্তা করে শুধু রক্তের স্বাদ ।
শুকনো পাতার মত উড়ে এল স্বাধীন সনদ,
এখানে আমার চোখে ঢেউ তোলে

বুকজোড়া পদ্মা হতে দূর সিন্ধু নদ,
তবুও মুক্তির স্রোত ওঠে ফুলে ফুলে
করোমন্ডলের ধারে শ্যাম মালাবার উপকূলে
ভারত-সাগর গর্জায়,
ইতিহাসে শুরু হবে নতুন পর্যায়

এখানে তো শাঁখের করাতে
দিনগুলি কেটে যায় করাতের দাঁতে
সীমানার দাগে দাগে জমাট রক্তের দাগ
কালনেমী করে লঙ্কাভাগ ।

তবু এল স্বাধীনতা দিন
উজ্বল রঙিন
প্রাণের আবেগে অস্থির

ডাক দেয় মাতা পদ্মা, পিতা সিন্ধুতীর ।



সুকান্ত


চৈত্রের পরিচয়ে তুমি সূর্য হতে চেয়েছো সুকান্ত
তোমার যক্ষা হয়েছে ।
তোমার তরুণ রশ্মি দেখে ভেবেছিলাম  বাঁচা গেলো
কবিও পেয়ে গেল নতুন যুগ ।
এও বুঝি ষড়যন্ত্র রাত্রিজ মেঘের
ঊষায় যারা আজ
দুর্যোগ ঘটাল। বুলেট ছেঁদা করে দিচ্ছে

তোমার উলঙ্গ ছেলেটার বুক,
তোমার বুক চিরে খাচ্ছে টিবি কীট
দুর্যোগের ঘন কালো মেঘ ছিঁড়ে কেটে
আমরা চাঁদা তুলে মারবো সব কীট
বুলেটের রক্তিম পঞ্চমে
ছিঁড়বে ঘাতকের মিথ্যা আকাশ ?
কে গাইবে জয়গান ?
বসন্তে কোকিল কেশে কেশে রক্ত তুলবে
সে কিসের বসন্ত ?”
স্বাধীনতা

প্রভু, আজ কিছু ফুল দিও
এ দেশের মাঠে ঘাটে পথে ও প্রান্তরে
একদিন স্বাধীনতা মেখে কিছু সবুজ মানুষ
এখানেই লাল হয়েছিল।

প্রভুনতজানু হোয়ো আজ
ঐ সব খাল বিল কলস্বনা নদীর কিনারে
একদিন বহতা স্রোতের বিপরীতে স্বাধীনতা চেয়ে
ওরা গান গেয়েছিল।

প্রভু, মাটির তিলকে আজ
এঁকে নিও চন্দ্রকলা শান্ত স্নিগ্ধ ভালে
কখনো স্বাধীন হবে ভেবে কিছু দামাল বিবেক
এ মাটিকে মা ডেকেছিল।

প্রভু, আজ আর কোনো মন্ত্র নয়
কবিতায় আর চোখজলে হোক তর্পণ
স্বাধীনতা দাবি করে কেউ কেউ সব তুচ্ছ করে
সূর্যের দিকে হেঁটেছিল।

প্রভু, তুমি আর পূজ্য নও আজ
অন্য গান, অন্য মন্ত্র, অন্য কাব্য হোক
প্রজন্মের সুখ চেয়ে বহু ফুল অকালে ঝরেছে
তাদের প্রণাম করে নিও।

প্রভু, এও হয় কখনও কখনও
স্রষ্টা'র সম্মান থেকে সৃষ্টের গরিমা বড় হয়
তখন সৃষ্টির পায়ে মাথা নত করাটাই সঠিক দস্তুর
প্রভু, আজ তুমিও পূজারী।
স্বাধীনতা স্বাধীনতা

স্বাধীনতা এসো, বলোতো কেমন আছ?
আজকে তোমায় লাগছে কিন্তু বেশ
খড়গ দুহাতে আরো যেন ক্ষুরধার
কাটামুন্ডুতে ভরে আছে কটিদেশ।

 স্বাধীনতা, তুমি কার ঠোঁটে রাখো ঠোঁট
আমরা দেখেছি উড়ন্ত বাঘনখ।

দরজার খিল ভেঙে গেছে বহুদিন
অন্ধ হেঁসেলে তোমার আশীর্বাদ
স্বাধীনতা তুমি আরো শীত নিয়ে এসো
এনো কালো খুন মৃত স্বপ্নের স্বাদ।

স্বাধীনতা তুমি কাকে দিলে ঘরদোর
স্বাধীনতা তুমি মাটি নদী দিলে কাকে?

আহা আহা তুমি আমাদের স্বাধীনতা
মন ভরে ওঠে তোমায় উচ্চারণে
থাবাগুলো রোজ থালাজুড়ে নেমে আসে
আকাশ তবুতো মাতাল তোমার গানে।

স্বাধীনতা তুমি মাঠ তুলে দিলে কাকে
স্বাধীনতা তুমি পিঁড়ি দিলে কাকে, কাকে?


স্বাধীনতা-- ১

এক থালা ফ্যান
ডুবুরি আঙুলে কয়েকটা  ভাতের সন্ধান

উদ্বাস্তু ক্ষিদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টায়
হাঁপিয়ে উঠছে শুকিয়ে যাওয়া নাড়ী

এদিকে উদযাপনের ভিড় ঠেলে
ছুটে আসা বক্তৃতায় দুলছে তিন রঙা পতাকা

কঙ্কালসার ছেলেটি নড়বড়ে পা ফেলে এগোতেই
হাতের তালুতে আস্ত এক দানাদার

মাতাল স্বামীর নির্যাতনে শয্যাশায়ী  মা'য়ের দিকে
সগর্বে  হাতটি  বাড়িয়ে  বলল ---

" তোমার জন্য স্বাধীনতা এনেছি "!
স্বাধীনতা

বাপু হে দিন কাল বড় খারাপ
তুমি চাও না চাও পরের দিনটা আসবেই
কোন ইচ্ছেকে পাত্তা না দিয়ে
জ্বলে উঠবে রোদ
কষ্টের ভাঙ্গা কাঁচগুলোকে পায়ে মাড়িয়ে মাড়িয়ে
মাইকে হিন্দি গান বাজবে তারস্বরে
চারি দিকে ঝিনচ্যাক ঝিনচ্যাক

বাপু হে দিন কাল বড় খারাপ
তোমার বুক ফাটা চীৎকারকে চাপা দিয়ে
সনাতন ধর্ম কেত্তন শোনাবে সারা দিন
হুজুর ধর্মাবতার
শূকরদের বলবেন মানুষ
পোকাদের বলবেন প্রজাপতি
বাপেরা ছেলেদের এক গেলাসের ইয়ারি শেখাবেন
আর মা বোনেরা পালাতে পালাতে বলবে
আচ্ছে দিন ? সে কোথায় ? ঠিক কোন রাজ্যে তাকে পাব ?
স্বাধীনতা

আজও সেই সত্তরের দশকের কথা বললে ..
গলার আওয়াজ টা আস্তে থেকে ধীরে ...
ধীরে থেকে মিহি হয়ে যায় .....
কেউ যেন শুনতে না পায় -----
ওদের কথা ---
ওরা কারা ছিল ---
কেন ছিল -----
ওরা, আমি ,তুমি,সে ,তারা কে" আমরা " হতে বলেছিল ---
বড্ড ভুল বলেছিল ----
তাই গুম ঘরে পচেছে ----
উফ্ , এসব পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা বন্ধ কর !
বাবা দিবস -এর মত , প্রেম দিবসের মত ---
ব্রিটিশ তো মত্সব করার জন্য দিয়েছে একটা ---
স্বাধীনতা দিবস !!


অন্ধকারের অনুভবে

জমাটবাঁধা কষ্টবিলাসে
আজকাল মন প্রায়শই
ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে ।
চোখের জলাশয়ে
বৈঠক বসায় দুঃখ পাখির ঝাঁক,
মন মানতে চায়না
সমাজের এই বাস্তবিক বিভাজন !
নতুন অরুণোদয়
দেখার প্রবল আয়োজন চলে
অভিমানের নদীর তীরে ,
নিশ্চিত ব্যার্থ প্রয়াসে ।
আমার এই কৃষ্ণগহ্বর জাগরন
বিলাসিতার নিঃসঙ্গতারা,
গুটিগুটি পদক্ষেপে
ভাষা খুঁজে ফেরে ।
যন্ত্রণা সব আঁধারি বুকে
চুপিসারে রং পাল্টায়!
মনের ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ
আজ সব , শুধু শোনা যায়
রাজন নির্ভয়াদের আর্তচিৎকার ।
সীমান্তের আর্তনাদে
বাতাস আজ ভারী
আর স্বচ্ছন্দে বইতে পারে না
ফুলে ফলে আকাশে ।
সমাজের যতো দূরত্ব
আর গিরি-খাদ আছে
ভরা জোছনায় ভাসেনাকো
তারা অবাধ প্লাবনে ।
চেতনার প্রাচ্যে
শুধুই আঁধারের হাতছানি,
স্বাধীনতার ঘ্রাণ পেতে চায়
অন্ধকারের তালা খুলে
সে কোন দুঃসাহসী !
কড়া সতর্কতায়
দুঃখগুলো রক্ত হয়ে জমাট বাঁধে
গুলমোহরের পাতায় পাতায় ।



     আত্মহনন

অসময়ে কেন দ্বিখণ্ডিত সময় ?
বিভ্রান্ত সমাজ ? 
নীড়ে ফেরা পাখীদের দৃষ্টিতে ভয়
বহিরঙ্গে সুসভ্য, অন্তরে নিলাজ,
ধ্বংসলীলায় মত্ত দ্বিপদ যত শ্বাপদ কুল ;
 ওরা নির্মাণ কালে কেন প্রাগ-ঐতিহাসিক?
এখন তো বীজ পোঁতার ক্ষণ
মননে কৃষক, দৃষ্টিতে সৈনিক
দিবসে শ্রম, নিশীথে সুখের রমণ
এটাই তো যাপন চিত্র- দৈনিক ;
উলু ধ্বনি, শঙ্খের ফুঁ হার মানুক
নবজাতকের কান্না শুনে,
মৃত্যুর ছায়া কেন পড়ে
জীবনের গানে ?


সরীসৃপ

দোকানে দোকানে সাজানো মেরুদন্ড
সোজা, বাঁকা  বিভিন্ন আকার সব...
স্টিকারে দামও লাগানো,
সরীসৃপগুলো হামলে পড়েছে
সোজা হয়ে দাঁড়াবার আশায়...
ভাগ্যবান, ভাগ্যবতী আছে কিছু
পেয়েছে হাতে যক্ষের ধন....
প্রশ্ন উঠলো দিকে দিকে--
সরীসৃপেরা কি আবার মানুষ হবে?
নাকি মানুষের অবয়বে জন্ম নেবে
নতুন সরীসৃপ.....!!


সৃষ্টির প্রলেতারিয়েত নারী

আমি নিবেদিত প্রাণ
সৈয়দ গোফরান
ঘোষ পুণ্যবান
পড়েছি বাইবেল,গীতা,
ত্রিপিটক ও কোরান।
কোথাও কোন দ্বিধা নেই বুঝতে
কে আল্লাহ আর কে ভগবান
কে হিন্দু আর কে মুসলমান।
তবে ধর্মের নামে চলছে জালিয়াতি
সবাই সাবধান
বিধর্মী বলে কিছু নেই। ম্লেচ্ছ বলা মহা পাপ
কাফের একটা জঘন্য শব্দ মানব জাতির জন্য
নারীকে বলা হয় সৃষ্টির প্রলেতারিয়েত
সন্তান জন্ম দেয়াই কি নারীর অপরাধ?
কে তুমি সৃষ্টির সাচ্চা উম্মত?
লজ্জা কি হয় না?
তুলিস মায়ের গায়ে হাত।
মা হলো সন্তানের ঘুম শোলক
রাতের অন্ধকারে আলোর ঝলক
দুপুর রোদের ঝাঁঝালো তাপে
শীতল বাতাস,
এবং ঘুম ভাংগলেই স্নিগ্ধ প্রভাত
কি করে তুলিস নারীর গায়ে হাত?
অনন্ত

আমার দীর্ঘশ্বাসে কালো মেঘ
আমার বুকের মধ্যে আগুন ,
আমার চোখের জলে না বলা কথা ,
আমার চলার মধ্যে উদাসীনতা । আমার যন্ত্রণায় কবিতা ,
আমি শুধু আমার জন্যে বাঁচবোনা,নারীদের বলবো 
স্বার্থপরতা নয় উদারতা ....
শিশুদের বলবো পৃথিবী সুন্দর
বয়স্কদের বলবো ভেঙে পড়বেন না ।
আমি গাছেদের নাম দেবো সহনশীলতা,
আমি আকাশকে ডাকবো মিতা বলে ,
আমি নদীর কাছ থেকে সুর শিখবো,
আমি বাতাসকে ছুঁয়ে বেঁচে থাকবো ।
হে আমার জীবন শেখার শেষ নেই,
হে আমার জীবন ভালবাসার শেষ নেই । 
গল্প থেকে ঈশ্বর

অনেক বার কাটাছেড়া করার পরও গল্পটা দাড়ালো না।
একটা আদীম রিপুর তাড়নায় ছুটে চলছি এঘর থেকে
ওঘর। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে কপালে।
অথচ জানি, দুর্গা প্রতি রাতে কড়া নাড়ে আমার দরজায়।

আমার বাড়ির কাজের মেয়েটার নামও দুগ্গা।
একদিন ওকে ডেকে বললাম, তোর বাপের নাম কিরে ?
ও চুপ করে রইলো। ভাবলাম নিচু জাতের মেয়ে।
বললাম, তোর বিয়ে হয়েছে? ও মাথা নেড়ে বলল না।
যদিও মাথায় সিঁদুর, হাতে শাখা।

এখন গভীর রাত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নেমে আসছে
আকাশের তারা। দূরন্ত ঝড় নিয়ে আমি বসে আছি।
হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে দিতেই দেখি
দাঁড়িয়ে আছে কাজের মেয়ে দুগ্গা। শতচ্ছিন্ন কাপড়ে
শরীরটা ঢেকে ও বলে উঠল, ‘বাবু, আমায় থাকতে দিবি?

একটা আদীম রিপুর টানে আমি আজ ঈশ্বরহয়ে গেছি।
এখন আমার দুই ছেলে। নাম রেখেছি অপুআর অমল
ওদের মায়ের নাম  দুগ্গানয়... দুর্গা।।
চেনা শব্দের এসরাজ

সেই যে একদিন আমি করমচা আলোয়
টুকটুকে লাল শাড়ি আর ভারী গয়নায় সাজিয়ে
নিজেকে রোদ্দুর বানিয়ে ফেলেছিলাম

তুমি দেখে বলেছিলে "কাদম্বরী দেবী "

সেই রোদে এখন এসরাজ রেখেছি শুইয়ে ....
নির্জনে বেজে ওঠে ওর ব্যক্তিগত গূঢ় কামনা
আমি বড় অকারণে নীল অমৃতের মত রোদমেখলা পরি
প্রতারক বুলিরা পরাক্রান্ত স্বপ্ন প্রসব করে

অহংকারে টান লাগলে সলমাজরি সুজন ছায়া দেবে বলেছিলো
এখন তীব্র আলোতে মাখামাখি হয়ে আছে তার  'বেশ 'আর 'ছদ্মবেশ '
 ইন্দ্রিয়ে ইন্দ্রিয়ে ,অভিলাষী বর্ষণে যাবতীয় স্বরলিপি প্রতিবেদনায় গাঢ় হলে
সোনার নূপুর খানি ভেসে থাকে মায়াকাজলে

তুমি কেমন শিল্পী হয়ে উঠলে ধীরে
আলো ছায়া শিলুয়েটে বন্দী করলে ছাইভস্ম দিন
পরাঙ্মুখ নদীজলে ভেসে বেড়ালো তোমার বাসনাকুসুম
আর আমাদের অবহেলার আখ্যানমঞ্জরী
জরায়ু

আপনি যখন বাছাবাছির কাজ করছেন
আমি তখন বাদ যাচ্ছি আনাজের খোসা
আপনি সর তুলে নিলেন , মাখন তুলে নিলেন
আমি রাজহাঁসের ফেলে রাখা অন্তঃসারহীন জল

পূর্বের আকাশ গড়াতে গড়াতে বাড়ছিল আলো ও উষ্ণতায়
তারপর একসময় যে তার পুঁজিও কমতে থাকবে
একসময় মাটি যে বহন করতে চাইবে না বৃদ্ধ বনস্পতিকে
সে কথা আমরা সবাই ভুলে যাই ঠিক ঠিক সময়ে

আপনি যখন বেছে বেছে আলাদা করে সরিয়ে রাখছেন মানিক্য
তখন সময় একটু একটু করে খরচ করছিল আপনার চাকচিক্য
আপনার ওয়ালেট থেকে

দাহ কাজ সম্পূর্ণ হলে
ছাইভষ্মের উপর ঢালবার জন্য এসে হাজির হয় সেই
অন্তঃসারশূন্য অপ্রয়োজনীয় জল



আনুষ্ঠানিক পাপ তাপ

 সন্ধ্যেটা অন্যরকম ছিল,
তোর সারা গায়ে ছিল ঘাস ফুলের গন্ধ...
আগের দিনের লাল রঙা ঝড়ে ভেঙে পড়েছিল আমার উদাসী বকুল গাছ।
আজ সেই গাছের খসে পড়া শুকনো বকুলের মালা গেঁথে ভাসিয়ে দিয়েছি ,
দিকশূন্য পুরের উদ্দেশ্যে।
আমার পুরোন লাম্পট্য তাজা হয়ে গেছে তোর ধোঁয়া হয়ে ওঠা পৌরুষে।
পুরোন আঘ্রাণ নতুনকে চেনেনা।
জাবর কেটে যায় বিষণ্ণ বাতুল মন,
কাল যে হৃদয়ের টুকরো গুলো ছড়িয়ে পড়েছিল গাঙ্গেয় ভূমিতে
আজ তার থেকে ফের জন্ম নিল জারজ স্বপ্নেরা।

আর আমার শরীর মন বোধ সব ছুটে চললো
আবহমান সাংসারিক অভিমুখে।। 


অমরালেখ্য

চোখের দৃষ্টি যদি এমন হতো,
মরণতক চেয়ে থাকা যেতো!
তবে ও দু'টি চোখে; চেয়ে থাকতাম নির্ণিমেষ,
তোমার পলকহীন চোখ দেখতে পেতো সে বিস্ময় বিশেষ।

চোখে চোখে চেয়ে থেকে, চেয়ে চেয়ে---
আরো চেয়ে থেকে---
আংগুলের খিলানে বাধা দু'জনার আংগুলে,
টেনে নিতাম দু'জন দু'জনার দিকে দু'জনকে।

মৃদু কম্পনের সাথে খুব ধীরে, 
নি:শ্বাস মিলিয়ে নিয়ে প্রশ্বাসে,
আবেগের সুসমতায়, আকর্ষণের তীব্রতায়,
দু'জন দু'জনকে কাছে টানার এমন 
অনন্ত প্রেম! আর তার মহাটানে

পৃথিবীর ধ্বংসও থেমে যেতো। 


না বলা কথা

কত কথাই তো বলি তোমাকে
কত কথায় ভুলে যায়।
দীর্ঘ সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন বুকে
জমে থাকে মরচেপড়া সময়।
রাত্রি গুলো একলা ঘরের অন্ধকারে
নতুন পরিচয়পত্র খোঁজার আশায়
হন্যে হয়ে ঘোরে।
বলতেই পার একবার, আজ রাতে তুমি
একলা নও আমি আছি পাশে...
ভয় পাও?
ভাবো ভুল করে যদি
চেয়ে বসি
না পাওয়া আরো দশ টা
চাওয়া........?


কতটা একা আমি


সময়ের ঘোড়া নিয়ে ছুটছ তুমি
আমি তাকিয়ে শুধু -
ঝরাপাতাদের কান্না শুনি।
উদাসী চোখে কেবল,
গোধূলির রঙ আর বেলাভূমি।
কোন নবীন শিকারীর হাত থেকে-
বেঁচে যাওয়া একটি কালো সারস,
তার কাছ থেকে আজ নতুন করে-
বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজি।
অন্ধকার ক্রমশ গিলেছে আমাকেই 
অস্তিত্বের সংকটে যে নদী বৃষ্টির অপেক্ষায়,
সেই
শুধু বোঝে কতটা একা আমি।



পাখির ঠোঁট

তোমার নীল চোখে দেখি সহসাই সন্ধ্যা নেমেছে

 ফ্লাট বাড়ির পাশে এঁদো পুকুর সংলগ্ন
 টালির ঘরের গভীরে কঞ্চি জানালার গা ঘেঁষে
বিষন্ন বিকেলের নকশার মত তোমার অসহায় বন্দীদশা 

আমি আয়নায় মুখ দেখি
দেখি মেঘ থমথম নীলার কপালে মস্ত চাঁদমুখী টিপের উপর দিয়ে
ভেসে যাচ্ছে থইথই  মেঘমিছিল

কাঁহাতক আর লিখতে ভালো লাগে
প্রজাপতির নিত্য প্রয়োজনীয় অভাব সংকেত
নীলার চিন্তাশরীরে
চুম্বনের কাতরতা নিয়ে জেগে উঠছে পাখির ঠোঁট

আমার পাগল জুটি

এসো কাছাকাছি থাকি
এসো পাশাপাশি থাকি ।

About