এই সংখ্যার লেখকসূচি - তৈমুর খান, ভগীরথ মাইতি, চয়ন ভৌমিক,শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়, পাপড়ি গুহ নিয়োগী, বিনতা রায় চৌধুরী, রাজর্ষি ঘোষ, পিনাকী দত্তগুপ্ত, দিগন্ত রায়, অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রী সেনগুপ্ত, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, মমতা দাস (ভট্টাচার্য), বচন নকরেক, দুর্বা মুখোপাধ্যায়, অভিষেক ঘোষ, সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়, সুতনু হালদার, নিবেদিতা পুণ্যি, রণবীর বন্দ্যোপাধ্যায় ও জাকিয়া এস আরা ।

         সূচিপত্রে লেখকের নামে ক্লিক করুন
    
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদোৎসব শুরু হল । আজ মহাষষ্ঠী । অন্যনিষাদের শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই প্রীতি ও শুভেচ্ছা । সেইসঙ্গে প্রার্থনা করি, আলোকময় ঔজ্বল্য ও উৎসব মুখরিত উচ্ছাসের বাইরে থাকা মানুষগুলোর কথাও যেন মনে রাখি, মনে রাখি , পারস্পরিক প্রীতির বন্ধন দৃঢ়তর করার তাগিদটি ।শারদীয়া উৎসব কালে অন্যনিষাদের একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় না। পরের সংখ্যা অন্যনিষাদপ্রকাশিত হবে ১২ই সেপ্টেম্বর, আর এই সংখ্যাটির প্রকাশের সঙ্গে অন্যনিষাদ শেষ করবে তার ছয় বছরের পথচলা । তারপর ১৯শে সেপ্টেম্বর অন্যনিষাদছয় পেরিয়ে সাতে পা দেবে ,প্রকাশিত হবে সপ্তম বর্ষের প্রথম সংখ্যা ।

আজ ২৬শে সেপ্টেম্বর,যুগপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৮তম জন্মদিন । অন্যনিষাদ বাংলার চিরশ্রেষ্ঠ সন্তান সিংহ হৃদয় মানুষটির প্রতি বিনম্র প্রণাম নিবেদন করছে ।

ভাষার প্রাঙ্গণে তব আমি কবি তোমারি অতিথি;
ভারতীর পূজা তরে চয়ন করেছি আমি গীতি
সেই তরুতল হতে যা তোমার প্রসাদ সিঞ্চনে
মরুর পাষাণ ভেদি প্রকাশ পেতেছে শুভক্ষণে। (রবীন্দ্রনাথ)

    
ভালো থাকুন ,আনন্দময় হোক উৎসবের দিনগুলো



    
আলোর প্রতিমা

সবাই আলো নিভিয়ে ঘুমোতে যায়

আমি শুধু প্রতিমার মুখ আঁকি আলোয়

এবার শারদীয় অন্ধকারে

পাঠিয়ে দেবো ঘরে ঘরে




দেবীপক্ষের কবিতা

মহালয়াতে বলবো পুজোতে আসছি মা-
শুনেই তুমি বানাতে বসবে নারকোলের নাড়ু
গাছ থেকে কাটিয়ে আনবে কলার কাঁদি
চট চাপা দিয়ে রাখবে সিঁড়ির নীচে-
যেন কদিনেই সময় মতো পাকে ৷
দিন এগিয়ে যতো আসবে
তটস্থ করে তুলবে দেশের বাড়িতে যারা যারা থাকে ৷
এটা আনাবে- ওটা আনাবে-
মনে মনে ঠিক করে রাখো তুমি
পুজোতে কাকে কাকে টুকটুকে নাতনি দেখাবে ৷
হাঁসের ডিম বেচে জমিয়ে রাখা টাকায়
বৌমার জন্য কিনে রাখবে কস্তাপেড়ে শাড়ি-
বাবার ফটোর কাছে বারে বারে বলবে
তোমার ছেলে বাড়ি আসছে গো- বাড়ি !
ষষ্ঠীতে বলবো ফোন করে-
আজ গুছিয়ে উঠতে পারিনি মা ৷
সপ্তমীতে বলবো- শরীরটা হঠাৎই খারাপ
বেশ জ্বর-
অষ্টমীতে আমার ফোন বেজে যাবে পর পর-
হয়তো জানতে চাইছো কেমন আছি
ধরবোই না ৷
নবমীতে বলবো- অনেক চেষ্টা করলাম মা
কিন্তু সম্ভব হলো না এবার-
দেখো যেভাবেই হোক যাবো ঠিক পরের বার ৷
বিজয়ায় ফোন করে একটা প্রণাম-
আলাদা আলাদা করে নয়
সবার পক্ষ হয়ে একজন- আমিই-
তাতে কী !
তিনজন মিলে সংসার তো একটাই- নাকি !
তুমি তো শব্দ করে কখনও কাঁদো না
নাহলে কানে পড়তো বিষ ৷
তোমার বুকে পাথর ছাড়া কিছু দেখিনি কখনও-
তুমি বলবে- তোরা ভালো থাকিস ৷
দেবী পক্ষ

এই যে দেবীপক্ষ আসে
আর পুরোনো রেডিওটা কোথা থেকে
বেরিয়ে এসে ঘুম থেকে ঠেলে তোলে আমাকে,
-সব গল্পকথা মিথ্যে মনে হয় এখন।

আসলে ঘুম আর কই ভাঙলো আমাদের
মেঘ-মন্দ্রিত বীরেন্দ্র ধ্বনি -
গভীর নিদ্রা থেকে ঠেলে কী তুলতে পারলো
একটাও অচেতন আত্মাকে শিউলি প্রহরে।

খড়, মাটি, ঘাম-তেল, তৃতীয় নয়ন
চড়া হ্যালোজেন সাজ,
টিনের তৈরী অস্ত্র - সস্ত্র -
 সব মুছে যায় ক-দিন পরেই।

মালতী হেমব্রম, দীপা সাধুখাঁ, নন্দিনী কর -
কৈলাশের অন্তঃপুরে ঢুকে পড়ে দেবী রূপ ছেড়ে
বাচ্চাকাচ্চা সামলায়, অফিসের ভাত দেয়
রান্নাঘরে আগুন জ্বালিয়ে, দশহাতে
--- সাজায় সংসারস্বাধীন হয়না।
ভোরের সানাই
  
ক্যালেন্ডারের দিন গুনে
এসছি ছুটে দেশের বাড়ি
থাকব বলে পুজোর কদিন
                            আশ্বিনে।

নবত বাঁধা হল দেবীর
আটচালাটার দক্ষিণে,
আমগাছটার মাথায় দেখি রয়েছে
ভারি আনমনে, পুজোর কদিন
                                 আশ্বিনে।

নবতখানার মালিক সে এক সুরের সাধন,
বিহানবেলায় মায়ের পুজোর করত বোধন;
হৃদয় উথালপাথাল করা সে সুর আমায়
কাকভোরে রোজ দাঁড় করাতো
আটচালাটার এক কোণে, পুজোর কদিন
                                             আশ্বিনে।

দীপজ্বলা সেই ঠাকুরদোরে
মাদুর পেতে রাতদুপুরে
আড়বাঁশিটি বাজিয়ে সুরে
ছোড়দা ডেকে বলত তাকে-
বলো তো হে, রাগটি কী এ?’

আরোহ আর অবরোহের
সপ্তকে সেই বাঁধা রাগের
গাঁঠছড়াখান খুলত সে তো
নিরেট জ্ঞানে, পুজোর কদিন
                               আশ্বিনে।

 ছোড়দা শুধোয়-
সাধন! তুমি সবই জানো।
তবু কোথাও সুরের কেমন
                  ঘাটতি যেন

সে হেসে কয়, ‘তেমন তো নয়
           আমার সানাই,
অল্পদামে রন্ধ্রগুলো এমন ধারাই।
শুদ্ধস্বরে যতই লাগাই মূর্ছনা -
সানাই সুরে বাজবেনা।

যতই থাকুক অপূর্ণতার জেরে,
অপার্থিব অরূপ সে ধন
আসত যেত শীতলপাটি ভোরে,
              পুজোর কদিন ধরে।

নিখাদ ভরাট নাই বা হল, তবু
আধা ঘড়াই উপচে কিনার ধরে,
ভৈঁরো-ভোরের মনখারাপি উন্মনে,
নয়কো শুধু পুজোর কদিন
                            আশ্বিনে।


পূজো

তিয়াসা,
আজ সেই মহাসপ্তমী
সেই ভোরের কাশ
শিশির ভেজা ঘাস
সেই গন্ধবিধুরা শিউলী
গোবরে নিকানো উঠান
পদ্মের নিরালা সুবাস
সেই স্বপ্ন উড়ান।
বিনুনি বাঁধা চুল
কপালে সুর্যটিপ
নরম বুক ঢিপঢিপ
স্নিগ্ধ ঠোঁট,নৈঃশব্দ কলহাস
সদ্যস্নাতা কুমারী সুবাস
উত্তুরে হাওয়া নিরুত্তর
হাতে হাত চোখে চোখ
সে কোন স্বপ্ন সকাল
আজও আমি উন্মন বিভোর।
তন্ময়তার নাভিমুল থেকে
প্রলম্বিত মন্ত্রোচ্চারণ
আমি তোমায় ভালবাসি।


মা দুর্গা

প্রতিবারের মতো এবারো মা দুর্গা আসছে .কিন্তু
সেই নীলআকাশ কাশফুল শিউলি শেফালীর গন্ধ কোথায় ?
চারিদিকে শুধুই বারুদের গন্ধ আর্তনাদের হাহাকার আর রক্ত
ইচ্ছে করে ঘড়ি  চশমা  কলম সব ছুড়ে ফেলে দেই
কুয়াশার ডানায় ভরকরে আর উড়তে ইছে হয় না

চেনা সারি সারি মুখগুলো অচেনা লাগে আজকাল
মাগো তুমিতো মহামায়া অসুরমর্দিনী
তবে কেন ধর্ষণ উৎসব চারদিকে ?
সম্প্রতি বন্যায় মানুষের, দুইবেলা খাবার নেই
এই দিকে  বেশীর ভাগ পূজার বাজেট কুড়ি লক্ষের বেশী
এটাই আমাদের দেশ
মানুষ এখন আবর্জনার মত পড়ে থাকে
আর ভালবাসা, তীব্র আলোর নিচে
যে যত নগ্ন হতে পারো .
একটা গভীর অসুখ


সবাই দৌড়োছে টিকে থাকবার জন্য
কিন্তু কি ভাবে ? কেউ জানে না...
সুতো কাটা ঘুড়ি দিয়ে রেখেছে আমাদের হাতে
পিছন থেকে বলছে, ‘এবার ওড়াও দেখি
আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি
এই যে এতো আড়ম্বর তোমায় নিয়ে
কিন্তু মাঝখানে পুরোটাই ফাঁকি
কবি  শিল্পী সাধারন মানুষ প্রতিবাদ করবে বোলে
তুলি কলম মোমবাতি নিয়ে হাজির
কিন্তু বোঝাবে কাকে?

ইদানিং এত বমি পায়,
দুইহাতে গলাটিপে দিতে ইচ্ছে হয় নিজেরই
তারপরও বাঁচতে হয় সন্তানের মুখ চেয়ে
এইসব দেখতে দেখতে আমার  তিন জন্ম গেলো  জানো?
 মেয়ে -বৌ -মা
আমি আজীবন শুধু শূন্যতাই ছুঁয়ে গেলাম
এখন, একান্ত ব্যক্তিগত ব্যালকনিতে যখন দাঁড়াই
আমার একমাত্র সঙ্গী হয় নৈঃশব্দ...


আগমনী

শ্রাবণভেজা শরতের আকাশে
তুলোর পালক মেঘেদের ডানায় ।
বাগানে দুলছে থরে থরে কাশফুল
হাতছানিতে যেন ডাকছে আমায় ৷
মায়ের আগমনী তুলিতে সে আঁকে-
মঙ্গল বেজে ওঠে কাঁসরে ও শাঁখে ৷
তারা ডানা মেলে কাছে আসে
যারা দূরে- যারা দীর্ঘ পরবাসে-
আনন্দময় হয়ে ওঠে বিষণ্ণ সময় ৷ 
মার আগমন আজ সবার উঠানে
আলোর কিরণে আলোকিত হোক মনের উজানে ।
এসো মা দুঃখ ভুলিয়ে
আনন্দের জোয়ারে গা দাও ভাসিয়ে ।
দিকে দিকে তোমার প্রতীক্ষায় রাখি
জ্বালিয়ে প্রদীপ তুলসী তলায় ।



আমার গৌরী

       
গৌরী পূজার সময় হল যে
গৌরী আসেন ঘরে ,
গুলির আঘাত বক্ষে নিয়ে কি
গৌরী কখনও  মরে?
আমার গৌরী বার বারই আসে
বছর বছর ফিরে-
আগুণের তিরে শেষ করে দিলি
বৃথাই ভাবিস কিরে !
আমার গৌরী অসুর দলনী
শিবের শক্তি রূপে,
আজও কি তোরা চিনিস না যে
আছিস অন্ধ কূপে
যেখানে অশিব, যেখানে বিচার-
মূর্খের হাতে বন্দী ,
সেখানে ত্রিশূল ছিন্ন করেছে
অন্যায় যত ফন্দী
চিরবিদ্রোহী জামদগ্ন্য সে
নয়নে  আগুণ জ্বলে ,
কণ্ঠে আগুণ কলমে আগুণ
বক্ষে আগুণ ঝলে
দনুজনাশিনী  মাতৃরূপিনী
অজরা শক্তি দাত্রী ,
এক রূপ ছেড়ে আরেক রূপেতে
আছেন জগদ্ধাত্রী। 
একটি কণ্ঠ রুদ্ধ হলে বা
হাজার কণ্ঠ ফোটে
দশ হাতে দশ বিদ্যা গৌরী .
ভুঁই ফোঁড় হয়ে ওঠে









পাপ


একটা পাপহীন পূণ্যহীন শরীরের কথা উচ্চারণ করি
আর মনে পড়ে যায় শ্মশানপথের সেই মৃতদেহটির কথা
যে আমাকে আঙুল উঁচিয়ে বলেছিল,

কখ্‌খোনো কবিতা লিখবি না


দড়ি কি?

এম এ পাশ করা ছেলের অহঙ্কার
আর বি টেক পাশ করা ইঞ্জিনিয়ারের হাতছানি
কবিরাই শুধু অন্ধকার দেখতে পায়


নোনা জলের গভীরে অনেক পাপ লুকিয়ে থাকে

ম্যারিয়ানা খাতের নিঃঝুমে
ফেলে আসা সেই ট্রেজার বক্সের দাবী ডুব দাও

ডুব দাও
কারণ এক একটি প্রবাল এক একটি পতাকা এক একটি জহরত
এক একটি মৃত্যুর সমানুপাতিক


সক্রেটিসকে হেমলক দেওয়া হয়েছিল
উনি তো পারতেন আতশ কাঁচের আগুনে নিজের চিতা
    নিজেই সাজিয়ে নিতে


এক পা দু পা করে এগিয়ে যাচ্ছি
খাদ জানি
আগুন জানি

তবু একটি বার নরক দেখতে চাই


আমি রাবণের উপাসক
যার একটি পাপ সমস্ত পূণ্যকে ধুয়ে দিয়েছিল

আমি একটি যুগপুরুষকে ভয় করি
কারণ তাদের সমস্ত পাপকেও একটি বিশাল পূণ্য বলা হয়


কবিতার মৃত্যু হয় না
হে মহান কবিতা বার বার জন্ম নাও
এ পোড়া দেশ ভরে যাক শ্রাবণের অভিঘাতে

বৃষ্টি ভিজে তুমি জাতিস্মর হয়ে ওঠো


আমার অনুশোচনাগুলো আমি লিখে যেতে চাই
তাই শিশিরের গন্ধ আমার একান্ত প্রিয়
    আর বর্ষার মেঘ দেখলেই হৃদয় কেঁপে ওঠে


একটি একটি করে
আমার ভালোবাসাগুলো গুণে বলুন তো শ্রেষ্ঠ
    কটি পাপ?
    কটি পূণ্য?
    কটি নিখাদ আরাধনা?


About